বাংলাদেশের কর্পোরেট ইতিহাস এবং রাজস্ব খাতের অন্যতম বড় নাম বহুজাতিক তামাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বা সংক্ষেপে ব্যাট। সরকার প্রতি বছর এই প্রতিষ্ঠানটি থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের রাজস্ব পেয়ে থাকে। কিন্তু এবার দেশের শীর্ষ করদাতা এই কোম্পানির বিরুদ্ধেই উঠেছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং ভয়ংকর এক দুর্নীতির অভিযোগ। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের করা এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগে বলা হয়েছে, বিগত ৫৫ বছর ধরে জাল কাগজপত্র তৈরি এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে কোম্পানিটি বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করেছে। অভিযোগের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরপরই এই দুর্নীতির বীজ বপন করা হয়েছিল এবং এর নেপথ্যে কাজ করেছে তৎকালীন প্রভাবশালীদের একটি বড় সিন্ডিকেট।
এই বিশাল দুর্নীতির শেকড় খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে শতবর্ষ পুরোনো ইতিহাসে। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি কিন্তু রাতারাতি এই ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই কোম্পানির আদি নাম ছিল ইম্পেরিয়াল টোব্যাকো কোম্পানি। অবিভক্ত ভারতবর্ষে ১৯১০ সালের দিকে তারা প্রথমবারের মতো এই অঞ্চলে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করে। সেই সময় তাদের প্রধান সদর দপ্তর স্থাপিত হয়েছিল ওপার বাংলার কলকাতায় এবং আমাদের ভূখণ্ডে এর একটি শাখা অফিস খোলা হয়েছিল সিলেটের মৌলভীবাজার জেলায়।
পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশরা এই উপমহাদেশ ছেড়ে যায় এবং দেশভাগ হয়, তখন তারা ঢাকার ঐতিহ্যবাহী আরমানিটোলায় তাদের প্রথম বড় ডিপো বা গুদাম স্থাপন করে। দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের সাথে সাথে কোম্পানিটিও তার খোলস পাল্টে ফেলে এবং নতুন নাম ধারণ করে ‘পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি’। এই নামেই তারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশে তাদের একচেটিয়া ব্যবসা পরিচালনা করতে থাকে। সেই সময়ে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট এলাকায় তাদের একটি সুবিশাল কারখানা স্থাপিত হয়, যা ছিল তাদের ব্যবসার মূল কেন্দ্র।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯৭২ সালের ‘বাংলাদেশ পরিত্যক্ত সম্পত্তি আদেশ’ বা অ্যাবানডনড প্রপার্টি অর্ডার। এই আদেশের মূল কথা ছিল, যেসব পাকিস্তানি নাগরিক বা অবাঙালি ব্যবসায়ী মুক্তিযুদ্ধের সময় বা পরে বাংলাদেশ ত্যাগ করে চলে গেছেন, তাদের ফেলে যাওয়া সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাংলাদেশ সরকারের পূর্ণ মালিকানায় চলে আসবে।
এই আইনের অধীনেই বিখ্যাত আদমজী জুটমিলসহ আরও অনেক বড় বড় শিল্প কারখানা স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল। সেই একই আইনি কাঠামোর আওতায় পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানির ফেলে যাওয়া সমস্ত কারখানা, কার্যালয় এবং সম্পদও পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে সরকারের শতভাগ মালিকানায় আসার কথা ছিল। কিন্তু অত্যন্ত সুকৌশলে এবং প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় সেই প্রক্রিয়াটি নস্যাৎ করে দেওয়া হয়, যা ছিল এই দীর্ঘস্থায়ী জালিয়াতির প্রথম ধাপ।
দুদকে দায়ের করা অভিযোগ অনুযায়ী, এই নজিরবিহীন দুর্নীতির সূত্রপাত ঘটে ১৯৭২ সালে, যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। সদ্য স্বাধীন দেশের ভঙ্গুর প্রশাসনিক কাঠামোর সুযোগ নিয়ে পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানির তৎকালীন ফিন্যান্স বা অর্থ ব্যবস্থাপক জামালউদ্দিন আহমেদ একটি গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বোনেন। চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটের সন্তান জামালউদ্দিন পরবর্তীতে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে জিয়াউর রহমানের সরকারের আমলে উপ-প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি তৎকালীন সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী, ঊর্ধ্বতন আমলা এবং রাজনীতিকদের সাথে একটি গোপন আঁতাত বা যোগসাজশ গড়ে তোলেন।
১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি সাবেক পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানির বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের একটি অংশ বাংলাদেশ সরকারের কাছে অত্যন্ত চতুরতার সাথে একটি প্রস্তাব পেশ করে। তাদের প্রস্তাবটি ছিল, পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে কোম্পানিটি বাজেয়াপ্ত না করে এটিকে একটি যৌথ উদ্যোগ বা জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি হিসেবে ‘বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড’ নামে নতুন করে গঠন করা হোক। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, মাত্র সাত দিনের মাথায় এই বিশাল ও স্পর্শকাতর প্রস্তাবটিতে সরকারি অনুমোদন দিয়ে দেওয়া হয়।
১৯৭২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে (আরজেএসসি) এটি একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। জানা যায়, আরজেএসসি শুরুতে জাল ও অসম্পূর্ণ নথিপত্র গ্রহণে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল, কিন্তু ওপর মহলের প্রচণ্ড রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে তারা শেষ পর্যন্ত নথি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। নতুন কোম্পানিতে প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ধরা হয় মাত্র ১০ টাকা। শেয়ারের মালিকানা বণ্টন করা হয় ২:১ অনুপাতে। অর্থাৎ, কোম্পানিটির দুই-তৃতীয়াংশ বা প্রায় ৬৬ শতাংশ শেয়ার চলে যায় বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের পকেটে, আর বাংলাদেশ সরকার পায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ শেয়ার। এর মাধ্যমেই সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার একটি বিশাল ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানের একক মালিকানা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়।
এই দুর্নীতির সবচেয়ে চমকপ্রদ ও অভিনব দিকটি হলো বিদেশি মালিকদের দ্বৈত জালিয়াতি। ১৯৭১ সালের পর কোম্পানির বিদেশি মালিকরা যখন ঢাকা ছেড়ে ইসলামাবাদে ফিরে যায়, তখন তারা পাকিস্তান সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করে যে, পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে যাওয়ায় তারা তাদের বিশাল সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। এই মনগড়া ‘ক্ষতি’ পূরণের জন্য তারা পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ আদায় করে এবং বিশাল কর ছাড়ের সুবিধাও ভোগ করে।
পাকিস্তানের ওই কোম্পানির ১৯৭২, ১৯৭৩ এবং ১৯৭৪ সালের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশে তাদের দুটি কারখানা চিরতরে হারানোর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, একদিকে তারা সম্পদের মালিকানা হারানোর ভুয়া দাবি তুলে পাকিস্তানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ লুটে নিয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশে বসে এদেশের অসাধু আমলা ও রাজনীতিকদের বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে ম্যানেজ করে ঠিকই কোম্পানির সিংহভাগ মালিকানা নিজেদের কব্জায় রেখেছে। এক কথায়, একটি কোম্পানিকে তারা অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে দুটি ভিন্ন দেশের কাছে বিক্রি করে অবৈধ ফায়দা লুটেছে।
সময়ের পরিক্রমায় এই কোম্পানির নাম ও মালিকানায় আরও অনেক নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি (বিটিসি) তাদের নাম পরিবর্তন করে বর্তমান নাম ‘ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ’ (বিএটিবিসি) ধারণ করে। শেয়ার মালিকানার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আর্থিক হিসাব অনুযায়ী কোম্পানিতে বাংলাদেশ সরকারের শেয়ারের পরিমাণ ছিল ৩২ শতাংশ এবং ব্রিটেনের ‘রালি ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড’-এর হাতে ছিল প্রায় ৬৬ শতাংশ শেয়ার।
কিন্তু অত্যন্ত রহস্যজনক প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে বাংলাদেশ সরকারের শেয়ারের পরিমাণ কমতে থাকে। বর্তমানে কোম্পানির শেয়ার কাঠামোতে রালি ইনভেস্টমেন্টের শেয়ার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ দশমিক ৯১ শতাংশে। বিপরীতে বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত শেয়ারের পরিমাণ কমতে কমতে মাত্র ১০ শতাংশের কাছাকাছি এসে ঠেকেছে। কী প্রক্রিয়ায়, কোন জাদুবলে এবং কাদের ব্যক্তিস্বার্থে বছরের পর বছর ধরে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রের শেয়ার এভাবে জ্যামিতিক হারে কমানো হলো, তা অর্থনীতিবিদদের কাছে এক বিরাট বিস্ময়।
এমন পাহাড়সম দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তারা ইতোমধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই বহুজাতিক কোম্পানির মালিকানা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু করেছে। বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান উভয় দেশেই কোম্পানির পুরোনো দলিলপত্র, চুক্তি এবং বার্ষিক প্রতিবেদনগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এই জটিল আন্তর্জাতিক তদন্তকাজে পাকিস্তানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসকেও কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার যদি আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে পাচার হওয়া ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের সামান্য অংশও ক্ষতিপূরণ হিসেবে আদায় করতে পারে, তবে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে তা দেশের জন্য এক অভাবনীয় প্রাপ্তি হবে।
বাংলায় একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে—‘যে গরু দুধ দেয়, তার লাথিও ভালো’। এই প্রবাদের সবচেয়ে নিখুঁত উদাহরণ হলো এই টোব্যাকো কোম্পানিটি। যেহেতু তারা প্রতি বছর সরকারি কোষাগারে হাজার হাজার কোটি টাকা কর জমা দেয়, তাই তাদের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও অতীত ইতিহাস নিয়ে কেউ কখনো মাথা ঘামাতে চাননি। অনেকের মনে এই সংশয়ও রয়েছে যে, কোম্পানিটি যদি শুরুতেই সরকারের শতভাগ মালিকানায় চলে আসত, তবে আমলাতান্ত্রিক অব্যবস্থাপনার কারণে আদৌ তা থেকে এত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আসত কি না। তবে অর্থনীতিবিদ ও সুশাসনের বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু টাকার দোহাই দিয়ে এত বড় মাত্রার একটি ঐতিহাসিক জালিয়াতিকে আইনি বৈধতা দেওয়া যায় না।
যারা এই বিশাল দুর্নীতির বীজ বপন করেছিলেন, সেই ফিন্যান্স ম্যানেজার জামালউদ্দিন আহমেদসহ তৎকালীন প্রভাবশালীদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। তবে আইনি বিশেষজ্ঞরা একটি বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ দেখিয়েছেন। তাদের মতে, ৫ দীর্ঘ দশক পর এখন হুট করে কোম্পানিটির সম্পূর্ণ মালিকানা কেড়ে নেওয়ার বদলে, অবৈধভাবে সরকারি সম্পত্তি দখল ও ব্যবহারের জন্য তাদের কাছ থেকে ন্যায্য বকেয়া ভাড়া ও রাজস্ব আদায় করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র যেমন বিপুল অর্থ ফিরে পাবে, তেমনি অপরাধেরও বিচার হবে। এখন দেখার বিষয়, রাষ্ট্রের এই বিপুল অর্থ ফেরাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে।
তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪