বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ১২:৪২ অপরাহ্ন

বৈশ্বিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ আর্থিক দুর্নীতি: লাল বাতি জ্বলছে দেশের প্রধান শিল্পে

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬

বিশ্বকাপ ফুটবলের চরম উত্তেজনা, বিশেষ করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ম্যাচ নিয়ে বাংলাদেশী সমর্থকদের উন্মাদনার আড়ালে দেশের একটি বড় সংকট ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। ফুটবল মাঠের জয়-পরাজয় নিয়ে যখন সাধারণ মানুষ মেতে আছেন, ঠিক তখনই দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতে এক বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ২০ হাজার পোশাক শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যেখানে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার প্রত্যাশা ছিল, সেখানে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো রূপ নিয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) দেশের এই বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে নজিরবিহীন ঝুঁকির সাথে তুলনা করেছে। তাদের মতে, এখনই যদি অর্থনীতিতে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার আনা না হয়, তবে দেশের সামনে এক গভীর অন্ধকার ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। তৈরি পোশাক কারখানার মালিকেরা জানিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য কেনার চাহিদা ব্যাপক হারে কমে যাওয়ার কারণে দেশের গার্মেন্টসগুলোতে নতুন অর্ডারের খরা দেখা দিয়েছে। এর ওপর মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার যুদ্ধাবস্থা বিশ্ব বাণিজ্যকে আরও বেশি বিপর্যস্ত করে তুলেছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজ ভাড়া এক ধাক্কায় প্রায় তিন গুণ বেড়ে গেছে।

বৈশ্বিক এই অস্থিরতার কারণে ইউরোপের বড় বড় ক্রেতা বা বায়াররা এখন বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক বা অন্য কোনো পণ্য নিতে চরম ভয় পাচ্ছেন। কারণ লজিস্টিকস ও জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধির সংকটের কারণে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য ক্রেতাদের হাতে পৌঁছানোর কোনো সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে এই বৈশ্বিক সংকটের চেয়েও বড় সংকট লুকিয়ে আছে আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, অনেক কারখানায় বিদেশী বায়ারদের পর্যাপ্ত অর্ডার থাকা সত্ত্বেও দেশের ব্যাংকগুলো তাদের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি বা ঋণপত্র খোলার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে না। ব্যাংকগুলোর এই অনীহার প্রধান কারণ হলো, তাদের নিজেদের কাছেই এখন কোনো উদ্বৃত্ত টাকা নেই। বিগত বছরগুলোতে সংঘটিত ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি, হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ এবং দেদারসে বিদেশে টাকা পাচারের কারণে দেশের অন্তত এক ডজন ব্যাংক এখন পুরোপুরি দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। দেশের এই ভঙ্গুর ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার বা রেপো সাপোর্ট দিতে হচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা গার্মেন্টস মালিকদের সচল থাকার জন্য নতুন কোনো ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বা কাঁচামাল কেনার লোন দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। যখন একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা কমতে শুরু করে এবং মানুষ ব্যাংক থেকে নিজেদের আমানত তুলে নেয়, তখন পুরো আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ে যা মূলত একটি দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

দেশের এই সামষ্টিক বা ম্যাক্রো অর্থনৈতিক সংকটের চূড়ান্ত মূল্য দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ এবং খেটে খাওয়া মানুষকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, বিগত টানা দুই বছর ধরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতির হার ১০ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, যার মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাধারণ সূচকের চেয়েও অনেক বেশি। সহজ কথায় বলতে গেলে, বাজারে যে পণ্যের দাম আগে ১০০ টাকা ছিল, সাধারণ মানুষকে এখন সেই একই পণ্য কিনতে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। অথচ এই আকাশচুম্বী দামের বিপরীতে সাধারণ মানুষের মাসিক আয় বিন্দুমাত্র বাড়েনি। ফলে বাধ্য হয়েই দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে আগের চেয়ে অত্যন্ত দরিদ্র ও জরাজীর্ণ অবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের এই ত্রাহি মধুর অবস্থার মধ্যেই মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো এসে যুক্ত হয়েছে পোশাক খাতের এই গণছাটাই। দেশের মোট ডলার আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই আসে এই পোশাক শিল্প থেকে। ফলে মাত্র ছয় মাসে ২০ হাজার শ্রমিকের চাকরি চলে যাওয়া এবং এই খাতের অন্তত ৮৭টি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল ইঞ্জিনে বড় ধরনের গোলযোগ তৈরি হওয়া। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট ডলারের রিজার্ভ প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার দেখানো হলেও, আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য বা নেট রিজার্ভের প্রকৃত পরিমাণ মাত্র ৩০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এই সীমিত পরিমাণ অর্থ দিয়ে বড়জোর তিন থেকে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি সংকেত।

দেশের রিজার্ভের এমন নড়বড়ে অবস্থার কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও এখন বাংলাদেশে নতুন কোনো পুঁজি বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। গত চার বছরের ব্যবধানে ডলারের অফিশিয়াল দাম ৮৫ টাকা থেকে এক লাফে ১২০ টাকার ওপরে চলে গেছে, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি। ডলারের দাম এভাবে বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কলকারখানার কাঁচামাল আমদানির খরচও ৩০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। ফলে উৎপাদিত চূড়ান্ত পণ্যের দাম বাজারে এসে আরও বেশি হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব আমরা বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। এদিকে দেশের মূল্যবান ডলারের মজুদ ধরে রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। এই কড়াকড়ির ফলে দেশের ভারী ও মাঝারি শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী কাঁচামাল সময়মতো না এলে কারখানায় উৎপাদন কমে যায় এবং উৎপাদন কমলে একপর্যায়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে মানুষের চাকরি চলে যায়। এই অর্থনৈতিক সমীকরণটি ঘুরেফিরে সবসময় দেশের সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার ওপরই আঘাত হানে।

অনেকে মনে করেন অর্থনৈতিক সংকট মানেই বোধহয় শ্রীলঙ্কার মতো রাতারাতি পুরো দেশ দেউলিয়া হয়ে যাওয়া। কিন্তু অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি বিপজ্জনক। এটি হঠাৎ কোনো স্ট্রোক করার মতো ঘটনা নয়, বরং এটি হলো ক্যান্সারের মতো যা অলক্ষ্যে ক্রমাগত পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে ধ্বংস ডেকে আনে। এই সংকটের প্রধান উৎস হলো দেশের ব্যাংক খাতের বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, যার সাথে যুক্ত হয়েছে ডলারের অপচয় এবং ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট বা কর আদায়ে চরম ব্যর্থতা। ডলার সংকটকে যদি আমরা অর্থনীতির ফুসফুসের রোগ হিসেবে বিবেচনা করি, তবে দেশের ব্যাংকিং খাতের বিশাল খেলাপি ঋণ হলো এক ধরণের ব্লাড ক্যান্সার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তবে এর সাথে যদি ব্যাংকের অবলোপন করা ঋণ, বারবার পুনঃতফসিল করা ঋণ এবং উচ্চ আদালতে আটকে থাকা ঋণসংক্রান্ত মামলার বিশাল হিসাব যোগ করা হয়, তবে প্রকৃত ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ চার থেকে পাঁচ লাখ কোটি টাকা পার হয়ে যাবে। এই চরম ব্যাংকিং সংকটের মধ্যে আবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের দফায় দফায় দাম বৃদ্ধি। এর ফলে কারখানার উৎপাদন খরচ যেমন বহুগুণ বেড়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন বাঁচানোই এখন দায় হয়ে পড়েছে। পোশাক খাত থেকে ছাটাই হওয়া এই ২০ হাজার সদ্য বেকার হওয়া যুবক এখন কোথায় যাবেন—তা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ফিরে গিয়ে তাদের নতুন করে কৃষি কাজ করার মতো অনুকূল পরিস্থিতিও এখন আর অবশিষ্ট নেই। দেশের সর্বত্র কাজের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে, এমনকি জীবিকার তাগিদে অটোরিকশা চালানোর সুযোগও এখন সীমিত। ফলে এই বিশাল বেকার জনগোষ্ঠী জীবন ধারণের জন্য চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো নানা সামাজিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এমনকি চরম হতাশা থেকে তারা যদি কোনো উগ্রপন্থা বা জঙ্গিবাদের দিকে ধাবিত হয়, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও ঐতিহ্যবাহী যে তৈরি পোশাক শিল্প, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই কাঠামোগত সংকট এখন লাল বাতি জ্বালিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের আসরে প্রিয় দলের বিদায়ে কষ্ট পাওয়া যেমন স্বাভাবিক, তেমনি দেশের এই ২০ হাজার শ্রমিকের হঠাৎ কাজ হারিয়ে পথে বসার নির্মম বাস্তবতার বিষয়েও দেশের নীতিনির্ধারক ও সাধারণ নাগরিকদের গভীরভাবে ভাবা অত্যন্ত জরুরি।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ


এ জাতীয় আরো খবর...