পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতা বদলের পর থেকেই বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে এক অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে জোরপূর্বক ও অবৈধভাবে বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে দেওয়ার তথা ‘পুশইন’ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর কঠোর নজরদারি এবং সীমান্তসংলগ্ন এলাকার সাধারণ বাসিন্দাদের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে সমতল সীমান্তগুলোতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে ভারতীয় বাহিনী। এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার পর বিএসএফ এখন তাদের অনুপ্রবেশের সনাতন কৌশল ও রুট সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছে। সহজে পাহারা দেওয়া বা নজরদারি করা যায় এমন সমতল সীমান্তগুলো এড়িয়ে বিএসএফ এখন বেছে নিচ্ছে নদীমাতৃক চরাঞ্চল, যোগাযোগবিচ্ছিন্ন দুর্গম সমতল এবং পাহাড়ি খাঁজগুলোকে, যা বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষায় এক নতুন ও জটিল নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কৌশল পরিবর্তনের আগে বিএসএফ মূলত সমতল ও সহজে যাতায়াতযোগ্য সীমান্ত এলাকাগুলোকে পুশইনের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করত। তখন তাদের অনুপ্রবেশ ঘটানোর একটি সুনির্দিষ্ট ও চেনা ছক ছিল। প্রথমত, রাতের অন্ধকারে বিএসএফ সদস্যরা বিশেষ ট্রাকে করে পুশইনের উদ্দেশ্যে চিহ্নিত ব্যক্তিদের নিয়ে আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাঁটাতারের একদম কাছে এসে দাঁড়াত। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় সীমান্তে থাকা তাদের নিজস্ব শক্তিশালী ফ্লাডলাইটগুলো হুট করে বন্ধ করে দেওয়া হতো। মুহূর্তের মধ্যে পুরো সীমান্ত এলাকা ঘুটঘুটে অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার এই সুযোগটিকেই তারা কাজে লাগাত। এরপর কাঁটাতারের গেট খুলে বা অরক্ষিত অংশ দিয়ে জোরপূর্বক মানুষকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হতো।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই চেনা কৌশলটি পুরোপুরি মাঠে মারা গেছে। সমতল সীমান্তগুলোতে বিজিবির টহল কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রতিরোধটি এসেছে সীমান্তসংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে। ভারতীয় বাহিনীর পুশইন রুখতে লাঠিসোঁটা ও আলো নিয়ে সাধারণ মানুষ এখন রাত জেগে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। স্থানীয়দের এই অতন্দ্র প্রহরা ও বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে বিএসএফ তাদের পুরোনো ট্রাক ও আলো নেভানোর কৌশল থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। আর এই ব্যর্থতার পরই তারা বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত কিছু সুনির্দিষ্ট দুর্বলতাকে চিহ্নিত করে নতুন রুট তৈরি করেছে।
বিএসএফের নতুন কৌশলের মূল লক্ষ্যই হলো নজরদারির আড়ালে থাকা। আর এজন্য তারা জামালপুরের বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ এবং কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজীবপুর সীমান্তের প্রায় ৭২ কিলোমিটার এলাকাকে বেছে নিয়েছে। এই বিশাল সীমান্ত অঞ্চলের একটি বড় অংশই ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত প্রত্যন্ত, যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এবং দুর্গম। চারপাশে বিস্তীর্ণ সমতল ধু-ধু মাঠ, নদী-নালা আর বিশাল চরাঞ্চল অনুপ্রবেশকারীদের জন্য সহজ পথ তৈরি করে দিয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তে নিজস্ব অংশে কোথাও কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। ফলে রাতের অন্ধকারে এই বিস্তীর্ণ অন্ধকার চরাঞ্চলকে ফাঁকি দেওয়া সহজ বলে মনে করছে বিএসএফ।
নতুন এই রুটকে হাতিয়ার বানিয়ে গত সোমবার (১৫ জুন) রাতে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে পুশইনের একটি বড় চেষ্টা চালায় বিএসএফ। সোমবার গভীর রাতে ভারতের ১৬০ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের অধীন দরগাপাড়া ক্যাম্পের জোয়ানেরা সীমান্তের কাঁটাতারের গেট খুলে দেয়। এরপর আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলারের পাশ দিয়ে এক ব্যক্তিকে জোরপূর্বক বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে ঝাউডাঙ্গা বিওপির বিজিবি সদস্যরা অত্যন্ত তৎপর থাকায় বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে টের পেয়ে যান এবং জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় গ্রামবাসীরাও লাঠিসোঁটা নিয়ে দ্রুত সীমান্তে সতর্ক অবস্থান নিলে বিএসএফের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বর্তমানে ওই ব্যক্তি আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখায় (জিরো পয়েন্ট) ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছেন।
সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, যেসব দুর্গম পয়েন্টে বাংলাদেশের অংশে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ও ডিজিটাল নজরদারির ঘাটতি রয়েছে, ঠিক সেখানেই রাতে সুকৌশলে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। ভারতের সীমান্তে ফ্লাডলাইট কখন বন্ধ করা হয় এবং কখন রাতের অন্ধকারে মানুষ ঠেলে দেওয়া হয়, তা বুঝে ওঠা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এই সীমান্ত অঞ্চলগুলোর ভেতরের রাস্তার অবস্থা এতটাই নাজুক ও ভাঙাচোরা যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক চলাচল করাই এক প্রকার অসম্ভব।
যোগাযোগের এই চরম অব্যবস্থাপনা ও রাস্তার খারাপ অবস্থার সুযোগটিই মূলত বিএসএফ বৈজ্ঞানিকভাবে কাজে লাগাচ্ছে। তারা খুব ভালো করেই জানে, কোনো প্রত্যন্ত পয়েন্ট দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করলে দুর্গমতার কারণে বিজিবি বা স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে। এই ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও যাতায়াতের দীর্ঘসূত্রতাকেই ভারতীয় বাহিনী তাদের পুশইনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র বানিয়েছে। একটি মানবিক সংকটের সংবাদ সংগ্রহ করতেও গণমাধ্যমকর্মীদের প্রায় ১০০ কিলোমিটার ভাঙা পথ পাড়ি দিয়ে প্রত্যন্ত সীমান্তে আসতে হচ্ছে, যা এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার কঙ্কালসার চিত্রকে ফুটিয়ে তোলে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী জনগণের মতে, ভারত যেভাবে নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষায় শতভাগ ফ্লাডলাইট, আধুনিক পিচঢালা রাস্তা ও কাঁটাতারের ব্যাপক অবকাঠামো গড়ে তুলেছে, ঠিক তেমনি বাংলাদেশকেও এই ঝুঁকিপূর্ণ অংশে নিজস্ব কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের সাহসী উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সীমান্ত সড়ক, স্থায়ী পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও আধুনিক থার্মাল নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু জনবল বা পাহারা বাড়িয়ে কয়েক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়। বিএসএফের এই কৌশলগত অনুপ্রবেশ রুখতে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বর্ডার ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক মোস্তাকিম আকাশ এই সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, “আমাদের বর্ডারে তো সিকিউরিটির বড় ধরনের ঘাটতি আছেই, ফলে বর্ডারটা অনেকটাই অরক্ষিত ও ইনসিকিউরড রয়ে গেছে। এখানে আমাদের নিজস্ব সীমানা বেড়া নেই এবং আমাদের এক ধরনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও দীর্ঘদিন ধরে স্পষ্ট। তবে এর চেয়েও বড় দুর্বলতা আমাদের ডিপ্লোমেসি বা কূটনীতিতে। আমাদের দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি খুবই দুর্বল হওয়ার কারণেই আমরা আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের এই অনৈতিক পুশইনের বিষয়টি এবং আমাদের সঠিক অবস্থানটা জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারছি না।” বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই কৌশলগত অনুপ্রবেশ চিরতরে বন্ধ করতে হলে সামরিক প্রতিরক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক টেবিলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকেও সমভাবে শক্তিশালী করতে হবে।
তথ্যসূত্র: শীর্ষনিউজ