শিরোনামঃ
পর্তুগাল–স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র–বেলজিয়াম দ্বৈরথ: কার জয়রথ চলবে কোয়ার্টার ফাইনালে মেয়ের বিয়ে: আমিন চাচার আট পরামর্শ পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল শুনানি মুলতবি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিসহ ২০০ বিদেশি আটক প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ গুলশান লেকের পরিবেশ রক্ষা ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ : ডা. জুবাইদা রহমান অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্ততি ইসির ফিলিস্তিনকে সমর্থন করায় খামেনিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: হুথি মুখপাত্র গাজার শাসনভার ছাড়ার ঘোষণা হামাসের
সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ১১:৫২ অপরাহ্ন

মানুষের দ্বিমুখী আচরণের মনস্তাত্ত্বিক রহস্য এবং সুরক্ষার উপায়

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬

অফিসের ক্যান্টিন কিংবা চায়ের আড্ডায় আপনারই কোনো এক পরিচিত ব্যক্তি অত্যন্ত বিশ্বস্ত ভঙ্গিতে বললেন, ‘জানেন ভাই, অমুক মানুষটা একদম সুবিধার না!’ অথচ ঠিক আধঘণ্টা পর দেখা গেল, সেই ব্যক্তিই আবার ওই মানুষের কাঁধে হাত দিয়ে হাসিমুখে গল্প করছেন এবং ফিসফিস করে আপনারই কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন。 সমাজে এমন ‘মুখোশ’ পরা মানুষের অভাব নেই, যাদের মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘টু-ফেইসড’ বা দ্বিমুখী আচরণের মানুষ বলা হয়。 আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ পরনিন্দা মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা。

মানুষ কেন এমন দ্বিমুখী আচরণ করে?

যুক্তরাজ্যের মনোচিকিৎসক ডা. লিন্ডা বারম্যান-এর গবেষণা অনুযায়ী, কিছু মানুষ মূলত কয়েকটি নির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক কারণে এই ধরনের নেতিবাচক কাজগুলো করে থাকেন:

  • মিথ্যা অন্তরঙ্গতা তৈরি: অনেকে অন্যের সমালোচনাকে ‘সামাজিক আঠা’ হিসেবে ব্যবহার করে। আপনার সামনে অন্য কারও গোপন বা নেতিবাচক তথ্য ফাঁস করে সে বোঝাতে চায়—‘আমি তোমাকে খুব বিশ্বাস করি’। এতে সাময়িকভাবে একটি কৃত্রিম সম্পর্ক বা ‘বন্ডিং’ তৈরি হয়।

  • নিরাপত্তাহীনতা ও কম আত্মমর্যাদা: যারা ভেতরে ভেতরে তীব্র হীনম্মন্যতায় ভোগেন, তারা অন্যদের ছোট করে নিজেদের বড় দেখানোর চেষ্টা করে। অন্যের ব্যর্থতা বা ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করলে তাদের অবদমিত অহংকারে সাময়িক তৃপ্তি আসে।

  • সামাজিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা: অন্যের গোপন তথ্য নিজের কাছে রাখাকে এরা এক ধরনের ‘ক্ষমতা’ মনে করে। তথ্য আদান-প্রদান বা কূটনামি করে তারা অফিস বা পারিপার্শ্বিক সমাজকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।

  • প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়: অনেক সময় নিজেকে সবার প্রিয় পাত্র হিসেবে টিকিয়ে রাখতে মানুষ ‘ক্যামেলিয়ন’ বা বহুরূপীর মতো আচরণ করে। সে যখন যার সামনে যায়, তাকে খুশি করতে তার সুরেই কথা বলে।

ডা. লিন্ডা বারম্যানের মতে, মূলত সুবিধাবাদী, চাটুকার, নাটকীয়তাপ্রিয় এবং পরশ্রীকাতর বা হিংসুটে ব্যক্তিত্বের মানুষদের মধ্যে এই বিষাক্ত প্রবণতা সবচেয়ে প্রবল থাকে।

এদের কাছ থেকে সাবধানে থাকার ৫টি উপায়

মনোবিজ্ঞানী এবং সম্পর্ক-বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের দ্বিমুখী স্বভাবের মানুষদের হাত থেকে নিজের মানসিক শান্তি বজায় রাখার জন্য ৫টি কার্যকর পরামর্শ দিয়েছেন:

১. তথ্য আদান-প্রদানে সীমারেখা টানা: মার্কিন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডা. শেরি ক্যাম্পবেল বলেন, যে ব্যক্তি আপনার সামনে অন্য কারও গোপন কথা অনায়াসে ফাঁস করছে, সে নিশ্চিতভাবেই আপনার ব্যক্তিগত তথ্যও অন্যের কাছে গিয়ে বলবে। তাই এই ধরনের মানুষের সামনে নিজের দুর্বলতা, ব্যক্তিগত জীবন বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।

২. কথোপকথন ঘুরিয়ে দেওয়ার কৌশল: সম্পর্ক-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও লেখক ডা. ওয়েন্ডি এল. প্যাট্রিক একটি চমৎকার কৌশল শিখিয়েছেন। যখনই এই ধরনের মানুষ আপনার সামনে অন্য কারও বাজে সমালোচনা শুরু করবে, তখন কথায় সায় না দিয়ে সরাসরি বলুন, ‘আচ্ছা, এই সমস্যাটা নিয়ে তুমি তার সঙ্গে সরাসরি কথা বললেই তো সহজে সমাধান হয়ে যায়’। এই একটি বাক্যেই অপর পক্ষ বুঝে যাবে যে আপনি তার এই নোংরা আলোচনা পছন্দ করছেন না।

৩. নীরবতার নীতি অনুসরণ: যুক্তরাজ্যের মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা সংস্থা ‘ব্রিটিশ সাইকোলজিক্যাল সোসাইটি (বিপিএস)’-এর গবেষকদের মতে, পরনিন্দাকারীরা শ্রোতার কাছ থেকে এক ধরনের ‘আবেগীয় সমর্থন’ খোঁজে। তাই সে যখন অন্য কারও নামে নেতিবাচক কথা বলবে, তখন হাসাহাসি করা, অবাক হওয়া কিংবা ‘তাই নাকি?’, ‘ঠিক বলেছ’ ধরনের সম্মতি দেওয়া থেকে পুরোপুরি বিরত থাকুন। এই উদাসীনতা তাকে স্থায়ীভাবে নিরুৎসাহিত করবে।

৪. উত্তেজিত না হয়ে দূরত্ব বাড়ানো: হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের আঘাত-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. জুডিথ হার্মান পরামর্শ দেন, যদি কখনো জানতে পারেন যে আপনার কোনো পরিচিত ব্যক্তি আপনারই পেছনে সমালোচনা করেছে, তবে হুট করে রেগে গিয়ে তাকে আক্রমণ করতে যাবেন না। কারণ এরা প্রায়শই অন্যদের উত্তেজিত করে নিজে আড়ালে থেকে ‘ভিকটিম কার্ড’ খেলার চেষ্টা করে। তাই শান্ত থেকে নীরবে তার সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দিন।

৫. ‘গ্রে রক মেথড’ ব্যবহার: মার্কিন মনোবিদ ডাব্লু. কিথ ক্যাম্পবেল-এর প্রস্তাবিত ‘গ্রে রকিং’ পদ্ধতিটি কর্মক্ষেত্রে দারুণ কার্যকর। যদি ব্যক্তিটি অফিসের সহকর্মী বা এমন কেউ হন যাকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তবে তার সাথে কথা বলার সময় নিজেকে একটি ধূসর পাথরের মতো বিরক্তিকর ও আবেগহীন করে ফেলুন। কেবল ‘অফিশিয়াল’ বা প্রয়োজনীয় কথা বলা ছাড়া কোনো ব্যক্তিগত মতামত বা হাসি-ঠাট্টায় জড়ানো বন্ধ করে দিন।

মনস্তাত্ত্বিক অন্ধকার দিক: ‘এভরিডে স্যাডিজম’

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কম্বিয়া’র মনস্তাত্ত্বিক গবেষক ইরিন ই. বাকেলস এবং ডেলরয় এল. পলহুস-এর নেতৃত্বে ২০১৩ সালে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাময়িকী ‘সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স’-এ একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। ‘বিহেভিওরাল কনফার্মেশন অব এভরিডে স্যাডিজম’ নামের এই গবেষণায় দেখা গেছে, সমাজে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো একদম ‘স্বাভাবিক ও ভদ্র’ মানুষের একটা বড় অংশের মধ্যেও অবদমিত রূপে এক ধরনের মানসিক বিকৃতি বা ‘এভরিডে স্যাডিজম’ (অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাওয়া) লুকিয়ে থাকে।

দ্বিমুখী আচরণ করা, মানুষের পিঠে ছুরি মারা কিংবা গোপনে একজনের কুৎসা অন্যজনের কাছে রটিয়ে সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট করা—এগুলো সবই ‘এভরিডে স্যাডিজম’-এর অন্তর্ভুক্ত লক্ষণ। এরা অন্যকে মানসিকভাবে হেনস্তা বা ছোট করে এক ধরনের ‘বিকৃত তৃপ্তি’ পায়। বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হলো, যেহেতু এটি তাদের ব্যক্তিত্বের অন্ধকার দিক, তাই এদের বুঝিয়ে বা ভালোবেসে পরিবর্তন করার চেষ্টা করা একেবারেই বৃথা। নিজের মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে বুদ্ধিমানের কাজ হলো এদের চিনে নিয়ে নিজের চারপাশে একটি শক্ত সীমানা তৈরি করে দূরত্ব বজায় রাখা।


এ জাতীয় আরো খবর...