বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ১২:২৬ অপরাহ্ন

অনলাইন বাজারে অনুমোদনহীন পণ্যের দাপট

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬

বর্তমান সময়ে ই-কমার্স বা অনলাইন কেনাকাটা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরে বসেই সব ধরনের পণ্য পাওয়ার এই সুবিধার আড়ালে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী লাইসেন্সহীন ও মানহীন পণ্যের এক বিশাল বাজার তৈরি করেছে। দেশের বড় বড় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে শুরু করে ফেসবুকের অজস্র পেজ ও গ্রুপে এখন অনুমোদনহীন, নকল এবং লাইসেন্সহীন বিদেশি পণ্যের মেলা। কসমেটিকস, ওষুধ, ইলেকট্রনিক গ্যাজেট এমনকি শিশুখাদ্যও বিক্রি হচ্ছে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই। এর ফলে একদিকে যেমন সাধারণ ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন, অন্যদিকে মারাত্মক লোকসানের মুখে পড়ছেন বৈধ ব্যবসায়ীরা। সরকারও হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

অনলাইনে বিক্রি হওয়া এসব যাচাইবিহীন পণ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) কর্মকর্তারা জানান, অনুমোদনহীন কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার পণ্যে পারদ, সিসা এবং বিভিন্ন নিষিদ্ধ রাসায়নিকের ব্যবহার খুবই সাধারণ ব্যাপার। এসব পণ্য ব্যবহারের কারণে ভোক্তারা সাময়িক সৌন্দর্যের বদলে দীর্ঘমেয়াদী চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি স্কিন ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো শিশুখাদ্য এবং স্বাস্থ্য সাপ্লিমেন্টের বাজার। লাইসেন্সবিহীন এবং অনেক সময় মেয়াদোত্তীর্ণ এসব খাদ্য শিশুদের লিভার ও কিডনির স্থায়ী ক্ষতি করছে, যা তাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে একটু নজর দিলেই দেখা যায়, নামিদামি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের লোগো এবং প্যাকেজিং হুবহু নকল করে অত্যন্ত কম মূল্যে পণ্য বিক্রির চটকদার অফার দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে স্কিন কেয়ার, কসমেটিকস, জামাকাপড় এবং বিভিন্ন ওষুধের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। বিএসটিআইয়ের কোনো রকম অনুমোদন বা মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই এসব পণ্যে ‘আমদানীকৃত’ বা ‘১০০ শতাংশ অরিজিনাল’ ট্যাগ লাগিয়ে অবাধে বিক্রি করা হচ্ছে। ভোক্তারা ফেসবুকের রিলস বা আকর্ষণীয় ভিডিও বিজ্ঞাপন দেখে আকৃষ্ট হয়ে অর্ডার করেন এবং পণ্য হাতে পাওয়ার পর বুঝতে পারেন যে তারা প্রতারিত হয়েছেন।

বাংলাদেশের ফেসবুক কমিউনিটিতে ‘ফ্রড অ্যালার্ট বিডি’ নামে একটি পাবলিক গ্রুপ রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ প্রতারক অনলাইন ব্যবসায়ীদের নিয়ে পোস্ট করে অন্যদের সতর্ক করেন। এই গ্রুপে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫টি নতুন প্রতারণার অভিযোগ আসে। অভিযোগগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ কসমেটিকস পণ্যের বিরুদ্ধে। এরপরই রয়েছে খাদ্যপণ্য, জামাকাপড়, ইলেকট্রনিক গ্যাজেট এবং জুতা নিয়ে প্রতারণা। ভুক্তভোগীরা জানান, এই প্রতারক চক্র পেইড প্রমোশন বা ফেক আইডি ব্যবহার করে নিজেদের পেজে পণ্যের পক্ষে শত শত মিথ্যা ও ইতিবাচক রিভিউ তৈরি করে। কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করে আসল ব্র্যান্ডের হুবহু নকল প্যাকেজিং তৈরি করার কারণে সাধারণ ক্রেতারা পণ্যটি আসল না নকল তা সহজে ধরতে পারেন না। এছাড়া, অধিকাংশ ফেসবুক পেজের কোনো স্থায়ী অফিস বা ট্রেড লাইসেন্স থাকে না। পণ্য বিক্রির পর কোনো সমস্যা হলে বা ক্রেতা অভিযোগ করলে তাকে অনতিবিলম্বে ব্লক করে দেওয়া হয়।

অনলাইনে লাইসেন্সহীন ও কর ফাঁকি দেওয়া পণ্যের এই জোয়ারের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের বৈধ ব্যবসায়ী এবং অনুমোদিত আমদানিকারকরা। একজন অনুমোদিত কসমেটিকস ব্যবসায়ী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, তারা সরকারের সব নিয়ম-কানুন মেনে, সঠিক ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে এবং বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিয়ে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের পরিচালনা খরচ এবং পণ্যের দাম বেশি পড়ে। অন্যদিকে, যারা অবৈধ উপায়ে বা লাগেজের মাধ্যমে পণ্য এনে অনলাইনে বিক্রি করে, তারা কোনো কর দেয় না এবং তাদের পণ্য অধিকাংশ সময়ই নকল বা মানহীন হয়। যার কারণে তারা বৈধ ব্যবসায়ীদের তুলনায় প্রায় অর্ধেক দামে পণ্য বিক্রি করতে পারে। কম দাম দেখে অনেক ক্রেতা এদের ফাঁদে পড়েন, যার ফলে বৈধ ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন এবং সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। আরেকজন অনলাইন জার্সি ব্যবসায়ী বলেন, সারা বিশ্ব এখন ই-কমার্সের দিকে ঝুঁকছে, কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এই খাতের ব্যবসায়ীদের মানুষ পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না এই অসাধু চক্রের কারণে। সরকার যদি এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, তবেই মানুষের বিশ্বাস ফিরবে এবং এই খাতে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে।

বিএসটিআই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা নিয়মিত এসব প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে। যেসব অনলাইন পেজের কোনো স্থায়ী ঠিকানা বা ট্রেড লাইসেন্স নেই, তাদের ধরতে বিএসটিআইয়ের একটি বিশেষ টিম গোপনে কাজ করে। এই টিমের সদস্যরা কখনো সাধারণ গ্রাহক সেজে পণ্য কেনেন এবং তারপর অভিযুক্তকে শনাক্ত করেন। এছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)-ও তাদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করে। ঠিকানাবিহীন পেজের মালিকদের খুঁজে বের করতে কখনো কখনো এক মাসেরও বেশি সময় লেগে যায়। তবে অভিযোগ এলে বা নজরে পড়লে তারা যথাসম্ভব দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেন। কর্তৃপক্ষ ভোক্তাদের প্রতি পরামর্শ দিয়ে বলেন, অনলাইনে কেনাকাটার সময় শুধুমাত্র কম দাম না দেখে বিক্রেতার ট্রেড লাইসেন্স আছে কি না, পণ্যে বিএসটিআইয়ের কিউআর কোড বা সিল আছে কি না তা যাচাই করে নিলে প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। শুধু অভিযান চালিয়ে এই প্রতারণা পুরোপুরি থামানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর কঠোর জবাবদিহি এবং ভোক্তাদের সচেতনতা।

তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ


এ জাতীয় আরো খবর...