শিরোনামঃ
কোরবানির বর্জ্য না সরানোয় ইজারাদারদের জামানত বাজেয়াপ্ত ও কালো তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্ত অপপ্রচারের রাজনীতি এখনো থামেনি, প্রেস ক্লাবে রিজভী ৫ বিভাগে বজ্রবৃষ্টির আভাস, তবে দেশজুড়ে বাড়বে ভ্যাপসা গরম দাগনভূঞায় ইসলামী আন্দোলনের নির্বাচনী মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভূষিত হচ্ছেন বাংলাদেশের ৬ শহীদ শান্তিরক্ষী সাত দিনের লম্বা ছুটি শেষে কাল সচল হচ্ছে দেশ তামাকমুক্ত প্রজন্ম গড়তে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী পাহাড়ি জঙ্গল সলিমপুর আর থাকছে না অপরাধীদের কব্জায় ইরাক-ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপকে ‘বোকামি’ বললেন ট্রাম্প বৈশ্বিক বাজারে সোনা ঊর্ধ্বমুখী, বাংলাদেশে দাম স্থির
রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১১:২২ অপরাহ্ন

অন্তর্বর্তী সরকারের আড়ালে কিচেন ক্যাবিনেট এবং ক্ষমতার লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গত বছর দীর্ঘমেয়াদি শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, তখন গোটা দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল একেবারে আকাশচুম্বী। সাধারণ মানুষের দৃঢ় আশা ছিল, গণমানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে আসা এই সরকার দেশে দ্রুত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে এবং প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে একটি সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক পরিবেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই সেই আকাশসম প্রত্যাশার বেলুনে যেন ধীরে ধীরে ফুটো হতে শুরু করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে ক্ষমতার চর্চা নিয়ে খোদ সরকারের ভেতরেই তৈরি হয়েছে এক তীব্র অসন্তোষ ও সমন্বয়হীনতা। বিশেষ করে সরকারের আড়ালে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বা একটি অদৃশ্য ক্ষমতা বলয়ের অস্তিত্ব নিয়ে খোদ উপদেষ্টারাই এখন জনসমক্ষে প্রকাশ্যে বোমা ফাটাচ্ছেন, যা দেশের রাজনৈতিক ও সুশীল অঙ্গনে জন্ম দিয়েছে এক নতুন ও উদ্বেগজনক বিতর্কের।

অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে যে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে অন্য কোথাও থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রথম বোমাটি ফাটিয়েছিলেন এই সরকারেরই সাবেক নৌ উপদেষ্টা এবং প্রবীণ নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি গণমাধ্যমকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন যে, সরকারের অধিকাংশ বড়, নীতিগত ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো মূলত উপদেষ্টা পরিষদের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বাইরেই নেওয়া হতো। তার সেই অভিযোগের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ নিয়ে একেবারে হাঁড়ির খবর ফাঁস করেছেন খোদ পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তিনি বিস্ফোরক দাবি করে বলেন, সরকারের মূল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মাত্র সাত সদস্যের একটি ‘কিচেন ক্যাবিনেট’, যাদের গোপন বৈঠক বসত প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার। শুধু তাই নয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো রাষ্ট্রের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এই ক্যাবিনেটের একাধিক উপদেষ্টার অযাচিত হস্তক্ষেপ ও অতিরিক্ত প্রভাব খাটানোর কারণে তিনি এক পর্যায়ে রীতিমতো অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক ও দমবন্ধ করা ছিল যে, তিনি প্রশাসনিক কাজে বিরক্ত হয়ে তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন, যদিও সরকারপ্রধান তার সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি।

রাজনৈতিক বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বলতে বোঝায় এমন একটি অনানুষ্ঠানিক ও ক্ষুদ্র উপদেষ্টা গোষ্ঠীকে, যারা রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের অত্যন্ত আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ঠ এবং যারা মূল মন্ত্রিসভাকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণে সরাসরি প্রভাব খাটানোর একচেটিয়া ক্ষমতা রাখে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, উনিশ শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের শাসনামলে এই শব্দটির প্রথম উৎপত্তি ঘটে। জ্যাকসন যখন তার মূল ও আনুষ্ঠানিক ক্যাবিনেটকে পাশ কাটিয়ে তার ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন, তখন রাজনৈতিক বিরোধীরা তাকে ব্যঙ্গ করে এই ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ আখ্যা দিয়েছিল। আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় এই শব্দটি সাধারণত অত্যন্ত নেতিবাচক ও সমালোচনামূলক অর্থে ব্যবহার করা হয়। কারণ, রাষ্ট্রের ভেতরে যেখানেই এমন ছায়া বা অদৃশ্য ক্ষমতা কেন্দ্র তৈরি হয়, সেখানেই প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার চরম অভাব দেখা দেয়। এর ফলে জবাবদিহিতা কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে আসে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণ মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অস্পষ্ট, রহস্যময় ও ধোঁয়াশায় ঢাকা থাকে, যা একটি সুশাসনের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।

এখন সবচেয়ে বড় কৌতূহলের বিষয় হলো, এই অদৃশ্য বলয়ের নেপথ্য কারিগর আসলে কারা? সরকারিভাবে কখনোই এমন কোনো ক্যাবিনেট বা গোষ্ঠীর অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়নি, ফলে এর সদস্যদের কোনো সুনির্দিষ্ট বা আনুষ্ঠানিক তালিকাও কোথাও লিপিবদ্ধ নেই। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গণমাধ্যমের গভীর অনুসন্ধান এবং ক্ষুব্ধ উপদেষ্টাদের দেওয়া বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, এই বলয়টি মূলত তৈরি হয়েছিল উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন অতি-প্রভাবশালী সদস্য, সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শীর্ষ আমলা এবং নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে। যাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার এই অপব্যবহারের অভিযোগ, তারা অবশ্য প্রকাশ্যে এই পুরো বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি মিথ্যা প্রচারণা বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি হলো, যেকোনো সংকটকালীন বা ট্রানজিশনাল পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বার্থে সরকারপ্রধানকে কিছু নির্দিষ্ট, দক্ষ ও বিশ্বস্ত মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি নির্ভর করতে হয়। এটিকে অবৈধ বা অসাংবিধানিক ক্ষমতা বলয় বলাটা নেহায়েতই অযৌক্তিক।

জনমনে এখন সবচেয়ে বড় ও প্রাসঙ্গিক যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো—উপদেষ্টারা যখন সগৌরবে স্বপদে বহাল ছিলেন, তখন কেন তারা এই স্বেচ্ছাচারী ছায়া বলয়ের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটিও করেননি? এতদিন পর কেন তারা হঠাৎ করে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে সরব হয়ে উঠলেন? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই হঠাৎ মুখ খোলার পেছনে একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক একটি বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তি। এই ভূ-রাজনৈতিক চুক্তিটি সামনে আসতেই সরকারের ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, স্বার্থের সংঘাত ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব একেবারে প্রকাশ্যে চলে আসে। রাজনীতিতে ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ে অসন্তোষ সাধারণত তখনই প্রকাশ্যে আসে, যখন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করে বা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও মেরুকরণ বদলাতে শুরু করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এতদিন পর এই হাঁড়ি ভাঙার পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথমত, সরকারের ভেতরে দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ, প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে উপদেষ্টাদের মধ্যে মতবিরোধ চরমে পৌঁছানোর কারণেই এখন বিষয়গুলো বিস্ফোরণের মতো প্রকাশ্যে চলে আসছে। দ্বিতীয়ত, এটি মূলত দায় এড়ানোর একটি সুকৌশল। অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক সিদ্ধান্তই হয়তো সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়নি বা তীব্রভাবে সমালোচিত হয়েছে। সেই ব্যর্থতার বিশাল দায়ভার পুরো উপদেষ্টা পরিষদের কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করতেই উপদেষ্টারা এখন দেশবাসীকে বোঝাতে চাইছেন যে, ওই বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো তাদের ছিল না, বরং তা বিশেষ একটি গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত ছিল। তৃতীয়ত, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ময়দানে নিজেদের অবস্থান ও ভাবমূর্তি সুরক্ষিত রাখতে এবং যেকোনো সম্ভাব্য আইনি বা রাজনৈতিক বিতর্কের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে উপদেষ্টারা এখন নিজেদের বক্তব্য আগেভাগেই জনসমক্ষে নথিভুক্ত করে রাখছেন।

বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে ছায়া সরকার বা অদৃশ্য ক্ষমতা কেন্দ্রের অভিযোগ একেবারে নতুন কোনো বিষয় নয়। সামরিক ও বেসামরিক প্রায় প্রতিটি সরকারের আমলেই এমন অভিযোগ বহুবার উঠেছে। তবে বর্তমান বিতর্কের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, এই অন্তর্বর্তী সরকারের মূল ভিত্তিই ছিল নির্দলীয় নিরপেক্ষতা, চরম স্বচ্ছতা এবং জুলাই বিপ্লবের ছাত্র-জনতার আশা-আকাঙ্ক্ষা। সেখানে যদি জবাবদিহিহীন কোনো অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতা বলয় তৈরি হয়ে থাকে, তবে তা বুকের রক্ত দেওয়া সাধারণ মানুষের প্রতি এক ধরনের চরম প্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়। একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত যেখান থেকেই আসুক না কেন, তার স্বচ্ছতা ও জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চলমান এই ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বিতর্ক আজ দেশের আপামর মানুষকে আবারো সেই চিরন্তন ও পুরনো প্রশ্নটির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা আসলে কোথায় এবং কার হাতে কেন্দ্রীভূত?

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪


এ জাতীয় আরো খবর...