দেশের ব্যাংকিং খাতে বিরাজমান দীর্ঘমেয়াদি বিশৃঙ্খলা এবং গ্রাহকদের আস্থার সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ এখন তাদের কষ্টার্জিত অর্থের সুরক্ষায় বিকল্প ও নিরাপদ মাধ্যমের সন্ধান করছেন। ঠিক এই চরম অস্থিরতার মাঝেই দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ চিত্রে এক বড় ধরনের ওলট–পালট ঘটে গেছে। টানা তিন মাস ধরে নেতিবাচক ধারায় থাকার পর, হঠাৎ করেই সরকারের জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে এক অভাবনীয় ও রেকর্ড পরিমাণ সাফল্য দেখা গেছে। সরকারি সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, কেবল একটি একক মাসেই দেশের সাধারণ মানুষ প্রায় ২২ হাজার ২৬০ কোটি ৫৭ লাখ টাকার নিট বা প্রকৃত সঞ্চয়পত্র ক্রয় করেছেন, যা চলতি পুরো অর্থবছরের মধ্যে যেকোনো একক মাসের তুলনায় সর্বোচ্চ। গত কয়েক বছর ধরে যেখানে সরকারের নানা কড়াকড়ির কারণে মানুষ সঞ্চয়পত্র কেনা একপ্রকার কমিয়ে দিচ্ছিল, সেখানে হঠাৎ করে বিনিয়োগের এই বিশাল জোয়ার দেশের অর্থনীতিবিদদের বেশ চমকে দিয়েছে।
বিনিয়োগের এই আকস্মিক পরিবর্তনের গভীরতা বুঝতে হলে দেশের বিগত কয়েক মাসের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের দিকে একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাস অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র খাতের চিত্র ছিল পুরোপুরি হতাশাজনক এবং ভয়াহব। সেই সময়ে সাধারণ মানুষ এই খাতে নতুন কোনো বিনিয়োগ তো করেইনি, উল্টো তাদের আগের কেনা পুরনো সঞ্চয়পত্র মেয়াদ ফুরানোর আগেই ভেঙে ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তুলে নিয়েছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ঋণাত্মক ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা, ফেব্রুয়ারি মাসে তা দাঁড়ায় ঋণাত্মক ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা এবং মার্চ মাসে আরও কমে গিয়ে দাঁড়ায় ঋণাত্মক ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। এর সহজ অর্থ হলো, এই টানা তিন মাসে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নতুন কোনো টাকা আসেনি, বরং উল্টো সরকারকে তার নিজের পকেট থেকে আগের গ্রাহকদের মেয়াদোত্তীর্ণ সঞ্চয়পত্রের সুদ ও আসল বাবদ মোট ৫ হাজার ১৫১ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সরকারকে তখন এই বিপুল পরিমাণ টাকা শোধ করতে হয়েছিল। তবে সব হিসাব–নিকাশ পাল্টে যায় পরবর্তী মাসে এসে, যেখানে পরিশোধের খরচের চেয়ে নতুন মানুষের বিনিয়োগের পরিমাণ এক ধাক্কায় রেকর্ড পরিমাণ ছাড়িয়ে যায়।
হঠাৎ করে সরকারি সঞ্চয়পত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের এই ভালোবাসার পেছনের আসল কারণ ব্যাখ্যা করেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ডক্টর জাহিদ হোসেন। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চরম অব্যবস্থাপনা ও তারল্য সংকটের কারণেই মানুষ ব্যাংকে টাকা রেখে আর আগের মতো মানসিক স্বস্তি বা নিরাপত্তা পাচ্ছে না। সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হিসাব অত্যন্ত সরল ও স্পষ্ট। দেশের বাজারে বর্তমানে প্রায় সাড়ে নয় শতাংশের কাছাকাছি উচ্চ মূল্যস্ফীতি বা ইনফ্লেশন বিরাজ করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশচুম্বী দামের কারণে প্রতি মাসের সংসার খরচ মেটানোর পর মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের কাছে যে সামান্য পরিমাণ উদ্বৃত্ত টাকা অবশিষ্ট থাকছে, তা তারা এমন কোথাও জমা রাখতে চান যেখানে কোনো ধরনের আর্থিক ঝুঁকি থাকবে না, টাকা মার যাওয়ার ভয় থাকবে না এবং মাস শেষে একটি ভালো অংকের নিশ্চিত মুনাফা পাওয়া যাবে। সঞ্চয়পত্রে বর্তমানে বিনিয়োগের বিপরীতে প্রায় ১১ দশমিক ৭৭ থেকে ১১ দশমিক শতাংশ পর্যন্ত সর্বোচ্চ মুনাফা বা সুদ দেওয়া হচ্ছে, যা যেকোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের দেওয়া সুদের তুলনায় অনেক বেশি লাভজনক এবং শতভাগ রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিযুক্ত হওয়ায় সম্পূর্ণ নিরাপদ।
অবশ্য সরকার কিন্তু এই খাত থেকে বিশাল অংকের ঋণ নেওয়ার একটি বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে প্রথমে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ করার লক্ষ্য ধরা হলেও, পরবর্তীতে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে সংশোধিত বাজেটে তা কিছুটা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। কারণ সামগ্রিকভাবে বছরের ১০ মাসের পুঞ্জীভূত হিসাব করলে দেখা যায়, সরকার এখনো প্রবাসীদের বা দেশীয় সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে নতুন কোনো নিট টাকা পাওয়ার চেয়ে উল্টো ৪২৯ কোটি টাকা বেশি শোধ করেছে। তবে দেশের বর্তমান টালমাটাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যাংকগুলোর ভঙ্গুর দশা এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কথা বিবেচনা করে মধ্যবিত্তদের জন্য সরকার একটি বড় স্বস্তির খবর দিয়েছে। জুলাই থেকে শুরু করে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত পরবর্তী ছয় মাসের জন্য সঞ্চয়পত্রের বিদ্যমান সুদের হার কোনো রকম পরিবর্তন না করে অপরিবর্তিত রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।
তবে এই বিনিয়োগ বৃদ্ধির পেছনে একটি অত্যন্ত বাস্তব ও নিষ্ঠুর সামাজিক চিত্রও লুকিয়ে রয়েছে, যা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে পয়েন্ট–টু–পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই কষাঘাতের কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত audi বা ক্রয়ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে এবং সিংহভাগ পরিবারকে কেবল খেয়েপড়ে সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। যেখানে মানুষের স্বাভাবিক সঞ্চয় করার ক্ষমতাই দিন দিন লোপ পাচ্ছে, সেখানে হঠাৎ করে একটি একক মাসে বিনিয়োগের এই আকস্মিক লাফ এটাই প্রমাণ করে যে, মধ্যবিত্তরা এখন আর কোনো ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা বা শেয়ার বাজারের মতো ফাটকা ব্যবসায় নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করতে রাজি নন। তারা তাদের জীবনের শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে এখন প্রাইভেট ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সরাসরি সরকারি এই তহবিলে এনে গচ্ছিত রাখছেন।
এছাড়া অর্থনীতিবিদরা সঞ্চয়পত্রের এই সাম্প্রতিক উত্থানের পেছনে আরেকটি সূক্ষ্ম ও কৌশলগত দিক লক্ষ্য করছেন। গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে নানা কঠোর নিয়ম চালু করা হয়েছে, যার মধ্যে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা টিন (TIN) সার্টিফিকেটের বাধ্যবাধকতা এবং একক নামে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা কমিয়ে আনা অন্যতম। এই কড়াকড়ির কারণে বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হচ্ছিলেন। ঠিক এই সময়ে সরকারের ট্রেজারি বিল এবং বন্ডের সুদের হার ও অন্যান্য সুবিধা দুটোই বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ফলে দেশের অনেক বড় এবং অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী এখন সঞ্চয়পত্র ছেড়ে সরাসরি ট্রেজারি বন্ডের দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে যারা মূলত টাকা রাখছেন, তাদের একটি বিশাল অংশই হলো খাঁটি মধ্যবিত্ত বা অবসরপ্রাপ্ত পরিবার, যারা কোনো ধরনের জটিল আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে না গিয়ে প্রতি মাসে সরাসরি একটি নিশ্চিত ও নির্দিষ্ট মুনাফা চান। যদিও ধনী ও কর্পোরেট গ্রুপগুলো এখন ট্রেজারি বিল বা বন্ডের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তবুও সাধারণ মধ্যবিত্তের প্রথম ও প্রধান পছন্দ হিসেবে এখনো সঞ্চয়পত্রই তার শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেশের ব্যাংকিং খাতের এই অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও তারল্য সংকট যতদিন পর্যন্ত পুরোপুরি দূর না হবে, নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে সঞ্চয়পত্রের এই আকাশচুম্বী চাহিদা ভবিষ্যতেও ততটাই ঊর্ধ্বমুখী থাকবে।
তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪