দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে চলমান ভয়াবহ বন্যা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। গত ১ জুলাই থেকেই আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল এবং বন্যার ব্যাপারে সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিল। এমনকি এল নিনোর প্রভাবে বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়েও বিশেষজ্ঞরা আগে থেকেই সতর্ক করেছিলেন। অথচ এসব পূর্বাভাস পাওয়ার পরও মাঠপর্যায়ে কার্যকর কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়নি। দুর্যোগের মুখে পড়ে এখন চরম মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার লাখ লাখ মানুষ।
তথ্য-উপাত্ত বলছে, দুর্যোগ শুরুর আগে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া, পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুত রাখা, উদ্ধারকারী সরঞ্জাম প্রস্তুত করা কিংবা মেডিকেল টিম সক্রিয় করার মতো প্রাথমিক কাজগুলোতে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যার ফলে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল কয়েক দিনের মধ্যেই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একদিকে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে ভূমিধস, অন্যদিকে সমতলে জলমগ্ন জনপদ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের এই ভয়াবহতার দায় শুধু প্রকৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার চরম সীমাবদ্ধতা। খাল ও নালা দখল হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত সরতে পারছে না। ফলে সাধারণ বৃষ্টিপাতও কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করলেও স্থানীয় প্রশাসন কেন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলো, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ আরও বাড়বে, তাই পূর্বাভাসকে শুধু বার্তায় সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তর করাই এখন সময়ের দাবি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ৫৯টি উপজেলা এবং ৩৩৪টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছয় লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত বন্যায় পাহাড়ধস ও অন্যান্য দুর্ঘটনায় ৫৪ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন ৩৯ জন। এখনো অনেকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রেও দেরির অভিযোগ উঠেছে। বন্যা ৫ জুলাই শুরু হলেও প্রথম দফায় ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১২ জুলাই। ততদিনে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অনেক দুর্গম এলাকায় খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারি উদ্যোগে মেডিকেল টিম গঠনের নির্দেশনা থাকলেও অনেক এলাকায় তা যথাসময়ে কার্যকর হতে দেখা যায়নি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, যখন সবচেয়ে বেশি সাহায্যের প্রয়োজন ছিল, তখন ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম ছিল খুবই ধীরগতির।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের জনবল সংকটও এই বিপর্যয়ের পেছনে একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কাজের জন্য পর্যাপ্ত কর্মী না থাকায় কর্মকর্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর পাশাপাশি পর্যাপ্ত জনবলের সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি। যদিও মন্ত্রণালয় বলছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর তারা সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেবে, তবে বর্তমান সংকটে এটি কোনো সমাধান দিচ্ছে না।
আশ্রয়কেন্দ্র নিয়েও রয়েছে নানা জটিলতা। সরকারিভাবে ঘোষণা দেওয়া হলেও অনেক এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো আগে থেকে প্রস্তুত রাখা হয়নি। আবার যেখানে প্রস্তুত ছিল, সেখানে মানুষকে নেওয়ার মতো কার্যকর কোনো উদ্যোগ বা প্রণোদনা দেখা যায়নি। অনেক বাসিন্দা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের বসতবাড়ি ছাড়তে রাজি হননি। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি থাকার পরও বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি ছিল খুবই শিথিল। কক্সবাজারের দিকে প্রাণহানির ঘটনাগুলো এটাই প্রমাণ করে যে, সতর্কবার্তা প্রচার করা হলেও মানুষকে সচেতন করার বা সরানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনের ব্যর্থতা ছিল স্পষ্ট।
জলবায়ু ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, দুর্যোগের সতর্কবার্তাগুলো এখনো সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। প্রযুক্তিগত ভাষা পরিবর্তন করে সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে, যাতে তারা ঝুঁকির গভীরতা বুঝতে পারে। অন্যদিকে কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ মনে করেন, তথ্যপ্রবাহ আরও দ্রুত করা প্রয়োজন। নদীগুলোর পানির স্তর প্রতি ঘণ্টায় হালনাগাদ করে তা দ্রুততম সময়ে প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের কাছে পৌঁছাতে পারলে ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
এদিকে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সতর্ক করেছে যে, পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নতুন করে দেশের অন্তত ৯টি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। এতে চলমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, এবারের বন্যা প্রমাণ করেছে যে, শুধু পূর্বাভাস দিয়ে দুর্যোগ ঠেকানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি, সমন্বয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় অংশগ্রহণ। অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত না করলে আগামীতে এমন বিপর্যয় আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এখন ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি ত্রাণ ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করাই সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র: সমকাল