‘শরতে বৃক্ষপাতা মাটিতে গড়ায়
দিনগুলো নিমিষে স্মৃতি হয়ে যায়
সুকণ্ঠী একসময় কণ্ঠ হারায়
চল্লিশে যৌবন ধুলায় মিলায়।’
চল্লিশের পর সময় বিদ্যুৎগতিতে ছুটে চলে। এটি তখন অতি দ্রুতগামী একটি ট্রেন। বুঝে ওঠার আগেই পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর নামের স্টেশনগুলো পার হয়ে যায়। তাই চল্লিশের আগেই পা শক্ত করতে হয়। যাতে ছুটতে থাকা সময়ের সাথে তাল মেলানো যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে পা শক্ত করব?
আমার মতে, ত্রিশে পা দিলেই থমকে দাঁড়াতে হয়। তারপর নিজের জীবন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয় আগামী দিনগুলোতে আমি কী করব, কী করব না।
করা না করার লিস্ট যারা ভালোভাবে করতে পারেন চল্লিশের পর তাঁদের জীবন ডানা মেলে। ব্যতিক্রম হলে তা গোত্তা খেয়ে মাটিতে পড়ে।
এই লিস্টে কী কী থাকা উচিত?
এসময় একটি নিজস্ব ফিল্টারিং সিস্টেম চালু করতে হয়- যার মাধ্যমে ঠিক করা হবে সামনে কার সাথে মিশব, কার সাথে মিশব না। চল্লিশে ফিল্টার করে সঠিক বন্ধু নির্বাচন না করলে কড়া মূল্য দিতে হয়। বয়সটা অসংখ্য মানুষকে গুডবাই বলার সময়।
সময়ের ব্যাপারে কিপটে হতে হবে- সময়টা এখন খরচের নয়- বিনিয়োগের। তাই যে কাজে আত্মোন্নয়ন হয় না তা বাদ দিতে হবে। রোজগার কিংবা বিনোদন, যে উদ্দেশ্যেই কাজটি করা হোক তার শেষপ্রান্তে থাকবে আত্মোন্নয়ন। প্রতিটি মুহূর্ত খরচ করতে হবে নিজের উন্নতির জন্য। এখন প্রতিটি মুহূর্ত দুর্লভ সম্পদ।
ত্রিশ থেকে চল্লিশ এই সময়টাই সন্তানদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার সেরা সময়- যা তাদের সাথে সারাজীবনের বোঝাপড়া তৈরি করে। এরপর ছানাপোনাগুলো বড় হয়ে যায়- আমরা চাইলেও ওরা সময় দিতে পারে না। চল্লিশের আগে বাবা হবেন ঘোড়া, মা হবেন রেলগাড়ি। খোকাখুকু তাতে চরে খিলখিল হাসবে। পরবর্তী জীবনে এই স্মৃতি অচ্ছেদ্য মমতা তৈরি করবে।
৪) আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর
চল্লিশের পর অনেক মানসিক চাপ বাড়তে থাকে। এসময় ক্যারিয়ারের উপরে যাওয়ার পর্বটি চুড়ান্ত গতি পায়। তাই অফিস পলিটিক্সের যন্ত্রণাও বাড়ে। সন্তান বড় হয়। তাকে নিয়ে চিন্তা করতে হয়। সাথে যোগ হয় আরো অনেক ঝামেলা। তাই দেখা দেয় মানসিক চাপ। তাই মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। বিষণ্ণতাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। এজন্য যতই চাপ থাকুক কিছুক্ষণ নিজের ভালো লাগার কাজে নিমগ্ন থাকতে হবে। আনন্দ নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়- কেউ ঝুড়িভর্তি আনন্দ নিয়ে দরজার কড়া নাড়ে না।
চল্লিশের পর শরীর অনেক ক্ষেত্রে মীর জাফর হয়ে যায়। বাসা বাঁধে অনেক রোগ। অনেকেই বলেন ৪০-৫৫ মানবজীবনের খুব শংকাপূর্ণ জীবন। তাই চল্লিশ হেলথ ফার্স্ট এ নিয়ম মেনে চলা উচিত।
মা-বাবা বেঁচে থাকলে যদ্দুর পারা যায় তাঁদের সময় দেওয়া উচিত। দূরে থাকলে নিয়ম করে দেখতে যাওয়া উচিত। একবার একজন অবসরপ্রাপ্ত অতি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আমাকে বলেছিলেন- ‘ বাদল, শেষ বয়সে এসে মাকে খুব মনে পড়ে। প্রায় তাঁকে দেখতে বাড়ি যেতে বলতেন। চাকরির ব্যস্ততার জন্য যেতে পারতাম না। এখন তাঁর কবরের পাশে দাঁড়াই। ডাকি-‘মা, মা’- কিন্তু উত্তর আসে না।‘
‘রেডি হয়ে নেই, তারপর করব’- চল্লিশের পর এটি বোগাস বাক্য হয়ে যায়। তখন আর রেডি হওয়ার সময় নেই। তা পার হয়ে গেছে। অগোছানো সব কাজ আজ থেকেই করতে হবে।
চল্লিশ মাথায় টক্সিক ব্যাপার নিতে পারে না। চাপ সৃষ্টি করে, তা থেকে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। তাই চল্লিশে এসে টক্সিক ব্যাপারগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে। মিথ্যাচার, বিদ্বেষ ছড়ানো ভিডিও, কূটকচালিতে ভর্তি টিভি সিরিয়াল, ভুয়া খবর এগুলো দেখে শরীরের উপর চাপ ফেলা যাবে না।
৯ ) তুমি যে আমার কত প্রিয়…
চল্লিশে এসে প্রেমভাব তত থাকে না। জীবনযন্ত্রণা প্রিয়জনের প্রতি আগের মতো রোমান্টিকতা কমিয়ে ফেলে। এটা হতে দেওয়া যাবে না। দুজনের বোঝাপড়া, ছোট ছোট আনন্দ-মুহূর্ত কাটিয়ে প্রেম চিরসবুজ রাখতে হবে। জীবনসঙ্গীর সাথে প্রেম করার মতো মধুর আর কিছু নেই। এটি বজায় থাকলে শরীর-মনের অন্য ওষুধ তেমন লাগে না।
চল্লিশ হচ্ছে- আমি কি দ্রুত বুড়িয়ে যাব? না সুন্দর শরীর ও মন বজায় রাখব? এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। আপনি যা সিদ্ধান্ত নেবেন তা-ই ঘটবে। তবে আমার মনে হয়, একটু যত্ন নিলে যদি সুন্দর থাকা যায় তবে বুড়িয়ে যাওয়ার কোনো মানে নেই।
চল্লিশ মানে একধরনের ব্যাকপ্যাক। তা থেকে কিছু জিনিস ঝেড়ে ফেলতে হয়। কিছু নতুন জিনিস ঢোকাতে হয়।
চল্লিশ নামের ব্যাকপ্যাকটি নতুন করে সাজান। কথা দিচ্ছি, ঠকবেন না।
এ জাতীয় আরো খবর...