চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত সুলতানা মন্দির ত্রিপুরাপাড়া এখন একপ্রকার অবরুদ্ধ জনপদে পরিণত হয়েছে. ঐতিহ্যবাহী এই পাহাড়ি গ্রামে ৩১টি আদিবাসী ত্রিপুরা পরিবারে প্রায় দুই শতাধিক মানুষের বসবাস. ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে এই গ্রামে যাতায়াতের একমাত্র প্রধান রাস্তাটিতে অবৈধভাবে চেকপোস্ট বসিয়ে এই পুরো জনগোষ্ঠীকে কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে জিপিএইচ ইস্পাত কারখানা কর্তৃপক্ষ.
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, ত্রিপুরাপাড়ার একমাত্র চলাচলের রাস্তার গা ঘেঁষে জিপিএইচ ইস্পাত তাদের একটি বিশাল ১০ তলা ভবন নির্মাণ করেছে. শুধু তাই নয়, কৌশলে পুরো রাস্তাটিকে নিজেদের আয়ত্তে নিতে রাস্তার ওপরই কারখানার সীমানা দেয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে. এই দেয়াল ও অবকাঠামোকে ব্যবহার করেই রাস্তার মাঝখানে বসানো হয়েছে জিপিএইচ ইস্পাতের নিজস্ব চেকপোস্ট, যেখানে সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকছেন ৪ জন নিরাপত্তাকর্মী. গ্রামে সাধারণ মানুষ বা বাইরের কেউ প্রবেশ করতে চাইলে এই নিরাপত্তাকর্মীরা সরাসরি বাধা দিচ্ছেন.
কারখানার নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, এই রাস্তায় যাতায়াতের জন্য গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের একটি ‘বিশেষ টোকেন’ ব্যবস্থা চালু করেছে জিপিএইচ কর্তৃপক্ষ. সেই নির্দিষ্ট টোকেন প্রদর্শন করলে গ্রামবাসীকে পার হতে দেওয়া হয়. তবে ত্রিপুরাপাড়ার বাসিন্দারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তাঁরা নিজেরা টোকেন দেখিয়ে কোনোমতে পার হতে পারলেও, বাইরের কোনো আত্মীয়স্বজন বা অতিথিরা পাড়ায় আসতে গেলে চরম হয়রানি ও ঝামেলার মুখে পড়েন. এই কঠোর বিধিনিষেধের কারণে তাঁরা নিজেদের স্বাধীন দেশে অবরুদ্ধ বোধ করছেন. এমনকি পেশাগত দায়িত্ব পালনে সংবাদকর্মীরা চেকপোস্ট পার হতে চাইলে দায়িত্বরত সিকিউরিটি কর্মকর্তা জানান, অনুমতি ছাড়া কাউকে ছাড়লে তাঁর চাকরি চলে যাবে.
এই বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, দুই সপ্তাহ আগে প্রশাসন বিষয়টি জানতে পেরে ঘটনাস্থলে লোক পাঠায়. সেখানে ত্রিপুরাপাড়ার রাস্তা বন্ধ করার সত্যতা পাওয়ার পর ত্রিপুরার সরদারদের ডেকে একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে, তবে ভয়ের কারণে হোক বা অন্য কোনো কারণে, তাঁরা এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ জমা দেননি.
সুলতানা মন্দির ত্রিপুরাপাড়ার ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ বাসিন্দা বিকারাম ত্রিপুরা জানান, ২০১৯ সালে জিপিএইচ ইস্পাত কর্তৃপক্ষ তাদের কারখানা সম্প্রসারণ করার সময় থেকেই এই জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটি বন্ধ করে দেয়. এর ফলে অন্যত্র থাকা আত্মীয়স্বজনেরা কোনো পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসলে কারখানার প্রহরীদের হাজারো কৈফিয়ত ও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়. আদিবাসী ফোরাম সীতাকুণ্ড ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক রবীন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, রাস্তা বন্ধের পাশাপাশি জিপিএইচ ইস্পাতের কারণে শিশুদের খেলাধুলার কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই. চারপাশে এখন ভারী লোহার স্ক্র্যাপ ইয়ার্ড তৈরি হওয়ায় শিশুদের প্রতিদিন চরম ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে হচ্ছে এবং কারখানার বর্জ্যে পুরো এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে.
রাস্তা বন্ধের এই গুরুতর অভিযোগের জবাবে জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল দাবি করেন, ওই জায়গাগুলো তাঁরা কিনে নিয়েছেন এবং ত্রিপুরাপাড়ার লোকদের কেবল থাকতে দিয়েছেন. রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি, নিরাপত্তার স্বার্থে চলাচল কিছুটা সীমিত করা হয়েছে মাত্র. যেহেতু সেখানে ভারী যন্ত্রপাতি ও লোহা থাকে, তাই কারখানার সুরক্ষায় এই চেকপোস্ট বসানো হয়েছে বলে তিনি যুক্তি দেন.
এই বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের বক্তব্য পাওয়া না গেলেও, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী আমাদের দেশের সম্মানিত নাগরিক. তাঁদের স্বাভাবিক চলাচলের রাস্তা বন্ধ করার কোনো আইনগত অধিকার কারও নেই. প্রশাসন এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া মাত্রই জিপিএইচ ইস্পাতের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে.
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা