দেশের অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত পথশিশু এবং চরম ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে এক বিশাল উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। ‘পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের আবাসন সুবিধাসহ পুনর্বাসন প্রকল্প’ শীর্ষক এই সময়োপযোগী উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করবে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমি। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে (জিওবি) বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত এই প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪২০ কোটি টাকা, যার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা ইতিমধ্যেই অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। চলতি বছর থেকেই শুরু হয়ে আগামী ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে এই মহাপরিকল্পনার যাবতীয় কার্যক্রম দেশজুড়ে সফলভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, এই সমন্বিত কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হলো পথে ভাসমান ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের নিরাপদ আবাসন, আধুনিক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং পুনর্বাসনের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘সার্ভে অন স্ট্রিট চিলড্রেন ২০২২’-এর রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে দেশের ৩১টি জেলা, ৩৪টি উপজেলা, ১২টি সিটি করপোরেশন এবং ৮টি পৌরসভাকে এই প্রকল্পের অগ্রাধিকারভুক্ত এলাকা হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ দেশের বড় বড় সব সিটি করপোরেশন এবং সাভার, ভৈরব, মেহেন্দিগঞ্জ ও নেত্রকোণার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও দূরবর্তী উপজেলা বা পৌরসভাগুলো এই সুবিধার আওতায় থাকবে। রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে পথশিশুদের সংখ্যা ও ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এসব এলাকাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হলেও, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবারে পুনর্মিলনসংক্রান্ত মূল কার্যক্রমগুলো পুরো দেশজুড়েই সমানভাবে পরিচালিত হবে।
শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় ও শিক্ষার জন্য এই প্রকল্পের অধীনে সারা দেশে ১৯টি স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র (শেল্টার হোম), ৩টি ট্রানজিট হোম এবং ১৫০টি উন্মুক্ত পথশিশু স্কুল স্থাপন ও পরিচালনা করা হবে। একই সাথে, পথশিশুদের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণে একটি বেইসলাইন জরিপ করার পাশাপাশি প্রত্যেকের জন্য জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা এবং একটি আধুনিক বায়োমেট্রিক ডাটাবেজ তৈরি করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে তাদের যেকোনো রাষ্ট্রীয় সেবা দেওয়া সহজ হয়। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ৬ হাজার ৬০০ শিশুকে পুনরায় তাদের নিজের পরিবার ও সমাজের সাথে একীভূত করার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া, ১ হাজার ৯০০ পথশিশুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ আবাসন এবং ৪ হাজার ৫০০ শিশুকে আনুষ্ঠানিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মূল ধারায় যুক্ত করা হবে।
প্রকল্পের অন্যতম একটি শক্তিশালী দিক হলো শিশুদের স্বাবলম্বী ও দক্ষ করে গড়ে তোলা। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা আগ্রহী শিশুদের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি ও আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যেসব শিশুর উদ্যোক্তা হওয়ার ভালো সম্ভাবনা থাকবে, তাদের এককালীন আর্থিক অনুদান কিংবা সমমূল্যের আধুনিক প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম উপহার দেওয়া হবে। স্বাবলম্বী করার অংশ হিসেবে ৫ হাজার ৭০০ পথশিশুকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা এবং ৫ হাজার ৫০০ শিশু বা তাদের পরিবারের জন্য ‘শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা’ (কন্ডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফার) প্রদান করা হবে। কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের দেশীয় বিভিন্ন স্বনামধন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী উপযুক্ত সুবিধাভোগীদের সরকারি সহায়তায় বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এছাড়া বিত্তশালী ব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে ‘পালক পরিবার’ (ফস্টার ফ্যামিলি) নির্বাচন করে শিশুদের পরিবারভিত্তিক পুনর্বাসন করা হবে।
আশ্রয়কেন্দ্র ও উন্মুক্ত স্কুলগুলোতে শিশুদের শুধু রাখাই হবে না, বরং তাদের নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং বিশেষ কাউন্সেলিংয়ের জন্য ১৫টি ডেডিকেটেড কাউন্সেলিং বুথ স্থাপন করা হবে। শিশু অধিকার বিষয়ে দেশব্যাপী জনসচেতনতা বাড়াতে ১২৫টি ইউনিয়নে বিশেষ কর্মসূচি চালানো হবে। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে বিলবোর্ড, পোস্টার ও লিফলেট প্রকাশের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে পথনাটক, জারি-সারি, গম্ভীরা, মূকাভিনয়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার মতো নান্দনিক মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করা হবে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, তীব্র দারিদ্র্য, নদীভাঙন, বন্যা-খরাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পারিবারিক কলহ বা পিতা-মাতার বিচ্ছেদের কারণে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিশু ঘর ছেড়ে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে চলে আসে। এসব শিশু বাস-রেলস্টেশন, ফুটপাত বা ব্রিজের নিচে অত্যন্ত নোংরা ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করে এবং বেঁচে থাকার তাগিদে আবর্জনা কুড়ানো, হকারি, কুলি বা ভিক্ষাবৃত্তির মতো অনানুষ্ঠানিক শ্রমে জড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় এরা মাদক পরিবহন, চুরি বা পকেটমারের মতো অপরাধের অন্ধকার জগতেও পা বাড়ায়। এই প্রকল্পটির খসড়া তৈরির সময় ব্রাজিল, ভারত ও সিয়েরা লিওনের মতো দেশগুলোর সফল পুনর্বাসন কর্মসূচির আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও মডেলকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ পথশিশুর বাবা-মা উভয়েই জীবিত এবং ৯১ symbols ২ শতাংশ শিশুই কোনো না কোনোভাবে পরিবারের সাথে ফিরে থাকতে চায়। তবে দারিদ্র্য ও তীব্র ক্ষুধাই তাদের বাড়ি ছাড়ার সবচেয়ে বড় কারণ। এই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে ২৪ হাজার ৮৫০ জন এবং পরোক্ষভাবে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ১৫০ জনসহ দেশের প্রায় ৫ লাখ সুবিধাবঞ্চিত শিশু সরাসরি উপকৃত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড