দেশের শেয়ারবাজারের ভালোমন্দ না বুঝে, কোনো প্রকার গভীর চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই অন্যের নির্দেশ বা গুজবে কান দিয়ে বিনিয়োগ করার এক আত্মঘাতী রীতি বহু পুরোনো। পুঁজিবাজারে টেকসই ও নিরাপদ বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে বাজার বিশ্লেষকরা সবসময় বুঝে-শুনে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারে বিনিয়োগের পরামর্শ দিলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ বাজারে বিনিয়োগকারীদের ভালো শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি অনীহা দেখা যায়। ভালো শেয়ারে দ্রুত বড় মুনাফা বা ‘ক্যাপিটাল গেইন’ পাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকলেও এতে বড় ধরনের লোকসানের ঝুঁকি থাকে না। বিপরীতে, উৎপাদন বন্ধ থাকা ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ দুর্বল শেয়ারে উচ্চ ঝুঁকির পাশাপাশি রাতারাতি বড় ধরনের মুনাফা পাওয়ার প্রলোভন থাকে অনেক বেশি। না বুঝে উচ্চ ঝুঁকির মুখে বড় মুনাফা লুফে নেওয়ার এই অবুঝ প্রবণতাকেই কাজে লাগাচ্ছে বাজারে সক্রিয় এক শ্রেণীর অসাধু কারসাজি চক্র। তারা গুজব ছড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাচ্ছে, আর ঝুঁকির মুখে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সাধারণ আমানতকারীরা।
পুঁজিবাজারে গুজব ও কারসাজি চক্রের এই তৎপরতা দীর্ঘদিনের পুরনো ব্যাধি। অসাধু চক্রের ফাঁদে পড়ে ভালো শেয়ারের পরিবর্তে দুর্বল শেয়ারের দিকেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে, যার ফলে মৌলভিত্তিসম্পন্ন ভালো কোম্পানির শেয়ারগুলো দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা হয়ে রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কারসাজি বন্ধে সময়ে সময়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও তার সুফল মিলছে সামান্যই। সংস্থাটি অসাধু চক্রকে শনাক্ত করতে যে দীর্ঘ সময় নেয়, ততক্ষণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের পাতা ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়ে যান। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত সংসদ নির্বাচনের পর বাজারে এমন একটি চক্র নতুন করে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিগত সরকারের আমলের মতোই এই চক্রটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লক্ষ্য করে উৎপাদন বন্ধ থাকা ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে প্রলুব্ধ করছে। তাদের লোভনীয় প্রস্তাবে প্রলুব্ধ হয়ে বন্ধ ও অচল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে আবারো ফেঁসে যাচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কৃত্রিমভাবে গুজব ছড়িয়ে যে চড়া দামে শেয়ারগুলো সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, তাতে বিনিয়োগের মূল অর্থ হারানোর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
শেয়ারবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন এই সংকটের বহুমাত্রিক কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, প্রথমত বাজারে ভালোমানের শেয়ারের চরম সংকট রয়েছে। দীর্ঘ বছর ধরে বহুজাতিক ও বড় দেশীয় কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা করা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয়ত, বাজারে যে কয়েকটি ভালো শেয়ার রয়েছে, সেগুলোও এখন অতিমূল্যায়িত হয়ে আছে, যেখান থেকে দ্রুত ভালো রিটার্ন পাওয়ার সুযোগ কম। ভালো শেয়ারের এই অভাবের সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র তাদের ফাঁদ পাতছে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ শিক্ষার অভাবে না বুঝে দুর্বল শেয়ারে অর্থ খাটিয়ে নিজেদের চরম ঝুঁকিতে ফেলছেন। সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বাজারে ৬২টি উৎপাদন বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এই তালিকার অন্তত ৪১টি কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক ও অলৌকিকভাবে বেড়েছে। আলোচিত সময়ে এসব বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির শেয়ারের দামে হঠাৎ বড় উত্থানের পর আবার দ্রুত পতনও হয়েছে, যার ফলে অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে এই দরবৃদ্ধির ভয়াবহ রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত তিন মাসে অল্প দিনের ব্যবধানে বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কোনো কোনো শেয়ারের দাম ১৮৫ শতাংশ থেকে ২৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি রুখতে ডিএসই বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কবার্তা প্রকাশের পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে ‘রিয়েল-টাইম অ্যাকশন’ হিসেবে লেনদেন স্থগিতের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেও কারসাজি থামানো যায়নি। শেষ পর্যন্ত এই দুর্বল কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামের দৈনিক ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে সার্কিট ব্রেকারের সীমা কমানোর দাবি জানায় ডিএসই। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি দুই শেয়ারবাজার ডিএসই ও সিএসইকে সার্কিট ব্রেকারের সীমা নির্ধারণের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে, যার আওতায় দুর্বল কোম্পানির ক্ষেত্রে দৈনিক সর্বোচ্চ ওঠানামার সীমা বিদ্যমান ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে অর্ধেক বা ৫ শতাংশ করা হতে পারে।
গত তিন মাসে কোন কোম্পানির শেয়ারের দাম কতটা অবাস্তবভাবে বেড়েছে, তার একটি খতিয়ান দেওয়া হলো:
মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড: এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে এই বন্ধ কোম্পানির শেয়ারের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। শুধুমাত্র ৫ এপ্রিল থেকে ৩ জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ২৬ টাকা ৩০ পয়সা থেকে লাফিয়ে ৯১ টাকা ১০ পয়সায় গিয়ে ঠেকে। মাত্র এই কদিনে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৬৪ টাকা ৮০ পয়সা বা ২৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং এরপর থেকেই এর দাম ক্রমাগত কমছে।
সোনারগাঁও টেক্সটাইলস লিমিটেড: তালিকায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরবৃদ্ধি ঘটেছে এই কোম্পানির। গত ১০ মে থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে এর শেয়ারের দাম ৩৩ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ৯৬ টাকা ৭০ পয়সা হয়, যা প্রায় ১৮৫ শতাংশ বা ৬২ টাকা ৮০ পয়সা বৃদ্ধি।
রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড: ৩০ এপ্রিল থেকে ১০ জুনের মধ্যে এর শেয়ারের দাম ৩ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ৭ টাকা ৯০ পয়সা হয়, যা প্রায় ১০৩ শতাংশ বৃদ্ধি।
বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড: ৬ এপ্রিল থেকে ১৬ জুনের মধ্যে এর শেয়ারের দাম ১৬ টাকা ৬০ পয়সা থেকে ৮৬ শতাংশ বেড়ে ৩০ টাকা ৯০ পয়সা হয় এবং পরবর্তীতে দরপতনে তা ২৫ টাকা ১০ পয়সায় নেমে আসে।
শ্যামপুর সুগার মিলস লিমিটেড: ১৯ মে থেকে ৩০ জুনের মধ্যে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ১৩৮ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ৮১ শতাংশ বেড়ে ২৫০ টাকা ৮০ পয়সায় উন্নীত হয়।
অন্যান্য কোম্পানি: দুলামিয়া কটন ও আনলিমা ইয়ার্নের শেয়ারের দাম যথাক্রমে ৮০ শতাংশ, এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের ৭৮ শতাংশ, আজিজ পাইপসের ৭৫ শতাংশ এবং ইয়াকিন পলিমারের শেয়ারের দাম ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। এছাড়া মেঘনা কনডেন্সড মিল্কের ৫৮ শতাংশ, সাফকো স্পিনিংয়ের ৫৩ শতাংশ, হামিদ ফেব্রিক্সের ৪৪ শতাংশ, ইন্দো বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালসের ৪৩ শতাংশ এবং উসমানিয়া গ্লাসের দাম ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার পর আবার কমতে শুরু করেছে। এর বাইরেও খুলনা পাওয়ার, খান ব্রাদার্স, ডরিন পাওয়ার ও সেন্ট্রাল ফার্মাসহ প্রায় ২৫টি অচল ও দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম গত তিন মাসে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থকে চরম ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে।
দুর্বল শেয়ারের এই লাগামহীন দৌড় ও অস্বাভাবিক ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে ডিএসই দীর্ঘ এক দশক পর ‘রিয়েল-টাইম অ্যাকশন’ পদ্ধতি চালু করেছে, যার মাধ্যমে কোনো শেয়ারের অস্বাভাবিক লেনদেন দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে একদিনের জন্য তার লেনদেন স্থগিত করা হচ্ছে। তবে শেয়ারবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আল-আমিন মনে করেন, সার্কিট ব্রেকার বা লেনদেন স্থগিতের মতো পদক্ষেপগুলো সাময়িক স্বস্তি দিলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। মূল সমস্যা হলো কোম্পানির দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকট এবং পরিচালনা পর্ষদের অকার্যকারিতা। শুধু শেয়ারের দামের গতি নিয়ন্ত্রণ করে একটি অচল কোম্পানিকে সচল বা সুস্থ করা সম্ভব নয়। এর জন্য কোম্পানির প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ন করে প্রয়োজনে বোর্ড পুনর্গঠন, নীতিগত সহায়তা এবং কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এই জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের প্রকৃত উপায় নিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেটের (বিআইসিএম) নির্বাহী প্রেসিডেন্ট ওয়াজিদ হাসান শাহ বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সচেতন করতে বিনিয়োগ শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের বাজারে অনেক বিনিয়োগকারীই অত্যন্ত স্বল্প সময়ে মূলধন দ্বিগুণ বা তিনগুণ করার অবাস্তব মানসিকতা রাখেন এবং লোভের বশে বারবার লোকসান করেও দুর্বল শেয়ারে ঝুঁকি নেন। মূলত একটি অসাধু চক্র বড় মুনাফা তুলে নেওয়ার পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঘাড়েই সব ঝুঁকি ও লোকসান চাপিয়ে দেয়। তাঁর মতে, যেসব কোম্পানি বছরের পর বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ করে রেখেছে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের ন্যূনতম অংশ ফেরত দেওয়ার আইনি নিশ্চয়তা দিয়ে সেগুলোকে পুরোপুরি তালিকাচ্যুত (Delist) করা উচিত। অন্যথায়, লেনদেন বন্ধ হওয়া ব্যাংকের মতো পুঁজিবাজারেও এর একটি নেতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
একই সুরে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রিয়েল-টাইম অ্যাকশন’ হিসেবে মাত্র একদিনের জন্য লেনদেন স্থগিত করা কোনো কার্যকর সমাধান হতে পারে না। যেসব কোম্পানির উৎপাদন দীর্ঘ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে, তাদের শেয়ার লেনদেন স্থায়ীভাবে স্থগিত রাখা উচিত। উৎপাদন সচল না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা দরকার, যেমনটা বিশ্বের উন্নত শেয়ারবাজারগুলোতে করা হয়ে থাকে। ডিএসই ও বিএসইসি যদি শুরুতেই কঠোর হয়ে এসব কোম্পানির লেনদেন স্থগিত করত, তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নতুন করে এই বড় ঝুঁকির মুখে পড়তেন না। বিনিয়োগকারীদের পুঁজির সুরক্ষা দেওয়া এবং বছরের পর বছর বন্ধ থাকা কোম্পানির ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট