বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৩ অপরাহ্ন

প্রধানমন্ত্রীর সৌদি সফরে নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের আশা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ০ বার
প্রকাশ: বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু, অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী এবং সর্ববৃহৎ শ্রমবাজার সৌদি আরবের বাদশার আমন্ত্রণে সেদেশে রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই দ্বিপক্ষীয় সফরটিকে কেবল একটি সাধারণ কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা, প্রবাসীদের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তথা রেমিট্যান্স প্রবাহকে চাঙ্গা করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশী কর্মী কর্মরত আছেন, যারা তাদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন এবং গত অর্থবছরেই তারা প্রায় ২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। রাজকীয় সৌদি সরকারের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর এই আসন্ন সফরের মাধ্যমে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সাফল্যের এক নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার সমান্তরালে সৌদি শ্রমবাজারে বর্তমানে এক ধরণের অস্থিতিশীল ও জটিল পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যা দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। সঠিক তদারকি ও আন্তরিকতার অভাবে সৌদি আরবের শ্রমবাজার এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। সেখানে কর্মরত হাজার হাজার বাংলাদেশী কর্মী বর্তমানে আকামা ও চাকরিবিহীন অবস্থায় অত্যন্ত কষ্টকর জীবনযাপন করছেন। অনেক সৌদি নিয়োগকর্তা সঠিক নিয়ম মেনে সময়মতো আকামা তৈরি বা নবায়ন করছেন না এবং নিয়মিত বেতন পরিশোধ করছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সংকটের প্রভাব সরাসরি নতুন কর্মী নিয়োগের ওপর পড়েছে। যেখানে আগে ঢাকাস্থ সৌদি দূতাবাস থেকে দৈনিক পাঁচ থেকে sechs হাজার ভিসা ইস্যু হতো, সেখানে বর্তমানে নানা জটিলতায় হাতেগোনা কিছু বহির্গমন ছাড়পত্র ইস্যু করা হচ্ছে। জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রা (BAYRA) জানিয়েছে, সৌদি নিয়োগকর্তাদের বিভিন্ন অসঙ্গতি ও ব্যর্থতার কারণে সম্প্রতি সরকারিভাবে অনুমোদিত হাজার হাজার ভিসা ও ডিমান্ড বাতিল হয়ে গেছে, যার ফলে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং নতুন কর্মীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও আমলাতান্ত্রিক কড়াকড়ি ও সমন্বয়হীনতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিএমইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সৌদি আরবে ২ লাখ ১৪ হাজার ৫৭০ জন কর্মী চাকরি পেয়ে গেছেন। কিন্তু এই সুসংবাদের মধ্যেই গত ১ জুলাই থেকে বিএমইটি কর্তৃপক্ষ কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সৌদিগামী কর্মীদের বহির্গমন ছাড়পত্রের জন্য ‘চাহিদাপত্র’ বা ডিমান্ড লেটার বাধ্যতামুলক করে দেয়। এর ফলে অনলাইনে ছাড়পত্র পাওয়ার আবেদন প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং শত শত সৌদি গমনেচ্ছু কর্মী চরম বিপাকে পড়েছেন। অনেকের কষ্টার্জিত ভিসা ও মেডিকেল রিপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বিগত জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণায় দেশে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিএমইটির কিছু কর্মকর্তার অহেতুক নতুন শর্তারোপের সিদ্ধান্ত। এই কৃত্রিম সংকট ও জটিলতা শেষ পর্যন্ত দেশের সাধারণ রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং সামগ্রিক জাতীয় স্বার্থকেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সৌদি সফরই হতে পারে এই বহুমুখী সংকটের সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। জনশক্তি রপ্তানিকারক ও অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরে সৌদি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে একটি সময়োপযোগী ও সুনির্দিষ্ট শ্রমসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করা অত্যন্ত জরুরি। এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশী কর্মীদের সঠিক কর্মপরিবেশ, বাসস্থান, ন্যায্য বেতন এবং নিয়োগকর্তা কর্তৃক সময়মতো আকামা নবায়নের বিষয়টি আইনিভাবে নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে ভুয়ো ও নামসর্বস্ব কোম্পানির ভিসা অনুমোদন বন্ধ করতে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে কোনো কর্মী গিয়ে প্রতারিত না হন। সরকারি নীতিনির্ধারণী মহলের এমন দূরदर्शी উদ্যোগ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি লাখো কর্মপ্রত্যাশীর জীবন সুরক্ষিত করবে।

জনশক্তি খাতের এই সংস্কারের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফের এইচ. বিন আবিয়াহ স্পষ্ট করেছেন যে, আগামী পাঁচ বছর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘রূপান্তরমূলক অধ্যায়’ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। সৌদি আরব এখন আর বাংলাদেশকে কেবল সস্তা শ্রমশক্তির উৎস হিসেবে দেখতে চায় না; বরং তারা তাদের নিজস্ব ‘ভিশন ২০৩০’ এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে কৌশলগত বিনিয়োগ, শিল্প অংশীদারিত্ব এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের দিকে এগিয়ে যেতে আগ্রহী। ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের বিশাল বাজার এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানের কারণে সৌদি বিনিয়োগকারীরা ঢাকাকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এই সফরে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারমূলক খাতে মেগা বিনিয়োগের বিশেষ প্রস্তাব আসতে পারে। দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগের প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত, যেখানে তেল শোধনাগার নির্মাণ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল এবং সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে যৌথ বিনিয়োগের বিশাল সুযোগ রয়েছে। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল ফাইন্যান্স খাতের অধীনে আইটি পার্ক স্থাপন, আউটসোর্সিং এবং আর্থিক প্রযুক্তি বা ফিনটেক সম্প্রসারণে সৌদি প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহী। বন্দর ও বড় অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে মাতারবাড়ি ও পায়রা সমুদ্রবন্দরের আধুনিকায়ন, ঢাকার পূর্ব-পশ্চিম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ এবং দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর (SEZ) উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সৌদি বিনিয়োগের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। এর বাইরে হালাল খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সার কারখানা স্থাপন, বিশ্বমানের হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণ এবং বিমান চলাচল খাতের উন্নয়নে অ্যারোস্পেস শিল্পাঞ্চল ও বিমান মেরামত কারখানা স্থাপনের মতো আধুনিক প্রকল্পগুলোতেও সৌদি আরব বড় অংকের পুঁজি বিনিয়োগ করতে চায়।

পরিশেষে বলা যায়, সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির কারণে সেখানে প্রথাগত পেশার বাইরেও তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন ও লজিস্টিকসের মতো আধুনিক খাতে বাংলাদেশী দক্ষ ও পেশাদার জনশক্তির জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই সুযোগগুলোকে পুরোপুরি লুফে নিতে দুই দেশের সরকারকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে, যার মধ্যে অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং আন্তর্জাতিক মানের স্কিল সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করা অন্যতম। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সৌদি সফর সফল হলে তা কেবল দেশের শ্রমবাজারকেই চাঙ্গা করবে না, বরং বৈচিত্র্যময় সৌদি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে এক শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হবে।

তথ্যসূত্র: ইনকিলাব


এ জাতীয় আরো খবর...