নানা জল্পনা-কল্পনা, দীর্ঘসূত্রতা আর পর্দার আড়ালের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে চূড়ান্ত আলোর মুখ দেখছে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ও বহুল আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারি ‘বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ চুরি’ মামলার তদন্ত। ঘটনার দীর্ঘ এক দশক (১০ বছর) পর অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এই মামলার একটি পূর্ণাঙ্গ ও বস্তুনিষ্ঠ খসড়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) এবং ডকেট প্রস্তুত করেছে। এই চাঞ্চল্যকর ডিজিটাল ডাকাতির ঘটনায় দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার এই সুবিশাল খসড়া অভিযোগপত্র ও প্রমাণক নথিপত্র চূড়ান্ত আইনি পরামর্শের জন্য ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দেশের আর্থিক খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে একটি কঠোর বার্তা দিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই খসড়া অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করা উচিত।
তদন্তের নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, এই আন্তর্জাতিক জালিয়াতি চক্রের সাথে বাংলাদেশসহ মোট সাতটি দেশের অপরাধী নেটওয়ার্ক জড়িত ছিল। খসড়া চার্জশিটে ৩৬ জন বিদেশি নাগরিক এবং ১৮টি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। দেশভিত্তিক হিসেবে ফিলিপাইনের ৩৬, উত্তর কোরিয়ার ২, চীনের ৩, শ্রীলঙ্কার ৮, জাপানের ১, ভারতের ৪ এবং বাংলাদেশের ১০টি নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশি ১০ জন আসামির তালিকায় খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ তৎকালীন একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার নাম রয়েছে। খসড়া চার্জশিটে অভিযুক্ত অন্য বাংলাদেশিরা হলেন— আনিস এ খান, কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, শুভঙ্কর সাহা, রেজাউল করিম, জোবায়ের বিন হুদা, এ এফ এম আসাদুজ্জামান, মেজবাউল হক, আবুল কাসেম ও মো: সুলতান মাসুদ আহম্মেদ।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা সুইফট পেমেন্ট পদ্ধতিতে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি করে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার ৩৯ দিন পর ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুরু থেকেই সিআইডি এর তদন্তভার গ্রহণ করলেও বিগত সরকারের আমলে তদন্ত আলোর মুখ দেখেনি।
দীর্ঘদিন তদন্ত ঝুলে থাকার পর, গত বছরের ১১ মার্চ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। সিআইডির তৎকালীন প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো: ছিবগাত উল্লাহর দিকনির্দেশনায় এবং এই বিশেষ কমিটির নিবিড় তত্ত্বাবধানেই এক দশকের জটিল তদন্ত প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হয়। গত ১ এপ্রিল খসড়া চার্জশিটটি প্রস্তুত করে আইনি মতামতের জন্য পাঠানো হয়।
মামলার বর্তমান এবং সর্বশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন (যিনি গত বছরের ডিসেম্বরে দায়িত্ব নেন) বলেন, “তদন্তের ৮০ শতাংশ কাজ প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তাই শেষ করে গিয়েছিলেন। পরে অন্য কর্মকর্তারা আরও কিছু অকাট্য তথ্য যুক্ত করেন। শতভাগ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা একটি নির্ভুল খসড়া চার্জশিট প্রস্তুত করেছি। সিআইডির পক্ষ থেকে আর কোনো কাজ বাকি নেই। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে আইনি পরামর্শ পেলেই পরবর্তী আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
তার আগে ২০২৫ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মো: ফরহাদ কবির। প্রধান অপরাধীদের চিহ্নিত করার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “তদন্ত শেষ পর্যায়ে এলেও প্রধান ডিজিটাল অপরাধীকে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা যাচ্ছিল না। পরে আমাদের একটি আইটি ফরেনসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার পার্ক জিয়ন হিয়ক এবং তার পরিচালিত কুখ্যাত ‘ল্যাজারাস গ্রুপ’কে চুরির মূল কারিগর হিসেবে শনাক্ত করে। তদন্ত তদারককারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খানের সহযোগিতায় এফবিআই-এর বিশেষ এজেন্ট নাথান পি. শিল্ডের কাছ থেকে সেই গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্টটি সংগ্রহ করে প্রধান আসামিদের মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পাশাপাশি ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকে পাচার হওয়া ৮১ মিলিয়ন ডলারের গতিপথও সফলভাবে উন্মোচন করা সম্ভব হয়েছে।”
এর আগে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ ইয়াসিন। সে সময় মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) হস্তান্তরের আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চললেও জুলাই অভ্যুত্থানের পর তা ভেস্তে যায়। পরে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মং থোয়াই মারমা।
মামলার প্রথম এবং দীর্ঘকালীন (২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট) তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান তাঁর সাত বছরের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “তদন্তের শুরুতে অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। চুরির ৪১ দিন পর মামলা হওয়ায় আমরা মূল ‘ক্রাইম সিন’ অক্ষত পাইনি। আমাদের আগেই একটি অননুমোদিত বিদেশি আইটি ফার্ম ও কিছু দেশি ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করে আলামত নষ্টের চেষ্টা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও আমাদের টিম অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দেশে-বিদেশে সব ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ করে এবং আদালতের অনুমতি নিয়ে সিআইডির আইটি ফরেনসিক ল্যাবে পাঠায়। পারস্পরিক আইনগত সহায়তার (MLAR) মাধ্যমে আমরা ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মায়া দেগুইতোর জবানবন্দী সংগ্রহ করি, যেখানে অনেক বিদেশি আসামির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় চুরি হওয়া অর্থের ৩৪.৬ মিলিয়ন ডলার দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।”
পর্যালোচনা কমিটির অন্যতম সদস্য এবং সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, “আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিদর্শন করে কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছি এবং টেকনিক্যাল বিষয়গুলো খতিয়ে দেখেছি। বিগত সরকারের আমলে প্রথম দিকের তদন্ত কর্মকর্তারা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কাজ করলেও তাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ ও হুমকি ছিল। তদন্তে আসা বাংলাদেশি ১০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায় থেকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন সৎ তদন্ত কর্মকর্তা রায়হান উদ্দিন খানকে হুট করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরিয়ে দিয়ে তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার নগ্ন চেষ্টাও হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকারের বিশেষ পর্যালোচনা কমিটির কঠোর নজরদারির কারণে সব অপরাধীকে চিহ্নিত করে খসড়া অভিযোগপত্র চূড়ান্ত করা হয়েছে। আমরা আশা করি, বর্তমান সরকার দ্রুততম সময়ে এই বিচার কার্যক্রম শেষ করে বিশ্ব দরবারে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।”
খসড়া চার্জশিটে অভিযুক্ত উল্লেখযোগ্য বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো হলো:
ফিলিপাইন (ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান): কাম সিন অং, মায়া সান্তোস দেগুইতো, রাউল ভিক্টর বি তান, ব্রিজিট আর কাপিনা, নেস্টর ও পিনেদা, রোমুয়ালদো এস আগারাডো, অ্যাঞ্জেলা রুথ এস টরেস, লরেঞ্জো তান, ন্যান্সি জাও কিওগ, ডেনিস সি ব্যানকোড, ইসমায়েল আর রেয়েস, সাবিনো এম ইকো, লিজের্ত জে রাসেলা, রিচার্ড ইনসাইন, উইলিয়াম সো গো (মৃত), সালুদ রেয়েস বাউতিস্তা শেবা, মিশেল বাউতিস্তা কনকন, অ্যান্থনি এ পেলেজো, জন ইউ, লুইস ফ্যাব্রেগাস খো, ম্যান পো চ্যান, মিং ই সাইমন সি, রোজালিও পারান্টা তান্দুয়ান, এনরিক কে রাজান, থমাস আরাসি, জোসে এদুয়ার্দো জে আলারিলা, ক্রিশ্চিয়ান আর গঞ্জালেস, ডোনাটো সি আলমেদা ও ফ্লিন্ট রিচার্ডসন। প্রতিষ্ঠান: রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি), ফিলরেম সার্ভিস করপোরেশন, সেঞ্চুরিটেক্স ট্রেডিং, আব্বা কারেন্সি এক্সচেঞ্জ, বিকন কারেন্সি এক্সচেঞ্জ, মিডাস ক্যাসিনো ও সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো।
উত্তর কোরিয়া: পার্ক জিন হিয়ক ও হ্যাকিং গোষ্ঠী ‘ল্যাজারাস গ্রুপ’।
চীন: ডিং ঝিজে, গাও শুহুয়া ও উইকাং জু।
শ্রীলঙ্কা: হেগোডা গামাগে শ্যালিকা পেরেরা, ইমিয়াগে ডন মিউরিন রানাসিংহে, রামানায়াকা আরাচিগে ডন প্রদীপ রোহিত দামকিন, булুগাহা আরামবেগেদারা সাঞ্জিবা তিসা বান্দারা, উইরাপুলি মুহান্দিরামগে প্রিয়াঙ্কা জয়দেবা, লুইস হান্নাদিগে শিরানি ধম্মিকা ফার্নান্দো, নিশান্ত নালাকা ওয়ালাকুলু আরাচি ও ‘শ্যালিকা ফাউণ্ডেশন’।
জাপান: সাসাকি।
ভারত: নীলভান্নান মাদুক্কুর আনন্দন, প্রীতম রেড্ডি, সুধীন্দ্র আথ্রেশ ও রাকেশ আস্থানা।
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত ও কালের কন্ঠ