১ ) কয়েকদিন আগে হর্ন ইফেক্ট নিয়ে লিখেছিলাম- মানে একটি আচরণ দিয়ে একজন মানুষকে ভুলভাবে বিচার করা। আজ লিখছি তার বিপরীত হ্যালো ইফেক্ট নিয়ে।
২ ) বাইরে প্রচণ্ড তুষারপাত হচ্ছে। স্ট্রিট লাইটের আলোয় সাদা বরফকে স্বর্ণকুচির মতো দেখাচ্ছে। বাড়ির পেছনের বাগানে ফুলগাছগুলো মরে গেছে, সেগুলোর স্তুপে জমে থাকা বরফকে মনে হচ্ছে সাদা গোলাপ।
শফিক কফির কাপ টেবিলে নামিয়ে শর্মির দিকে তাকাল। তার শৈশবের বন্ধুটি গালে হাত দিয়ে তুষারপাত দেখছে।
শফিক কোনো কথা বলল না। ছোটবেলা থেকে সে জানে কখন শর্মির সাথে কথা বলতে নেই।
অনেকক্ষণ পর শর্মিই নীরবতা ভাঙল- ‘তুমি যে কদিন ছিলে খুব জমজমাট ছিল। কাল চলে যাবে- তারপর আবার…।‘
শর্মী থেমে গেলো। শফিক জানে সে কী বলতে চায়- কাল থেকে আবার এ বাড়িতে নেমে আসবে অসহ্য নীরবতা। তারপরও সে কিছুই বলল না। পুরোনো বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রইল।
‘আর দুয়েকটা দিন থেকে যেতে পারতে।‘
‘পারলে ভালো লাগত। কিন্তু দেশে ফিরে যেতে হবে। এক সপ্তাহের ট্রেনিংয়ে এসেছিলাম। তারপর আরো তিনদিন তোমার সাথে কাটালাম। এবার ফিরতে হবে। বাড়িতে ওরা অপেক্ষায় আছে।‘
‘অপেক্ষা!’ শর্মীর কণ্ঠে হাহাকার ফুটে উঠল। তারপর তা কাটিয়ে উঠে বলল-‘ চমৎকার বউ তোমার। ফোনে যতবার ওর সাথে কথা বলি মুগ্ধ হই। আর তোমার মেয়ে! কী কিউট!’
শফিক কিছু না বলে মৃদু হাসল।
শর্মি আবার চুপ হয়ে গেলো, কিছুক্ষণ নীরবতা। বাইরে তুষার পড়ার মাত্রা বেড়েছে। হঠাৎ শর্মি ঝুঁকে বলল- ‘এতদিন হয়ে গেলো আবিদের সাথে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলো- তুমি একবারও জানতে চাইলে না কেন এমন ঘটল?’
শফিক থমকে গেলো। তারপর আমতা আমতা করে বলল-‘তোমার খুব ব্যক্তিগত ব্যাপার…।‘
‘মাঝে মাঝে একান্ত নিজের গল্পগুলো শেয়ার করতে ইচ্ছে করে।‘
শফিক তার বন্ধুর দিকে তাকিয়ে আছে। পঞ্চাশে কাছাকাছি এসেও কী অদ্ভুত সুন্দর সে!
‘আমি কেবল তার মেধা দেখেছিলাম। কী দুর্দান্ত রেজাল্ট! কী অসাধারণ ডিবেট করত। সাধারণ হয়েও কী অসাধারণ ছিল! পুরো ক্যাম্পাসের মেয়েরা তার জন্য পাগল ছিল। শুধু এটা দেখেই আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর বিয়ে। মুগ্ধতা ধাক্কা খেলো কয়েক মাস পর। ওর মধ্যে একটা আবিষ্কার করলাম… না, থাক, আর বলতে ইচ্ছে করছে না, শুধু শুনে রাখো দুবার আমাকে হাসপাতালে নিয়ে পেট ওয়াশ করতে হয়েছে। অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলাম।‘
শফিক এবং শর্মির গল্প আপাতত শেষ। আমার কথা শুরু।
শর্মি যে আবিদের মেধা দেখে পাগল হয়েছিল, আর কিছু বিবেচনা করেনি, সেটা হয়েছে হ্যালো ইফেক্টের কারণে।
আমরা অনেক সময় একজন মানুষের ভালো একটি গুণ দেখে তার ব্যাপারে চূড়ান্ত ভালো ধারণা পোষণ করি। এই ভুলটিই হলো হ্যালো ইফেক্ট।
মলাট দেখে একটি বইকে ভালো বলার মতো।
হ্যালো ইফেক্টের কারণে আমরা অনেক সমস্যায় পড়ি। যেমন-
ক) ভুল মানুষের প্রেমে পড়া, তাকে বিয়ে করি।
খ) ভুল মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করি।
গ) ভুল মানুষের সাথে ব্যবসা করি।
ঘ) লেবাস দেখে কাউকে বিশ্বাস করে ফাঁদে পড়া।
হ্যালো ইফেক্টের কারণে কোনো বাছবিচার না করে একজন মানুষের একটি মাত্র গুণের মোহে আমরা তার দিকে পতঙ্গের মতো ছুটে যাই- তারপর পুড়ে মরি।
দয়া করে কারো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার সবদিক বিবেচনা করুন। যিনি মেধাবী, কিংবা সুদর্শন তার চরিত্রের খবর নিন। ধনসম্পদ দেখে সফল হিসেবে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার আগে তার নৈতিকতা বিচার করুন। লেবাস দেখে বিশ্বাস করার আগে তার ইতিহাস জানুন।
হ্যালো ইফেক্টের কারণে অতীতে অনেকের জীবন ধ্বংস হয়েছে, বর্তমানে হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে।
শেষ করি একটি কথোপকথন দিয়ে-
‘মাটিটা খুব রুক্ষ এবং শক্ত।‘
‘ঠিক তাই। পতাকার খুঁটি ঢোকানো যাচ্ছে না।‘
প্রথম চন্দ্রবিজয়ী নীল আমস্ট্রং এবং এডুইন অলড্রিন।
২০শে জুলাই, ১৯৬৯। সেদিন চন্দ্রবিজয়ের পর চাঁদের মাটিতে তারা কথা বলছিলেন।
জ্যোৎস্না রাতে ভরা পূর্ণিমার আলোয় চাঁদকে কী মনোহর মনে হয়, তাই না?
কিন্তু কাছে গেলে নীল আমস্ট্রং কিংবা এডুইন অলড্রিনের মতো আবিষ্কার করবেন চাঁদ আসলে রুক্ষ মাটিতে ভরা। দূর থেকে দেখা রূপের চিহ্নও নেই।
এটাই হ্যালো ইফেক্ট- পূর্ণিমার অপূর্ব সৌন্দর্য দিয়ে চাঁদকে বিবেচনা করা- সেটির খানাখন্দের কথা না ভাবা।
পাদটীকা: ১ ) শর্মির অভিজ্ঞতা থেকে লেখক পরে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। নাম ‘ডানাভাঙা পাখিগুলো।’
২ ) চাঁদে কথোপকথনের উৎস: নাসার ট্রান্সক্রিপ্ট।
এ জাতীয় আরো খবর...