আজকের ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক প্রসারের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির সাইবার অপরাধী ও ভন্ড চক্র সমাজজুড়ে এক ভয়াবহ ফাঁদ পেতেছে। আধ্যাত্মিক সমাধান, পারিবারিক কলহ মুক্তি কিংবা মনের মানুষকে কাছে পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তারা সহজ-সরল ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নারীদের টার্গেট করছে। ইদানীং দেশের চিকিৎসা অঙ্গনে বিশেষ করে বড় বড় সরকারি মেডিকেল কলেজ ও বার্ন ইনস্টিটিউটগুলোতে এক নতুন ধরনের কেমিক্যাল বার্ন বা রাসায়নিক দাহের রোগী আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা চিকিৎসার ভাষায় পটাশ চিনি বার্ন নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এই প্রতারণার শিকার হয়ে প্রতি মাসে বহু তরুণী ও কিশোরী চিরতরে তাদের হাতের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটসহ চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও কুমিল্লার মতো বড় বড় শহরের হাসপাতালগুলোতে গত এক বছর ধরে এই ধরনের অসংখ্য স্পর্শকাতর ঘটনা নিয়মিত সামনে আসছে। এই কেসগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, সাধারণ পোড়া রোগীর মতো এদের ক্ষতস্থান সারা শরীরে ছড়ানো থাকে না, বরং হাতের তালুর একটি নির্দিষ্ট স্থানে অত্যন্ত গভীর ক্ষত বা ডিপ বার্ন তৈরি হয়। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই নিষ্ঠুর জালিয়াতির শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের প্রায় ৯৫ শতাংশই তরুণী ও কিশোরী, যাদের বয়স সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
চিকিৎসা কর্মকর্তারা এই ধরনের রোগীদের গোপন জবানবন্দি ও কেস হিস্ট্রি পর্যালোচনা করে এক রোমহর্ষক ও সুসংগঠিত অপরাধ চক্রের সন্ধান পেয়েছেন। এসব ভুক্তভোগী নারী প্রথমে লোকলজ্জা ও পারিবারিক অশান্তির ভয়ে চিকিৎসকদের কাছে সত্য গোপন করার চেষ্টা করেন এবং ঘরের কাজ করতে গিয়ে হাত পুড়েছে বলে মিথ্যা অজুহাত দেন। তবে সাধারণ গরম পানি বা আগুনের পোড়ার সাথে রাসায়নিক পোড়ার গভীরতার ব্যাপক পার্থক্য থাকায় চিকিৎসকেরা সহজেই আসল রহস্য ধরে ফেলেন। পরবর্তীতে স্বামীদের বা অভিভাবকদের আড়ালে রেখে যখন এসব তরুণীদের গোপনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তখন বেরিয়ে আসে অনলাইন জগতের এক অন্ধকার চিত্র। ইন্টারনেট বা ফেসবুকে সক্রিয় থাকা ভন্ড তান্ত্রিক, কবিরাজ কিংবা স্বঘোষিত হুজুরদের পেইজ ও বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দিয়েই তারা নিজেদের জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি ডেকে এনেছেন।
এই মারাত্মক রাসায়নিক দুর্ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে একটি সহজ কিন্তু তীব্র জারণ-বিজারণ বিক্রিয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট হলো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী জারক পদার্থ, যা সাধারণত জীবাণুনাশক বা অ্যান্টিসেপ্টিক হিসেবে ফার্মেসিগুলোতে খুব কম দামে কিনতে পাওয়া যায়। অন্যদিকে আমাদের ঘরে থাকা সাধারণ চিনি হলো একটি শক্তিশালী বিজারক পদার্থ। এই দুটি উপাদান যখন শুষ্ক অবস্থায় একসাথে মেশানো হয় এবং হাতের মুঠোয় নিয়ে সামান্য চাপ বা ঘর্ষণ দেওয়া হয়, তখন কোনো প্রকার আগুন ছাড়াই সেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি তীব্র রাসায়নিক বিস্ফোরণ ঘটে এবং প্রচুর পরিমাণে তাপ ও ধোঁয়া উৎপন্ন হয়। অনলাইন প্রতারকেরা এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে তাদের অলৌকিক ক্ষমতা বা জিনের আগমন হিসেবে ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের বোকা বানায়। তারা ভিডিও কলের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের মুখ না দেখিয়ে কেবল হাতের তালু ক্যামেরার সামনে রাখতে বলে এবং পটাশ ও চিনির মিশ্রণটি শক্ত করে মুঠো করে ধরে রাখার নির্দেশ দেয়। রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হলে যখন হাত তীব্রভাবে জ্বলতে থাকে, তখন ভন্ডরা ধর্মীয় ও মানসিক ভয় দেখিয়ে বলে যে হাত ছেড়ে দিলে পরিবারে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে কিংবা মা-বাবা মারা যাবেন। এই অলৌকিক বিপদের ভয়ে অনেক তরুণী ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ড পর্যন্ত তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে সেই ফুটন্ত রাসায়নিক মিশ্রণটি মুঠো করে ধরে রাখেন, যার ফলে হাতের তালুর চামড়া, মাংসপেশি ও রক্তনালী সম্পূর্ণ পুড়ে কয়লা হয়ে যায়।
এই চক্রের পাতা ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব ও হাত হারিয়েছেন কুমিল্লার ভুক্তভোগী রুখসানা আখতার। বিবাহবিচ্ছেদের পর নিজের সন্তানকে ফিরে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে তিনি ফেসবুকের এক ভন্ড হুজুরের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। ভুক্তভোগী রুখসানা আখতার জানান যে, সামাজিক ও আইনি সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি ইন্টারনেটে পাওয়া ওই হুজুরের কথায় বিশ্বাস করে বসেন। হুজুর তাকে মাত্র দশ মিনিটে সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়ে ফার্মেসি থেকে পটাশ কিনে আনতে বলে। গভীর রাতে ভিডিও কলে যুক্ত হয়ে হুজুরের নির্দেশ মোতাবেক তিনি পটাশ ও চিনি হাতের তালুতে নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাত ঝলসে যেতে শুরু করলে হুজুর তাকে সাবধান করে বলেন যে হাত ছেড়ে দিলে তার মায়ের বড় ক্ষতি হবে। একপর্যায়ে তীব্র যন্ত্রণায় তিনি হাত ছেড়ে দিলে প্রতারক চক্রটি হাত ভালো করার এবং জিনের রাগ ভাঙানোর নামে উল্টো তার কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা শুরু করে। লোকলজ্জার ভয়ে প্রথমে চুপ থাকলেও পরদিন হাতের তালুর মাংস ফুলে উঠলে তিনি বাধ্য হয়ে বার্ন হাসপাতালে ভর্তি হন।
অনুরূপ আরেকটি ঘটনায় প্রেমের সম্পর্কে টানাপোড়েনের জেরে তান্ত্রিকের খপ্পরে পড়েছিলেন শ্রাবণী মজুমদার নামের এক তরুণী। বাবা-মা ঘরে না থাকার সুযোগে তিনি অনলাইন কবিরাজের কথামতো দোকান থেকে পটাশ কিনে এনে ডান হাতে চিনির সাথে মিশিয়ে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরেছিলেন। এর ফলে তাঁর ডান হাতের তালুর পাশাপাশি বুকের একাংশের চামড়াও মারাত্মকভাবে ঝলসে যায়। ঘটনার পরপরই তান্ত্রিক তাকে কালী পূজার মিষ্টি কেনার নাম করে হাজার হাজার টাকা বিকাশে পাঠানোর জন্য চাপ দিতে থাকে। তবে তীব্র যন্ত্রণায় কাতর হয়ে তিনি দ্রুত বাবা-মাকে বিষয়টি জানালে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পান। চিকিৎসকেরা জানান যে, এই একই ফাঁদে পড়ে অনেক ভুক্তভোগী পরিবারকে না জানিয়ে হাত ভালো করার আশায় ধাপে ধাপে ১০ হাজার থেকে শুরু করে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত খোয়াচ্ছেন। এমনকি রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভে পড়ে এই চক্রের মাধ্যমে প্রতারিত হয়েছেন এমন মধ্যবয়সী পুরুষের সন্ধানও হাসপাতালে পাওয়া গেছে।
ঢাকার মতিঝিলের বাসিন্দা ভুক্তভোগী ইশরাত জাহানও দাম্পত্য কলহ মেটাতে গিয়ে একই ধরনের প্রতারণার শিকার হন। পবিত্র রমজান মাসে ফেসবুকের এক হুজুরের কথায় সরল বিশ্বাসে পটাশ ও মিষ্টির রস একসাথে মেশানোর পর এক বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। ভুক্তভোগী ইশরাত জাহান জানান যে, হুজুর তাকে জিনের মাধ্যমে কাজ করানোর ভয় দেখিয়ে এক মিনিট পর্যন্ত সেই জ্বলন্ত মিশ্রণটি ধরে রাখতে বাধ্য করে, যার ফলে তিনি ব্যথার চোটে একপর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে যান। জ্ঞান ফেরার পর জিনের রাগ শান্ত করার অজুহাতে তার কাছে দুই মণ মিষ্টির টাকা দাবি করা হয় এবং ডাক্তার দেখালে পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে বলে ব্ল্যাকমেইল করা হয়। মূলত এই প্রতারক চক্রগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে কাজ করে এবং তারা প্রায়শই তাদের ফেসবুক পেইজ, ইউটিউবের বিজ্ঞাপনী লিংক এবং ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরগুলো দ্রুত পরিবর্তন করে ফেলে, যার ফলে তাদের সহজে ট্র্যাক করা যায় না।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই পটাশ চিনি বার্নের ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি। মানুষের হাতের তালুর চামড়া সাধারণত অনেক পুরু হলেও এর নিচে থাকা এপিডার্মিস ও ডার্মিস স্তর যখন রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে সম্পূর্ণ পুড়ে যায়, তখন তাকে থার্ড বা ফোর্থ ডিগ্রি ডিপ বার্ন বলা হয়। প্রচণ্ড তাপমাত্রার কারণে মাত্র ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ডের মধ্যে হাতের ভেতরের চর্বির স্তর, মাংসপেশি, স্নায়ু এবং প্রধান প্রধান রক্তনালীগুলো পুড়ে অকেজো হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে পুরো হাতটি পচে যায়, যার ফলে চিকিৎসকদের জীবন বাঁচাতে রোগীর হাত কেটেও ফেলতে হয়। এই ধরনের গভীর ক্ষত নিরাময়ের জন্য প্লাস্টিক সার্জারির একটি বিশেষ কৌশল হিসেবে ‘অ্যাবডোমিনাল ফ্ল্যাপ’ সার্জারি করা হয়, যেখানে রোগীর ক্ষতিগ্রস্ত হাতটিকে পেটের অক্ষত চামড়া ও রক্তনালীর সাথে টানা ২১ দিন সেলাই করে জুড়ে রাখা হয়। পরবর্তীতে নতুন চামড়া গজালে পুনরায় অপারেশনের মাধ্যমে আঙুলগুলোকে আলাদা করা হয়। এই পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়। চিকিৎসকদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হলো, এত দীর্ঘমেয়াদি সার্জারি ও থেরাপির পরও এই হাতগুলো আর কখনোই তাদের পূর্বের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে পায় না, কেবল দৈনন্দিন সাধারণ কাজের জন্য কোনোমতে কার্যকর বা ফাংশনাল করে তোলা সম্ভব হয়। অতএব, ইন্টারনেটে ছড়ানো এই ধরনের অলৌকিক বা অবৈজ্ঞানিক শর্টকাট সমাধানের বিজ্ঞাপন থেকে দেশের তরুণ প্রজন্মকে দূরে থাকা এবং যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে প্রতারকদের বিশ্বাস না করে আইনি ও সামাজিক সঠিক পথ অবলম্বন করা উচিত।
তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড