দীর্ঘ ২০ বছরের স্থবিরতা ভেঙে অবশেষে সম্পূর্ণ নতুন ও আধুনিক যুগোপযোগী ‘ভিসা নীতি ২০২৬’ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০০৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে দেশের ভিসা নীতিমালা তৈরি করা হয়েছিল। বিগত দুই দশকে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এলেও বাংলাদেশের এই নীতিটি ছিল অপরিবর্তিত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন দূরদর্শী দিকনির্দেশনায় এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি হাই-প্রোফাইল মন্ত্রিসভা কমিটি এই আধুনিক ভিসা নীতির খসড়া প্রস্তুত করেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির দাবার বোর্ডে ভিসা নীতিকে কেবল একটি প্রশাসনিক নিয়ম হিসেবে নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং উন্নত বিশ্বের সাথে দর কষাকষির একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে দেখছে বর্তমান সরকার।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গ্লোবাল ইকোনমিতে একটি দেশের ভিসা নীতি মূলত ফিল্টার এবং অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। বিগত এক দশকে ভিয়েতনাম, ভারত কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো তাদের ভিসা নীতিতে আমূল সংস্কার এনেই বিপুল পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। দুবাই যেখানে মেধা ও পুঁজি ধরে রাখতে ‘গোল্ডেন ভিসা’ চালু করেছে, সেখানে বাংলাদেশে পুরনো নিয়মের কারণে একজন বিদেশী বিনিয়োগকারীকে মাসের পর মাস আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় জুতো ক্ষয় করতে হতো। ২০২৬ সালের এই হাইপার-ফাস্ট যুগে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডিজিটাল স্টার্টআপের ওপর ভিত্তি করে কোটি কোটি ডলারের বৈশ্বিক বিনিয়োগ আবর্তিত হচ্ছে, সেখানে পুরনো কচ্ছপ গতির নীতি আঁকড়ে থাকা অর্থনৈতিক আত্মহত্যার শামিল। বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত রপ্তানি ও কোটা সুবিধা সংকুচিত হয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতিতে কেবল তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভর না করে অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে নতুন এই ভিসা নীতি অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
নতুন এই খসড়া নীতিমালার সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক হলো ‘রেসিপ্রোসিটি’ বা পারস্পরিক কূটনৈতিক নীতি। এর সোজা অর্থ হলো—‘যেমন কুকুর তেমন মুগুর’। বিগত কয়েক দশকে দেখা গেছে, বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী, সফটওয়্যার ডেভেলপার বা সাধারণ পর্যটকেরা যখন উন্নত দেশগুলোর ভিসার আবেদন করতেন, তখন তাদের চরম হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হতে হতো। অথচ সেইসব দেশের নাগরিকেরা বাংলাদেশে এলে অনায়াসেই ‘অন অ্যারাইভাল’ ভিসা পেয়ে যেতেন। নতুন নীতিতে এই একপেশে ব্যবস্থার ওপর বড় আঘাত হানা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কমিটি স্পষ্ট করেছে, যে দেশ বাংলাদেশের পাসপোর্টকে সম্মান দেবে, বাংলাদেশও তাদের জন্য লাল গালিচা বিছাবে। আর যারা বাংলাদেশীদের ঝুলিয়ে রাখবে, তাদের নাগরিকদেরও বাংলাদেশের সিকিউরিটি টেবিলের কঠোর জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে। এটি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসী ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির এক নতুন বহিঃপ্রকাশ।
পাশাপাশি, দেশের পর্যটন খাতকে চাঙ্গা করে ডলার সংকট সমাধানের জন্য এই নীতিতে ‘ই-ভিসা’ এবং সম্পূর্ণ পেপারলেস ডিজিটাল ইমিগ্রেশন সিস্টেম চালু করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। থাইল্যান্ড বা মালদ্বীপের মতো দেশগুলো যেভাবে সহজ ভিসা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিলিয়ন ডলার আয় করছে, বাংলাদেশও তার প্রকৃতি ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে কাজে লাগিয়ে বৈধ পথে সরাসরি ক্যাশ ডলারের প্রবাহ বাড়াতে চায়, যা হুন্ডির ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমিয়ে আনবে। এছাড়া, হাইটেক পার্ক বা সিলিকন ভ্যালির মতো বড় বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কাজের সুযোগ দিতে তিন মাসের পুরনো ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কোনো মেগা প্রজেক্ট থমকে না যায়।
তবে এই নতুন নীতি বাস্তবায়ন করা রূপকথার মতো সহজ নয়, এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু বাস্তবমুখী বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো দেশের বিমানবন্দরগুলোর ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের সনাতনী আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো। ডিজিটাল সিস্টেম চালুর পরেও যদি বিদেশী অতিথিদের ফাইলের চাকা ঘোরাতে টেবিল টু টেবিল দৌড়াতে হয়, তবে এই নীতি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। দ্বিতীয়ত, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর (এনএসআই-ডিজিএফআই) মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করা জরুরি। সর্বোপরি, বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’ গাইডলাইন অনুযায়ী, শুধু ভিসা সহজ করলেই বিনিয়োগ আসবে না; যদি দেশের ভেতর ২৪ ঘণ্টা নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ না থাকে, কর ব্যবস্থা ঘন ঘন পরিবর্তিত হয় এবং আমলাদের ঘুষের সংস্কৃতি বন্ধ না হয়, তবে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সার্বভৌমত্ব ও আত্মসম্মান বজায় রেখে বিশ্ব অর্থনীতিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রধানমন্ত্রীর এই মহাপরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা এখন নির্ভর করছে সরকারি কর্মচারীদের দক্ষতা ও বাস্তবায়নের ওপর।
তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪