মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রারম্ভে নিজেদের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তথা ‘রাস লাফান গ্যাস কমপ্লেক্স’কে ইরানি হামলা থেকে রক্ষা করতে তেহরানের সঙ্গে কাতার একটি অত্যন্ত গোপন চুক্তির চেষ্টা করেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে। তবে গত মার্চ মাসের মাঝামাঝিতে কাতারের ওই বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রে ইরানের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দোহার সেই গোপন প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ভেস্তে যায়। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই গ্যাস প্ল্যান্টে ইরানি হামলায় কাতারের এলএনজি রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে, যা মেরামত করতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগবে।
আঞ্চলিক ও পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতেই কাতার নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে তেহরানের কাছে একটি পারস্পরিক লাভজনক প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়েছিল। কাতারের মৌখিক প্রস্তাব ছিল, ইরান যেন কোনোভাবেই তাদের রাস লাফান গ্যাস কমপ্লেক্সে আঘাত না করে। এর বিনিময়ে কাতার একতরফাভাবে তাদের গ্যাস উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে। কাতার ভালো করেই জানতো যে, বিশ্বের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মেটানো এই প্ল্যান্ট বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হবে। এর ফলে তৈরি হওয়া তীব্র অর্থনৈতিক চাপ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে বাধ্য করবে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, কাতার কার্যত বিশ্ববাজারে গ্যাস সরবরাহের নিয়ন্ত্রণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যুদ্ধ থামানোর টোপ দিয়েছিল, তবে ইরানের প্রতি তাদের শর্ত ছিল মাত্র একটি—‘আমাদের ওপর কোনো হামলা চালাবেন না।’
গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতার এই বিষয়ে ইরানের কাছ থেকে কোনো লিখিত বা আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি না পেলেও যুদ্ধের শুরুর দিকে দোহার কিছু পদক্ষেপ পর্দার আড়ালের সমঝোতার দিকেই ইঙ্গিত দেয়। যুদ্ধের তৃতীয় দিনে, যখন ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছিল, ঠিক তখনই কাতার আকস্মিকভাবে রাস লাফান বন্ধ করে দেয়। কাতার তখন এর কারণ হিসেবে ‘অপারেশনাল সুবিধায় সামরিক হামলা’র কথা বললেও, ওয়াশিংটন পোস্ট-এর বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে সে সময় রাস লাফানে কোনো ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা যায়নি। একই সময়ে কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সতর্ক করেছিলেন যে, এই যুদ্ধ ‘বিশ্বের অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেবে’, যা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি করেছিল।
ওয়াশিংটন পোস্টের এই বিস্ফোরক রিপোর্টের জবাবে কাতার ইরানের সঙ্গে যেকোনো ধরনের গোপন সমঝোতার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। কাতারের আন্তর্জাতিক মিডিয়া অফিস এক লিখিত বিবৃতিতে জানিয়েছে, জ্বালানি উৎপাদনের মতো অপারেশনাল সিদ্ধান্ত ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে বা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল—এমন যেকোনো দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। কাতার দাবি করেছে, রাস লাফানে উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্তটি ছিল কেবলই সম্ভাব্য হামলার মুখে সেখানে কর্মরত কর্মী ও অবকাঠামোর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে। তারা এই অভিযোগকে চলমান মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা নস্যাৎ করার এবং কাতার-যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্ককে ক্ষুণ্ন করার একটি অপচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই গোপন প্রচেষ্টা মূলত প্রমাণ করে যে বর্তমান প্রজন্মের এই ভয়াবহতম যুদ্ধ থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো পর্দার আড়ালে কতটা মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত টিমি ডেভিস বলেন, কাতার বহু বছর ধরে একটি বিশেষ আত্মরক্ষা কৌশল বেছে নিয়েছে; তারা সরাসরি কোনো লেনদেনের প্রস্তাব হয়তো ইরানকে দেয়নি, তবে তাদের জরুরি পরিকল্পনাগুলো কীভাবে ইরানের জন্য ইতিবাচক হতে পারে, তা তেহরানের কাছে তুলে ধরতে দ্বিধা করেনি।
কৌশলগতভাবে কাতার এক জটিল অবস্থানে রয়েছে। একদিকে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইরানের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দোহার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এবং তারা ইরানের সমর্থনপুষ্ট হামাসের নেতাদের দোহায় অবস্থান করতে দিয়েছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও দোহার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কাতারে অবস্থিত আল-উদিদ বিমান ঘাঁটি হলো এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বৃহত্তম ঘাঁটি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর দোহা তাকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি বোয়িং ৭৪৭ বিমান উপহার দিয়েছিল। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কাতারের এই গোপন তৎপরতার তথ্য জানলেও এর ফলে ওয়াশিংটন ও দোহার সম্পর্কে কোনো ফাটল ধরেনি।
কাতারের এই গোপন সুরক্ষাকবচ শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি। যুদ্ধের প্রথম দিনেই মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার ঘনিষ্ঠ মহলের বেশির ভাগ সদস্য নিহত হওয়ার পর, ২ মার্চ ইরান উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর ক্ষেপণাস্ত্রের বন্যা বইয়ে দেয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৮ মার্চ ইসরায়েলি হামলায় ইরানের নিজস্ব গ্যাস অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার পর, ইরান পাল্টা আঘাত হেনে কাতারের রাস লাফান গুঁড়িয়ে দেয়। জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি পরে জানান, এই হামলায় কাতারের এলএনজি রপ্তানির বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। এটি কেবল কাতারের অর্থনীতিতেই নয়, বরং চীনের মতো বড় ক্রেতাদের সঙ্গে কাতারের শত কোটি ডলারের চুক্তিকে ঝুঁকির মুখে ফেলার পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে।