ছোটবেলায় মা-খালা-ফুপুরা আমাদের যেভাবে বড় করেছেন আমার মনে হয় সেখান থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। বিভিন্ন কারণে ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় এখন এগুলোর চর্চা তেমন হয় না। হলে খুব ভালো হতো।
এরকম কয়েকটি ব্যাপার তুলে ধরছি-
ক। তাঁরা আমাদের অবশ্যই দুপুরে ঘুম পাড়াতেন। এর বৈজ্ঞানিক কারণ হয়ত তাঁরা জানতেন না – নিজের মা-খালাকে দেখে শিখেছিলেন। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, দুপুরে অল্পক্ষণ ঘুম এক থেকে সাত বছর বয়সী শিশুদের –
১ ) মস্তিষ্ক বিকাশে সাহায্য করে।
২ ) তাদের মেজাজ ভালো রাখে।
৩ ) তাদের মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।
৪ ) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
খ। ঘুম পাড়ানোর সময় আমাদের মা-খালা-ফুপুরা গুনগুন করে গান গাইতেন। এখন দেখা যাচ্ছে এতে-
১ ) শিশুদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়।
২ ) তাদের ভাষা শেখার ভিত্তি গড়ে ওঠে।
৩ ) স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
৪ ) মা-বাবার সাথে বন্ধন মজবুত করে।
গ। তাঁরা আমাদের নিয়মিত গল্প শোনাতেন। বিজ্ঞান বলছে এতে –
১ ) শিশুদের কল্পনাশক্তি বাড়ে।
২ ) বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা বাড়ে।
৩ ) নৈতিকতার ভিত্তি তৈরি হয়।
৪ ) পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ে।
ঘ। আমাদের বিকেলে পরিপাটি করে, চুল আঁচড়ে খেলতে পাঠাতেন এতে-
১) শরীর শক্তিশালী হয়।
২) প্রতিদ্বন্ধিতা করার আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে।
৩) অন্য শিশুদের সাথে খেলার কারণে সামাজিক দক্ষতা বাড়ে।
৪) ক্ষুধা বাড়ে।
৫) ঘুম ভালো হয়।
ঙ। তাঁরা আমাদের চমৎকার সব বই কিনে দিতেন এতে-
১) শিশুদের মধ্যে প্রথম পাঠক মন তৈরি হয়।
২) তাদের কল্পনার জগত উন্মুক্ত হয়।
৩) বই পড়ে তাদের মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম হয়। যা সারাজীবন সম্পদ হয়ে থাকে।
চ। কিছুদিন পর পর তাঁরা আমাদের নিয়ে কোনো না কোনো আত্মীয় বা পাড়া-পড়শির বাড়িতে বেড়াতে যেতেন। এখন বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, এতে-
১) শিশুদের মধ্যে অন্যের সাথে বন্ধন তৈরি হয়।
২) এ ধরনের বেড়ানো তাদের মধ্যে যে সুখস্মৃতি তৈরি করে তা সারাজীবন থেকে যায়।
ছ) আমাদের মা-খালা-ফুপুরা ভাইবোনদের সাথে লুকোচুরি খেলতে উৎসাহ দিতেন। এতে-
১) শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বাড়ে। কারণ বুদ্ধি খাটিয়ে লুকিয়ে থাকা সঙ্গীকে খুঁজে বের করতে হয়।
২) ভাইবোনদের মধ্যে বন্ধন তৈরি হয়।
তখন ছিল নিরিবিলি পরিবেশ। জীবনযাত্রা ছিল সহজ। ব্যস্ততা ছিল কম। তারপর আস্তে আস্তে নিরিবিলি বিদায় নিলো। জায়গা করে নিলো অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততার কত কিছু!
অসংখ্য টিভি চ্যানেল।
টিভি সিরিয়াল।
মোবাইল ফোন।
সোশ্যাল মিডিয়া।
নেটফ্লিক্স কিংবা ওটিটি।
ছবি তোলা ও সাজসজ্জায় অতিরিক্ত ব্যস্ততা।
আমাদের কুসুমকোমল শৈশব- যখন মা গান গাইতেন, ছড়া শোনাতেন, লুকোচুরি খেলতেন, চুল আঁচড়ে বেড়াতে নিতেন, ঘুম পাড়াতেন- সব আস্তে আস্তে গল্প হয়ে গেলো।
ফলাফল হচ্ছে- ভয়াবহ। যার মূল্য দিচ্ছে শিশুরা।
অঙ্কটা খুব সরল-
আমাদের অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা = শিশুর অসম্পূর্ণ বিকাশ।
লেখাটি লিখছি আর কানে বাজছে আমার তরুণী মায়ের গান—
ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি
মোদের বাড়ি এসো
খাট নাই পালং নাই
আসন পেতে বসো।
বাটা ভরা পান দেবো
গাল ভরে খেও
খোকার চোখে ঘুম নাই
ঘুম দিয়ে যেও।
হারিয়ে যাওয়া গান আর গল্পগুলো ফিরিয়ে আনা কি একেবারেই অসম্ভব?
এ জাতীয় আরো খবর...