এক ভদ্রলোক আমাকে গল্পটি করেছিলেন। খুব সজ্জ্বন মানুষ। ব্যাংকার ছিলেন। ডিজিএম হিসেবে রিটায়ার করেছিলেন। অভিজ্ঞতাটি তাঁর নিজের। তাই তাঁর মুখেই শুনুন…
‘আমার বাবা ছিলেন পাকিস্তান আমলে খুবই উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। বিশাল জায়গা নিয়ে একটি দোতলা বাড়িতে আমরা থাকতাম। মূল বাড়ির বাইরে ছিল স্টাফ কোয়ার্টার। সেখানে কয়েকটি ছোটো টিনশেডের বাড়ির বাবার আর্দালি, ড্রাইভার,মালি, ধোপা এবং দারোয়ান তাঁদের পরিবার নিয়ে থাকতেন।
বাড়ির সামনে বেশ বড় মাঠের মতো ছিল। আমি সেখানে বন্ধুবান্ধব নিয়ে খেলতাম। মজার ব্যাপার হলো, আমার খেলার সঙ্গী ছিল স্টাফ কোয়ার্টারের বাসিন্দা কর্মচারীদের ছেলেরা। এসব ব্যাপারে বাবার বন্ধুদের নাক উঁচু হলেও তিনি ছিলেন খুব উদার। ওদের সাথে আমাকে খেলতে দিতে তাঁর মোটেও আপত্তি ছিল না।
এরমধ্যে আর্দালি চাচার ছেলে শরিফ ছিল আমার সমবয়সী। ক্লাস ওয়ান থেকে আমরা একসাথে পড়েছি। যদিও ওর স্কুল ছিল ভিন্ন। তবে শরিফ ছিল খুবই মেধাবি। তার রেজাল্ট সবসময় খুব ভালো হতো। এ কারণে বাবা তাকে আলাদাভাবে আদর করতেন। আমাদের বিশাল কম্পাউন্ডে গরু পালা হতো। বাবার নির্দেশ ছিল প্রতিদিন যাতে কিছু দুধ শরিফের জন্য পাঠানো হয়। এছাড়া, নতুন ক্লাসে উঠলে তিনি ওর বইপত্র কিনে দিতেন। তার প্রায় সব পোশাকও বাবাই কিনে দিতেন। স্কুল ছাড়িয়ে কলেজ-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে যাতে তার পড়াশোনায় সমস্যা না হয় সে জন্য টাকা-পয়সাও দিতেন।
শরিফও বাবাকে খুব শ্রদ্ধা করত।
ঘটনাক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে ১৯৬৫ সালে আমরা দুজন একই ব্যাংকে যোগদান করলাম। নিয়োগ পরীক্ষায় ভালো করার কারণে ও যোগ দিলো অফিসার গ্রেড-০১ হিসেবে, আমি গ্রেড-০২ হিসেবে। স্বাভাবিকভাবেই গ্রেড-০১দের ক্যারিয়ার প্রসপেক্ট অনেক বেশি ছিল। তারাই ছিল ব্যাংকের ম্যানেজমেন্ট ক্যাডার।
যাই হোক! আমাদের গভীর বন্ধুত্ব অটুট রইল। এরমধ্যে আমাদের দুজনের বাবাই রিটায়ার করেছেন। কয়েক বছর পর তাঁরা চিরবিদায় নিলেন। কিন্তু আমাদের দুই বন্ধুর বন্ধনে কোনো ছেদ পড়ল না।
চাকরিজীবনে শরিফ খুব ভালো করল। একটার পর একটা প্রমোশন পেতে লাগল। আমার প্রমোশন হলো ধীর গতিতে।
১৯৯২ সালে শরিফ ব্যাংকের এমডি হলো। আমি তখনো ডিজিএম।
কিছুদিন পর আমার জিএম পদে প্রমোশন ডিউ হলো। ব্যাংকে অটোম্যাটিক জিএম হিসেবে প্রমোশন হতো না। যোগ্য কয়েকজনের ইন্টারভিউ নেওয়া হতো। তারপর বাছাই করে প্রমোশন দেওয়া হতো। তখন এ ইন্টারভিউ বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকতেন এমডি।
আমার প্রমোশন হওয়াটা ছিল প্রায় অবধারিত। কারণ আমার পারফরম্যান্স ছিল খুব ভালো। তাছাড়া আমি ছিলাম তালিকায় সবচেয়ে সিনিয়র। সবচেয়ে বড় কথা, আমার বাল্যবন্ধু শরিফ ইন্টারভিউ বোর্ডের চেয়ারম্যান- ব্যাংকের এমডি। অতএব আমার প্রমোশন আটকায় কে?
মাথায় বাজ পড়ল প্রমোশনের ঘোষণা আসার পর। তাতে আমার নাম নেই! শুধু আমি না, সবাই হতভম্ব! কিন্তু কেউ আমাকে বাদ দেওয়ার কারণ জানে না।
আমি রাতে পদোন্নতি না হওয়ার কারণ জানার জন্য শরিফের বাসায় গেলাম।
সে আমার সামনে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তারপর মৃদু কণ্ঠে বলল- ‘আমি যতদিন এমডি আছি, তোর প্রমোশন হবে না, আশরাফ।‘
আমি স্তম্ভিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম- ‘কেন?’
শরিফ আবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর যেন অন্য জগত থেকে তার কণ্ঠ ভেসে এলো- ‘তোর বাবাকে আমি খুব শ্রদ্ধা করি। একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারীর ছেলের প্রতি তিনি যে স্নেহ দেখিয়েছিলেন তা ভোলার নয়। কিন্তু আমি আরো একটি ব্যাপার ভুলতে পারি না। সেটি হচ্ছে, আমার বাবা তোর বাবার জন্য চা নিয়ে যাচ্ছেন, তাঁর ব্যাগ বইছেন, তিনি ডাকবেন বলে একটি টুলে বসে অপেক্ষা করছেন, তাঁর ভয়ে তটস্থ থাকছেন। এগুলো যখন দেখতাম তখন আমার বুক ভেঙে যেতো। আমার খুব অপমান লাগত। নিজেকে খুব বঞ্চিত মনে হতো। এভাবে কখন যেন তোর প্রতি আমার প্রচণ্ড ঘৃণা জন্ম নিলো। তোকে প্রমোশন না দিয়ে আমি সে অপমানের প্রতিশোধ নিলাম। একদিন আমি বঞ্চিত ছিলাম, আজ তোকে বঞ্চিত করলাম।‘
এরপর আমি আর শরিফের সাথে কথা বলিনি।
বছর দুয়েক পর আমরা দুজনেই রিটায়ার করলাম।
শরিফের ছোটোভাই ব্যাবসায় খুব ভালো করেছিল। সে ছিল কয়েকটি গার্মেন্টের মালিক। শরিফ তার ভাইয়ের কোম্পানিতে চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিলো। আর আমার বড় ছেলে ছোটো একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি দিলো। কিন্তু সরাসরি রপ্তানির ক্ষমতা তার ছিল না। সে দেশের বড় গার্মেন্টস কোম্পানি থেকে সাব-কন্ট্রাক্ট নিয়ে কাজ করত। কিন্তু তেমন কাজ পেতো না। তাই ব্যাবসা দিন দিন খারাপ হতে লাগল। হঠাৎ শরিফ একদিন তাকে ডেকে পাঠাল। তারপর তাদের কোম্পানির কিছু সাব- কন্ট্রাক্টের কাজ দিয়ে বলল- ‘তোমার এদিক- ওদিক ঘোরার দরকার নেই। আমাদের কোম্পানির কাজ করেই কুলাতে পারবে না। তারপর একসময় নিজেই যাতে এক্সপোর্ট করতে পারো সেটা আমি দেখব। ডোন্ট ওরি ইয়াং ম্যান, আই শ্যাল মেইক ইউ রিচ।’
ব্যাপারটি শুনে আমি খুবই বিস্মিত হলাম এবং অনেকদিন পর নিস্তব্ধতা ভেঙে শরিফকে ফোন করলাম।
ফোন তুলেই সে বলল-‘ ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই, আশরাফ। অ্যান্ড মাইন্ড ইট, আই ডু নট রিপেন্ট ফর হোয়াট আই ডিড টু ইউ। তোকে বঞ্চিত করার জন্য আমি অনুতপ্ত নই।’
তারপর ফোন কেটে দেওয়া হলো।
শরিফ সাহেবের দুই ধরণের আচরণের ব্যাখ্যা কী?
একই মানুষ কি একই সঙ্গে এত নিষ্ঠুর এবং এত কোমল হতে পারে?
তিনি কি একই সঙ্গে ডক্টর জেকিল এবং মিস্টার হাইড ছিলেন?
আমি এর ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি।
এ জাতীয় আরো খবর...