শিরোনামঃ
মধ্যবয়সী নারীর সংকট: ভিন্ন ভাবনা পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত করতে রাজি হয়েছে ইরান শূন্যরেখায় ৩ দিন আটকে থাকার পর ১২ জনকে ফেরত নিল বিএসএফ অনলাইন প্রতারণা মামলায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৌহিদ আফ্রিদিকে গ্রেফতার স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপির তিন মানদণ্ড, জোটবদ্ধ ভোটের চিন্তা বেনজীরের বিরুদ্ধে ৩টি গ্রেফতারি পরোয়ানা, দেশে ফিরলেই রিমান্ড চাইবে ট্রাইব্যুনাল ইসলামী ব্যাংককে আরও ২৫০০ কোটি টাকা বিশেষ ধার দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক, পর্ষদ বাতিল আদ-দ্বীন মেডিক্যালের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আশ্বাস দেশে নতুন অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়াল দিল্লির ঘটনায় ভারতীয় দূতকে তলব করল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ১২:২০ পূর্বাহ্ন

ভারতীয় ইমিগ্রেশনের বাধায় দিল্লি থেকে ঢাকায় ফিরলেন উপদেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

ভারতের রাজধানী দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের বাধায় পড়েছেন বাংলাদেশের নবনিযুক্ত প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন প্রধানমন্ত্রীর পলিসি, স্ট্রাটেজি এবং তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও নজিরবিহীন ঘটনার মুখে দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে আটকে থাকার পর ক্ষোভে ও অভিমানে তিনি শেষ পর্যন্ত ভারতে প্রবেশ না করেই শ্রীলঙ্কার কলম্বো হয়ে সোমবার দুপুর নাগাদ ঢাকায় ফিরে এসেছেন। বাংলাদেশের এক উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টাকে ভারতের মাটিতে এমন হেনস্তা ও দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনাকে অত্যন্ত ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই ঘটনার পর দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সমীকরণ নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক ডালপালা মেলতে শুরু করেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তীব্র অসন্তোষ ও তদন্তের ঘোষণা

সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি বেশ গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, “এটি অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত এবং একটি দুঃখজনক ঘটনা। আমাদের একজন উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টার সাথে এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছে এবং যথাযথ কূটনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। আমরা পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে দিন শেষে বিস্তারিত তথ্য ও আমাদের অবস্থান সংবাদমাধ্যমকে জানাব।”

পরবর্তীতে এই বিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি ভারতের এই আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই ধরনের ঘটনা অবশ্যই স্বাগত জানানোর মতো নয় এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমরা এমন আচরণ মোটেও প্রত্যাশা করি না। আমাদের মন্ত্রণালয় বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে। সম্পূর্ণ ঘটনা সুনির্দিষ্টভাবে জানার পর যদি কোনো কড়া অ্যাকশন বা কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে বাংলাদেশ সরকার তা অবশ্যই নেবে।” ভারতের হাইকমিশনারকে তলব করা হবে কি-না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “তার আগে আমাদের সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালককে (ডিজি) প্রকৃত ঘটনাটি জানতে হবে। ভারতের ইমিগ্রেশনে ঠিক কী কারণে এই জটিলতা তৈরি হলো, সেই সমস্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর মন্ত্রণালয় থেকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

দিল্লি বিমানবন্দরে ঠিক কী ঘটেছিল?

দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং ভারতের সংশ্লিষ্ট দফতর সূত্রে জানা গেছে, আজ থেকে দিল্লিতে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন’-এর একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের। সেই উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে রোববার বেলা তিনটার দিকে একটি নিয়মিত ফ্লাইটে তিনি দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হন। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, তাঁর এই রাষ্ট্রীয় সফরের বিষয়ে আগে থেকেই অফিশিয়াল কূটনৈতিক চিঠির (Diplomatic Note) মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছিল। এমনকি দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই সফরের বিষয়ে সম্পূর্ণ তথ্য দিয়ে রেখেছিল।

তবে বিমানবন্দরে জটিলতার সূত্রপাত হয় উপদেষ্টার পাসপোর্ট ও ভিসা স্টিকারকে কেন্দ্র করে। প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন হওয়ায় জাহেদ উর রহমান বাংলাদেশের ‘কূটনৈতিক পাসপোর্ট’ (Diplomatic Passport) পাওয়ার আইনগত অধিকারী হলেও, এই সফরে তিনি নিজের পুরোনো সাধারণ পাসপোর্টটি ব্যবহার করেছিলেন। আর ভিসা হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছিলেন কয়েক বছর আগে নেওয়া একটি ‘সার্ক ভিসা স্টিকার’। বিমান থেকে নামার পর তিনি যখন ইমিগ্রেশন কাউন্টারে পাসপোর্ট জমা দেন, তখন ভারতীয় কর্মকর্তারা তাঁকে কাউন্টারের পাশে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বলেন। সূত্রমতে, ইমিগ্রেশনের কম্পিউটারে জাহেদ উর রহমানের পাসপোর্টটি ভারত সরকারের বিশেষ সতর্কতামূলক আপত্তি তালিকায় বা ‘ফ্ল্যাগড’ (Flagged) হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছিল। এর ফলে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

ভারতে প্রবেশের অনুমতি সত্ত্বেও ঢাকায় প্রত্যাবর্তন

উপদেষ্টাকে স্বাগত জানাতে আগে থেকেই দিল্লি বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হাইকমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বাংলাদেশের একজন শীর্ষ প্রতিনিধিকে ইমিগ্রেশনে আটকে রাখার খবর দ্রুত ঢাকায় পৌঁছালে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের উচ্চপর্যায়ে দফায় দফায় জরুরি ফোনালাপ ও কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু হয়। বাংলাদেশ হাইকমিশনের তীব্র আপত্তি ও তৎপরতার মুখে একপর্যায়ে ভারতীয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ভুল বুঝতে পেরে জাহেদ উর রহমানকে শর্তহীনভাবে দিল্লিতে প্রবেশের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেয়।

তবে দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে আটকে থাকা, হয়রানির শিকার হওয়া এবং গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার পর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া অনুমতি প্রত্যাখ্যান করেন এবং অপদস্থ হয়ে ভারতের মাটিতে প্রবেশ না করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তৎক্ষণাৎ বাংলাদেশে ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করলে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ব্যবস্থাপনায় রোববার রাত ১টার দিকে তিনি দিল্লির ফ্লাইট ছেড়ে শ্রীলঙ্কার কলম্বোর উদ্দেশ্যে রওনা হন। পরে কলম্বো বিমানবন্দর থেকে আজ সকালে কানেক্টিং ফ্লাইটে চড়ে সোমবার দুপুর নাগাদ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। এই ঘটনার বিষয়ে কথা বলতে বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে জাহেদ উর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ইউটিউব চ্যানেল নিষিদ্ধের পুরোনো বৈরিতা

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহেদ উর রহমানের প্রতি ভারত সরকারের এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির গোড়াপত্তন হয়েছিল আরও আগেই। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগেই জাহেদ উর রহমানের ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেলটি ভারতের অভ্যন্তরে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও ব্লক করা হয়েছিল। আজকেও ভারত থেকে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে ঢোকার চেষ্টা করা হলে স্ক্রিনে একটি সতর্কবার্তা ভেসে উঠছে, যেখানে লেখা রয়েছে—‘জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পর্কিত সরকারের একটি আদেশের কারণে এই কনটেন্ট এখন পাওয়া যাচ্ছে না’।

উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা সরকারের শেষ দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন টক শো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন জাহেদ উর রহমান। পরবর্তীতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সাধারণ নির্বাচনের পর বিএনপি এককভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘পলিসি, স্ট্রাটেজি এবং তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা’ হিসেবে নিয়োগ দেন।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন টানাপোড়েন

এই নজিরবিহীন বিমানবন্দর কেন্দ্রিক ঘটনার পর বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক একবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকলেও, চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের তরফ থেকেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠন ও উন্নয়নের তীব্র আগ্রহ প্রকাশ পাচ্ছিল।

তবে দ্বিপাক্ষিক এই মধুর সম্পর্কের আবহ তৈরি হওয়ার মাঝেই সম্প্রতি ভারতের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন পয়েন্টে ‘কথিত বাংলাদেশি’ বা পুশ-ইন এর নামে জোরপূর্বক লোক ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। এই সীমান্ত অনুপ্রবেশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই দেশের সীমান্তে এক ধরণের তীব্র সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এমন একটি সংবেদনশীল সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর একজন শীর্ষ উপদেষ্টাকে ভারতের বিমানবন্দরে এভাবে আটকে রেখে হেনস্তা করার ঘটনা দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক আস্থায় বড় ধরণের ফাটল ধরাতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


এ জাতীয় আরো খবর...