গত শনিবার, ১১ই জুলাই, একটি লেখা পোস্ট করেছিলাম। তাতে শরিফ সাহেব নামে এক ভদ্রলোকের দুই ধরনের আচরণের কথা বলা হয়েছিল।
প্রথমে তিনি ব্যাংকের এমডি হয়ে তাঁর বাল্যবন্ধুকে প্রমোশন থেকে বঞ্চিত করেছিলেন। অথচ বঞ্চিত বন্ধুর বাবা তাঁকে পড়াশোনায় সাহায্য না করলে তিনি হয়তো ব্যাংকের এমডি হতে পারতেন না।
পরে তিনিই সেই বন্ধুর ছেলেকে ব্যবসায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন।
পাঠকের প্রতি আমার প্রশ্ন ছিল- শরিফ সাহেবের দ্বিমুখী আচরণের ব্যাখ্যা কী?
প্রচুর পাঠক কমেন্ট করেছেন, শরিফ সাহেবের মতো সুবিধাবঞ্চিতদের সাহায্য করা উচিত নয়। এরা কখনো কৃতজ্ঞ হয় না। সুযোগ পেলে বেঈমানি করে।
বিনয়ের সাথে আমি এ ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশ করছি।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে ‘পে ইট ফরোয়ার্ড’ নামে একটি সংগঠন চালাই- যা বিপন্ন শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ায়। এর মধ্যে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে বের হয়ে গেছে, এখনো কয়েক হাজার পড়ছে। তাই আমি চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা থেকে জানি, সুবিধাবঞ্চিতদের সাহায্য করলে তারা খুব কম অকৃতজ্ঞ হয়।
কৃতজ্ঞতার ঋণ তারা বিভিন্নভাবে ফিরিয়ে দেয়।
কয়েকটি উদাহরণ দিলাম- আশা করি এগুলো অন্যকে সাহায্য করার ব্যাপারে সংশয় দূর করতে সাহায্য করবে।
১) আমাদের এক ছাত্রী শিক্ষাজীবনে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিল। পরে সে বিদেশে একটি ইয়ুথ প্রোগ্রামে আমন্ত্রণ পায়। সেখানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী তাকে স্বাক্ষরসহ একটি বই উপহার দেন। দেশে ফিরে সে এই মহামূল্যবান বইটি আমাকে উপহার দিয়ে বলেছিল, ‘বাবা, এটি আমি আপনাকে গিফট করতে চাই। আপনি না থাকলে আমি এতদূর আসতে পারতাম না।‘
আমি খুব বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘মা, এ বই তোমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। এটি তোমার সারাজীবন আগলে রাখার দরকার। আমি এ উপহার নিতে পারি না।‘
মেয়েটি জেদি কণ্ঠে বলল, ‘আপনাকে নিতেই হবে। না নিলে আমি উঠব না।‘
তার জেদের কাছে আমি পরাজিত হলাম। বইটি নিলাম, কিন্তু বললাম, ‘মা, ঠিক আছে, বইটি আমি আমানত হিসেবে রাখলাম। তবে তোমার ছেলেমেয়েরা বড় হলে এটি আমি ওদের দিয়ে বলব- নানাভাই, এ বইটি তোমার মায়ের সংগ্রাম ও সাফল্যের প্রতীক। এটি যত্ন করে রেখে দিও। বইটি যতবার দেখবে মায়ের সাফল্যে তোমাদের মন ভালো হয়ে যাবে।‘
ওর মেয়ে এখন ক্লাস নাইনে পড়ে। ছেলে পড়ে এইটে। ওরা এসএসসি পাস করার পর আমি বইটি ওদের দিয়ে দেবো।
২) আরেকটি ছেলে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার অ্যাকাডেমিক রেজাল্টের জন্য দেশের সর্বোচ্চ স্বীকৃতিসূচক স্বর্ণপদক পেয়েছিল। পুরস্কারটি পাওয়ার পর সে আমার অফিসে হাজির। তারপর জোর করে সে মেডেলটি আমার গলায় পরিয়ে দিলো। আমি অনেক মানা করলাম, কিন্তু সে কিছুতেই শুনল না। আমি সেটি গলা থেকে খুলে তার গলায় পরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘এই মেডেল আমার গলায় মানাচ্ছে না। এটি কেবল তোমার গলায় মানায়। বরং চলো আমরা একটি ছবি তুলি। সেটি অমূল্য স্মৃতি হয়ে থাকবে।‘
৩) সবচেয়ে অদ্ভুত কাজ করেছিল আরেকটি ছেলে। সে বিদেশে পড়তে গিয়েছিল। পড়াশোনা শেষ করে সেখানেই সেটেল হয়। ভালো চাকরি পায়। সে দেশে আসার পর আমার সাথে দেখা করতে এলো। তার হাতে একটি ছোটো বাক্স। আমাকে সে বলল, ‘স্যার, বাক্সটি দয়া করে খুলবেন?’
আমি বাক্সটি খুলে একটু অবাক হয়ে দেখলাম সেটি খালি!
সে মৃদু হেসে বলল, ‘খালি বাক্স দেখে অবাক হচ্ছেন, স্যার? আসলে বাক্সটি খালি নয়। ওতে আছে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, আর কৃতজ্ঞতা- এগুলো খালি চোখে দেখা যায় না।‘
পরে ছেলেটি আমাকে আরো কয়েকটি চমৎকার উপহার দিয়েছিল। কিন্তু সেই খালি বাক্সটি আমার অমূল্য সম্পদ হয়ে রয়ে গেছে।
এরকম অনেক গল্প আমার ঝুড়িতে জমা আছে।।
পে ইট ফরোয়ার্ড সম্পর্কে আমরা তেমন বলি না। এই পেজে এ সংক্রান্ত তেমন কোনো লেখা পাবেন না। আজ বললাম কিছুটা অপরাধবোধ থেকে। মনে হচ্ছে, শনিবারের পোস্টের কারণে শরিফ সাহেবের আচরণকেই সবাই স্বতসিদ্ধ ভাববেন। ধরে নেবেন, সুবিধাবঞ্চিতদের উপকার করে লাভ নেই। হয়তো আমার ওই লেখার কারণে অনেক বিপন্ন শিক্ষার্থী অপরের সাহায্য থেকে বঞ্চিত হবে।
দয়া করে এই ভুল বিশ্বাস আঁকড়ে থাকবেন না।
মুদ্রার এক পিঠ দেখে বিচার করা কখনোই উচিত নয়। দুটো পিঠই বিচার করতে হয়। শরিফ সাহেবও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাই একদিকে তিনি তাঁর বন্ধুকে প্রমোশন থেকে বঞ্চিত করেছিলেন, কিন্তু তাঁর ছেলেকে ব্যবসায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন।
দয়া করে মনে রাখবেন, একটি সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীকে সাহায্য করা মানে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পর্যন্ত ভাগ্য বদলে দেওয়া।
পাদটিকাঃ ১) পে ইট ফরোয়ার্ড শিক্ষার্থীদের সাহায্য করার জন্য ফান্ডরেইজ করে না এবং ডোনেশনও নেয় না। আমরা কেবল ডোনার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ করিয়ে দেই। আনন্দের বিষয় হলো, আমাদের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অনেক বিপন্ন ছাত্র-ছাত্রীর দায়িত্ব নিয়েছে।
২) উপরে বর্ণিত ছেলেমেয়েগুলোকে যারা চেনেন তাঁদের প্রতি ওদের নাম- পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ করছি। এ কারণে ছবিতে ছেলেটির চেহারা ব্লার করে দেওয়া হয়েছে।
এ জাতীয় আরো খবর...