আমরা বড় হয়েছি চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনিতে। এটি মসজিদ কলোনি নামেই বেশি পরিচিত। এখানে সরকারি কর্মকর্তারা থাকতেন।
এটি ছিল দুনিয়ার সেরা গ্রাম। কারণ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চাকরিসূত্রে আসা বাসিন্দারা সবাই মিলেমিশে অসম্ভব মমতায় এটিকে নিজের গ্রাম করে নিয়েছিলেন।
কলোনির সব চাচা-চাচি ছিলেন আমাদের গার্ডিয়ান। সবাই সবার বাচ্চাকে শাসন করতেন- আদর করতেন। এর ফলাফল হচ্ছে, দুনিয়ার এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে এখানকার ছেলেমেয়েরা যুক্ত নেই। আমেরিকার নাসা থেকে শুরু করে কূটনীতি, প্রশাসন, জাতীয় ফুটবল দল, এমনকি বিখ্যাত ব্যান্ড এলআরবির গিটারিস্ট সব জায়গায় এরা রাজত্ব করেছেন এবং করছেন।
এদের বারুদ জ্বালানোর দেয়াশলাই ছিলেন কলোনির চাচারা।
এইসব যাদুকর চাচাদের সম্মানে এ লেখা।
১) এশরাক চাচা- সন্ধ্যার দেবদূত
এশরাক চাচা চাকরি করতেন কাস্টমসে। তাঁর সততা তখন গল্পগাঁথায় পরিণত হয়েছিল। প্রতিদিন মাগরেবের নামাজের আগে তিনি পত্রিকা গোল করে পাকিয়ে লাঠি বানাতেন। তারপর পুরো কলোনি চক্কর দিতেন। যদি দেখতেন আমরা তখনও মাঠে, তাহলে সেই লাঠি দিয়ে বাড়ি দিয়ে বলতেন-‘ এখনো বাইরে কেন? যা বাড়ি যা, পড়ালেখার নাম নাই, খালি খেলাধুলা! যা, বাসায় যা, নইলে দিলাম আরেক বাড়ি।‘
আমরা তাঁর ভয়ে জানবাজি রেখে বাড়ির দিকে দৌড়াতাম।
২) সর্দার চাচা- সোনা মুড়ানো হৃদয়
সম্ভবত সত্তর দশকে কলোনির দুই নম্বর টিভি ছিল সর্দার চাচার বাসায়। এর আগে মাত্র একজনের বাসায় টিভি ছিল। আমরা দলবেঁধে তাঁর বাসায় টিভি দেখতাম। তিনি বা চাচি একটুও বিরক্ত হতেন না। বরং আমাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের খাবার বানিয়ে রাখতেন। টিভি সিরিয়াল ‘দ্যা ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্ট’ দেখতে দেখতে আমরা অনেকেই ঘুমিয়ে পড়তাম। চাচা কিংবা চাচি কোলে করে আমাদের তাঁদের বিছানায় শুইয়ে দিতেন। এত ছোট ছিলাম যে, অনেকেই প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলতাম। চাচা আমাদের পরিষ্কার করে তাঁর পুত্র কামাল ভাই বা রনির প্যান্ট পরিয়ে দিতেন। সে প্যান্ট ফেরত দিতে হতো না।
৩) মোজাম্মেল চাচা- আমাদের কালের সক্রেটিস
মোজাম্মেল চাচা সবসময় সাদা পাঞ্জাবি- পাজামা আর পাম্প শু পরতেন। তিনি ছিলেন জ্ঞানের ভাণ্ডার। একই সাথে অসম্ভব দূরদর্শী। তাঁর কাজ ছিল ঘুরে ঘুরে আমাদের খবর নেওয়া এবং গল্পের ছলে বিভিন্ন ব্যাপারে শেখানো। তাঁর শিক্ষা আমাদের মননে এখনো লেপ্টে আছে। কিশোর থেকে তারুণ্যে আমরা অনেকেই তাঁর মায়ার ছায়ায় বড় হয়েছি। চাচার পকেটে থাকত ভাঙতি টাকা। হাঁটতেন আর চোখের সামনে বিপন্ন মানুষ দেখলে তা বিলাতেন। কেন এটা করেন, জিজ্ঞেস করলে বলতেন- ‘দানে আনে।‘
তাঁর অতল হৃদয় আমাদের মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিল।
৪) আমানউল্লাহ চাচা- রূপকথার আলাদিন
চাচা ছিলেন আমাদের জন্য রূপকথার আলাদিন। যার হাতে সব সম্ভব করার চেরাগ আছে। আমাদের সব প্রয়োজনে তিনি ছিলেন অন্যতম ভরসা। তাঁর বাসায় দিনরাত চুলা জ্বলত। কারণ সেটি ছিল কলোনির সব ছেলেমেয়ের জন্য ফ্রি রেস্তোরা। আমাদের যখনই ইচ্ছে হতো এক দৌড়ে সেখানে চলে যেতাম। চাচি সাথে সাথে খাবার বেড়ে দিতেন। একবার তাঁর বাসায় ঈদের জন্য প্রস্তুত করা খাবার আমরা চাঁদ রাতেই খেয়ে সাবাড় করে ফেলেছিলাম। চাচা মাঝরাতে হাসিমুখে আবার বাজার করলেন, চাচি রান্না বসালেন। পরদিন আমরা আবার হামলা করব তাই।
৫) শফি চাচা- ত্রিশ বছর কথা রেখেছিলেন
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে তেত্রিশ বছর কেউ কথা রাখেনি- শফি চাচা কলোনি অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি হিসেবে প্রায় ত্রিশ বছর ধরে কলোনির বাচ্চাদের দেওয়া প্রায় প্রতিটি কথা রেখেছিলেন।
আমরা অ্যাসোসিয়েশনের কাছে দুনিয়ার সব আবদার করতাম। ফুটবল লাগবে, ক্রিকেট ব্যাট লাগবে, ব্যাডমিন্টনের কর্ক লাগবে। চাচা প্রথমে গজগজ করতেন। কিন্তু পরে ঠিকই কিনে আনতেন। শুধু একটি ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুবই কড়া। স্কুল পালালেই কীভাবে যেন গাছের চিকন ডাল নিয়ে জায়গামতো হাজির হতেন। তারপর এক ধমকে মাইল পার করে ক্লাস রুমে ঢুকিয়ে দিতেন। সবচেয়ে খুশি হতেন কেউ রেজাল্ট ভালো করলে। তখন কলোনি মার্কেটে উদার হাতে জিলিপি বিলাতেন।
৬) বিমল মেসো- খেলা ও শিক্ষার মোমবাতি
মেসো ছিলেন খেলা অন্তঃপ্রাণ। কলোনির সব ছেলেমেয়ে যাতে খেলাধুলা করে সেজন্য জান দিয়ে ফেলতেন। কলোনিতে ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজনে তাঁর ছিল ব্যাপক উৎসাহ। তিনি বিশ্বাস করতেন, খেলাধুলো হচ্ছে মগজের খোরাক। না খেললে শরীর যেমন পুষ্ট হয় না, ব্রেইনও খোলে না। তিনি কলোনির ফুটবল টিমকে নিয়ে নানা জায়গায় ম্যাচ খেলতে নিয়ে যেতেন। একইসাথে মেসোর ছিল শিক্ষা বিস্তারে আগ্রহ। রিটায়ার করার পর যা আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন তার বড় অংশ নিজ গ্রামের স্কুলে দান করে দিয়েছেন। সৃষ্টিকর্তার অপার কৃপায় মেসো এখনো আমাদের মাঝে আছেন। তাঁর বয়স ছিয়ানব্বই।
আমি মাত্র ছয়জন চাচার কথা বললাম, কিন্তু এরকম শত শত চাচা ছিলেন। হায়! সবার কথা একসাথে লেখা যাচ্ছে না! তবে পরে নিশ্চয় লিখব।
ভালো কথা- চাচারা এমন নিবেদিত হতে পেরেছিলেন কেন জানেন?
চাচিদের কারণে। তাঁরা আমাদের জন্য মমতার সমুদ্র ধারণ না করলে হয়তো এসব সাধু টাইপ চাচাদের দেখা আমরা পেতাম না। তাঁদের কথা আলাদাভাবে লিখব।
আমরা যখন মমতার ঘোরে বাস করি তখন এ ঘোর যারা সৃষ্টি করেন তাঁদের মূল্য আমরা বুঝি না। যখন বুঝি তখন দেরি হয়ে যায়… কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ থাকে না।
হায়! আমারও বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
আমার কেবল দেরি হয়ে যায়!
এ জাতীয় আরো খবর...