শিরোনামঃ
রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৫ অপরাহ্ন

সীমান্তে পুশইন চেষ্টা কমলেও পুরোপুরি থামেনি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৩ বার
প্রকাশ: রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬

ভারতের একতরফা পুশইন বা একতরফাভাবে মানুষ ঠেলে পাঠানোর প্রচেষ্টা আগের তুলনায় কিছুটা হ্রাস পেলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে থেমে থেমে এখনো অবৈধভাবে মানুষ পাঠানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে শুরু থেকেই এই অনড় অনুপ্রবেশের বিষয়ে ‘শূন্য সহনশীলতা’ (জিরো টলারেন্স) নীতি অনুসরণ করে প্রতিটি প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার কচুরগুল সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। স্থানীয় বাসিন্দাদের তাৎক্ষণিক তথ্যের ভিত্তিতে বিজিবি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং ওই ব্যক্তিদের পুনরায় ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে দেয়।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত মাসেই ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছিল। সেই দ্বিপাক্ষিক প্রতিশ্রুতির পরও নতুন করে পুশইনের এই প্রচেষ্টা দুই দেশের সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় বর্তমানে পুশইনের হার কিছুটা কমেছে। কূটনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে সীমান্তে বিজিবির কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের ভূ-রাজনৈতিক বিষয়টিও সামনে আসছে। কারণ তাঁর এই বেইজিং সফরের সময় থেকেই নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে নেওয়া বেশ কিছু নতুন উদ্যোগ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

রাজনৈতিক ইতিহাস অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা-নয়াদিল্লি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যে একধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে বর্তমান সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, দেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের অনড় বার্তা দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের দ্বিতীয় বিদেশ সফর ছিল চীনে। সেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘সামার দাভোস’ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি প্রায় পাঁচদিনের বেইজিং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন তিনি। উক্ত বৈঠকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় এবং যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানে বাংলাদেশের পাশে থাকার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে শি জিনপিং। একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন, চীন সবসময়ই বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই বেইজিং সফরের ওপর ভারতের নিবিড় কৌশলগত নজর ছিল এবং দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও প্রকাশ্যে বিষয়টি স্বীকার করেছেন। ওই সফরের সময় থেকেই দিল্লির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়ানোর একাধিক ইতিবাচক উদ্যোগ কূটনৈতিক মহলের নজরে এসেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে পুশইনের ঘটনা আগের তুলনায় কমে আসাও মূলত সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক বাস্তবতারই একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হতে পারে। যদিও তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন, বিচ্ছিন্নভাবে পুশইনের চেষ্টা এখনো অব্যাহত থাকায় এটিকে এখনই সরাসরি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থায়ী উন্নয়ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এদিকে পুশইন ইস্যুতে শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী কঠোর অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে যে, যথাযথ আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী পরিচয় যাচাই-বাছাই এবং বিদ্যমান আইনি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা ছাড়া কাউকে বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না। ঢাকার এই অনড় অবস্থান ইতিমধ্যে একাধিকবার নয়াদিল্লিকে অফিশিয়ালি জানানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে ভারতকে একাধিক ‘নোট ভারবাল’ বা কূটনৈতিক পত্রও পাঠিয়েছে ঢাকা।

এই জোরালো কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি বর্তমানে সীমান্তে বিজিবি টহল, আধুনিক গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয় সীমান্তবর্তী জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় যেকোনো ধরনের সন্দেহজনক গতিবিধির খবর পাওয়া মাত্রই তাৎক্ষণিক অ্যাকশনে যাচ্ছে বিজিবি, যার ফলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একের পর এক পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। বিজিবি সদর দপ্তর জানিয়েছে, সীমান্ত পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও কড়া পাহারা বজায় থাকবে।

বিজিবির প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক পুশইনের চেষ্টা নতুন নয়, তবে গত এক বছরের বেশি সময়ে এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ই মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত দেশের ৩২টি সীমান্তবর্তী জেলা দিয়ে মোট ২ হাজার ৪৭৯ জনকে একতরফাভাবে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২৬ জন ভারতীয় নাগরিক এবং ৩৮ জন মিয়ানমারের নাগরিক ছিলেন। বাকি ব্যক্তিদের বাংলাদেশি বলে দাবি করেছে ভারত, তবে তাদের প্রকৃত নাগরিকত্ব ও পরিচয় যাচাইয়ের আইনি প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে। এরপরও পুশইনের চেষ্টা থেমে থাকেনি; চলতি বছরের ৪ঠা জুন থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অন্তত ১৮টি বড় পুশইনের চেষ্টা বিজিবি দক্ষতার সাথে প্রতিহত করেছে, যেসব ঘটনায় প্রায় ১৮০ জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। বাংলাদেশের মূল অভিযোগ হলো, প্রচলিত দ্বিপাক্ষিক প্রত্যাবাসন চুক্তি ও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই একতরফাভাবে এই মানুষ পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

সূত্র: মানবজমিন


এ জাতীয় আরো খবর...