শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ১২:১৫ পূর্বাহ্ন

পুলিশের গাড়ি নিয়ে বিপাকে এআই ক্যামেরা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

রাজধানী ঢাকার যানজট ও বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা, যা নগরবাসীর প্রাত্যহিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। তবে সম্প্রতি এই চিরচেনা বিশৃঙ্খল চিত্রে কিছুটা হলেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। রাস্তায় এখন আর কেবল ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় বা বাঁশির শব্দে গাড়ি থামছে না, বরং স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ক্যামেরার কড়া নজরদারিতে বাধ্য হয়েই নিয়ম মানতে শুরু করেছেন চালকরা। এমনকি গভীর রাতে যখন রাস্তায় কোনো ট্রাফিক পুলিশ থাকেন না, তখনও চালকরা সিগন্যালের লাল, হলুদ ও সবুজ বাতি মেনে গাড়ি চালাচ্ছেন। কারণ এআই ক্যামেরা কারও পদবি বা পরিচয় চেনে না; আইন অমান্য করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানার মামলা বা ই-প্রসিকিউশন চলে যাচ্ছে গাড়ির মালিকের ঠিকানায়। কিন্তু আধুনিক এই জরিমানার হাত থেকে বাঁচতে ঢাকার রাস্তায় এখন শুরু হয়েছে এক নতুন ধরনের প্রতারণা ও অভিনব ফাঁকিবাজি। এআই ক্যামেরাকে ফাঁকি দিতে অনেক চালক তাদের গাড়ির নম্বর প্লেট ইচ্ছাকৃতভাবে ঢেকে রাখছেন অথবা বিআরটিএ-র নিবন্ধিত নম্বর প্লেটের বদলে কেবল ইঞ্জিন নম্বর ব্যবহার করে রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

ট্রাফিক পুলিশের মাঠপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণ চালকদের পাশাপাশি আইন অমান্য করার এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে সরকারি গাড়িগুলোর ক্ষেত্রে। বিশেষ করে পুলিশের অনেক গাড়িও নম্বর প্লেটের পরিবর্তে ইঞ্জিন নম্বর ব্যবহার করে চলাচল করছে। এআই সিস্টেম মূলত গাড়ির নম্বর প্লেট স্ক্যান করে অপরাধীদের শনাক্ত করে, তাই ইঞ্জিন নম্বর লেখা গাড়িগুলো ক্যামেরার সামনে পড়লে স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং মামলা দিতে পারছে না। এটি ট্রাফিক বিভাগের জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের মোটরযান আইন অনুযায়ী, যেকোনো নতুন গাড়ি কেনার পর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে তার রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। এই রেজিস্ট্রেশনই হলো গাড়ির মালিকানার বৈধতার একমাত্র আইনি প্রমাণপত্র। শুধুমাত্র সেনাবাহিনীর নিজস্ব গাড়িগুলোর ক্ষেত্রে বিআরটিএ-র নিবন্ধনের প্রয়োজন হয় না, তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ‘মিলিটারি ভেহিকেল রেজিস্ট্রেশন’ করে থাকে। এর বাইরে সরকারি-বেসরকারি সকল সংস্থার গাড়ির জন্য বিআরটিএ-র নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। কিন্তু পুলিশের অধিকাংশ গাড়ি এই নিয়মের তোয়াক্কা না করে কেবল ইঞ্জিন নম্বর ব্যবহার করেই চলছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে পুলিশের অপারেশনাল কার্যক্রমে ১১ হাজার ৯২৩টি যানবাহন ব্যবহৃত হচ্ছে, যার মধ্যে ৬ হাজার ৪৪৫টি মোটরসাইকেল এবং ৫ হাজার ৪৭৮টি অন্যান্য গাড়ি (পাজেরো, পিকআপ ইত্যাদি)। এর পাশাপাশি পুরনো ও অকেজো হয়ে যাওয়ার কারণে বাহিনীতে প্রায় ৪ হাজার ৪৪৭টি গাড়ির বড় ধরনের ঘাটতিও রয়েছে, যার মধ্যে মোটরসাইকেলের ঘাটতিই সবচেয়ে বেশি। এই বিপুলসংখ্যক গাড়ির একটি বড় অংশ রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই সড়কে চলায় এআই ক্যামেরার কার্যকারিতা অনেকাংশেই ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশে একসময় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং মামলা দেওয়ার কাজটি পুরোপুরি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে হাতে লেখা স্লিপের মাধ্যমে করা হতো। এরপর ধাপে ধাপে পজ (POS) মেশিনের ব্যবহার শুরু হয় এবং সবশেষ চলতি জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে চালু হয়েছে এআই-ভিত্তিক ই-প্রসিকিউশন সিস্টেম। বর্তমানে রাজধানীর শাহবাগ থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত সড়কসহ ঢাকার প্রধান ১০টি পয়েন্টে এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ট্রাফিক বিভাগ গাড়ি শনাক্তকরণের জন্য বর্তমানে ১০৫টি অত্যাধুনিক ক্যামেরা ব্যবহার করছে। প্রজেক্ট শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি মামলা দেওয়া হয়েছে। সফটওয়্যারে নির্দিষ্ট করে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী—রেড সিগন্যাল অমান্য করা, জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর গাড়ি থামানো, উল্টো পথে বা রং ওয়েতে গাড়ি চালানো, নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যানজট সৃষ্টি করা এবং বাম দিকের লেন ব্লক করার মতো অপরাধগুলো শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়া হচ্ছে। আগামীতে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা এবং সিট বেল্ট না বাঁধার মতো অপরাধগুলোও এই ক্যামেরার আওতায় আনার কাজ চলছে।

তবে প্রযুক্তির এই ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। অনেক গাড়ির নম্বর প্লেট ভাঙা বা অস্পষ্ট থাকায় ক্যামেরা তা সঠিকভাবে পড়তে পারছে না। তাই ভুল মানুষের কাছে যেন জরিমানার মেসেজ না যায়, সেজন্য ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজগুলো ম্যানুয়ালি বা মানবীয় হস্তক্ষেপে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে, প্রমাণ হিসেবে তার অপরাধের ২৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এরপর গাড়ির মালিকের মোবাইল নম্বরে মেসেজ এবং ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ১৫ দিনের মধ্যে সশরীরে হাজির হয়ে জরিমানা দিয়ে মামলা নিষ্পত্তি করতে বলা হচ্ছে, অথবা তিনি চাইলে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আপিলও করতে পারবেন। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, শুরুর দিকে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ গাড়ি ওভারস্পিড বা অতিরিক্ত গতিতে চলত, যা ক্যামেরার ভয়ে এখন দিনে ২০-২৫টিতে নেমে এসেছে। এছাড়া আইন অমান্যকারীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে পয়েন্ট কাটার জরিমানাও শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে এক হাজারের বেশি চালকের লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটা গেছে।

এআই ক্যামেরার এই উদ্যোগ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বড় ভূমিকা রাখলেও কিছু সাধারণ চালক এর সফলতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, যারা বৈধ লাইসেন্সধারী এবং নিবন্ধিত গাড়ি চালান, তারাই কেবল এই আইনের বেড়াজালে আটকে জরিমানা গুনছেন। অন্যদিকে লাইসেন্সবিহীন চালক এবং অনিবন্ধিত গাড়িগুলো পার পেয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, যেসব চালক নম্বর প্লেট লুকিয়ে বা ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে রাস্তায় চলছেন, তাদের কঠোরভাবে খোঁজ করা হচ্ছে। প্রতারণার প্রমাণ পেলে তাদের গাড়ি ডাম্পিং করা এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করার মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি স্টিকারযুক্ত যেসব গাড়ি ইঞ্জিন নম্বর দিয়ে চলছে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, এআই প্রযুক্তি সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর একটি দারুণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সিস্টেমের ভেতরে গলদ রেখে এবং অনিবন্ধিত গাড়িগুলোকে ছাড় দিয়ে এর শতভাগ সুফল কখনোই পাওয়া সম্ভব নয়। কারোর পরিচয় বা পদের দিকে না তাকিয়ে সবার জন্য সমানভাবে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে পারলেই কেবল এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে ঢাকার রাস্তায় প্রকৃত সুশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর


এ জাতীয় আরো খবর...