সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০৫ পূর্বাহ্ন

হাজার কোটি টাকার বরাদ্দেও ডুবছে তিলোত্তমা ঢাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

রাজধানী ঢাকাকে জলাবদ্ধতার চিরচেনা অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে বিগত এক দশকে কমপক্ষে তিন হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে খরচ করা হয়েছে। তবে বিপুল অঙ্কের এই অর্থ ব্যয়ের পরও মেগা সিটি ঢাকার নাগরিকদের ভাগ্য বদলায়নি। সামান্য বর্ষা কিংবা মাঝারি ধরনের ভারী বৃষ্টি হলেই নগরের বিশাল অংশজুড়ে থৈথৈ পানির রাজত্ব তৈরি হয়। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি তলিয়ে গিয়ে অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হন লাখ লাখ সাধারণ মানুষ। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের হাতে প্রয়োজনীয় অর্থ, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং বিশাল জনবল থাকার পরও কেবল সমন্বয়হীন পরিকল্পনা ও বিক্ষিপ্ত কার্যক্রমের কারণে এই সংকটের স্থায়ী কোনো সমাধান মিলছে না।

প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে শহরের অভ্যন্তরীণ খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার মূল দায়িত্ব বুঝে নেয় ঢাকা উত্তর (ডিএনসিসি) ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। দায়িত্ব পাওয়ার পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত চার বছরে দুই সংস্থা মিলে নিষ্কাশন নর্দমা পরিষ্কার ও সংস্কার বাবদ অন্তত ৭৩০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে দক্ষিণের খরচ প্রায় ৩৬০ কোটি এবং উত্তরের ব্যয় প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা। বিপুল এই ব্যয়ের পরও কেন পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না—জানতে চাইলে বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা, ২৫ থেকে ৩০ বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত আউটলেটের অভাবই এর মূল কারণ। সিটি করপোরেশনের অধীনে ড্রেন আসার পর আজ পর্যন্ত কোনো আধুনিক ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান তৈরি বা হালনাগাদ করা হয়নি। সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া খণ্ডিতভাবে প্রকল্প নিলে তা কেবল সরকারি অর্থের অপচয়ই ডেকে আনে।

আর্থিক স্বচ্ছতার দিক থেকে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম নিয়ে নানামুখী প্রশ্ন রয়েছে। ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মাহাবুবুর রহমান তালুকদার জানান, কেবল রুটিন কাজ হিসেবে ড্রেন ও খাল পরিষ্কার রাখতেই প্রতি বছর তাদের ৩০ কোটি টাকা খরচ হয়। সম্প্রতি ধানমন্ডি লেক সংলগ্ন রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে আয়োজিত এক গণশুনানিতে যোগাযোগমন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলাম জানান, নিউমার্কেট, গাউছিয়া ও ধানমন্ডি এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করতে ৩handling৫০ কোটি টাকার একটি বিশেষ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ধানমন্ডি অঞ্চলের পানি বিডিআর এলাকার পাশ দিয়ে আদি বুড়িগঙ্গা নদী পর্যন্ত একটি নতুন আউটলেট দিয়ে বের করে দেওয়া হবে। অন্যদিকে, ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীরের কাছে চলতি বছরের মোট খরচের হিসাব জানতে চাওয়া হলে তিনি নির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক জানাতে পারেননি। তিনি দাবি করেন, বর্জ্য ও প্রকৌশলসহ একাধিক বিভাগ যুক্ত থাকায় সব খরচের চূড়ান্ত সমন্বয় এখনো শেষ হয়নি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বিশাল ১০৯ বর্গকিলোমিটার এলাকার পানি নিষ্কাশনের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো নির্গমন পথ বা আউটলেটের তীব্র সংকট। বর্তমানে ধোলাইখাল, কমলাপুর-টিটিপাড়া এবং পান্থপথ বক্স কালভার্ট হয়ে হাতিরঝিল—এই মাত্র তিনটি আউটলেট দিয়ে পুরো দক্ষিণের পানি বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যায় গিয়ে পড়ে। কর্মকর্তাদের মতে, এই বিশাল আয়তনের জন্য কমপক্ষে ৮ থেকে ৯টি আউটলেট প্রয়োজন। বর্তমানে নতুন আউটলেট স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ‘ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং’ (আইডব্লিউএম) কাজ করছে। এই নির্গমন পথের অভাবে সামান্য বৃষ্টিতেই শুক্রাবাদ বা ধানমন্ডি ২৭-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কোমর পানি জমে যায়। পশ্চিম রাজাবাজার ও সোবহানবাগের মতো উঁচু স্থানের পানি ঢাল বেয়ে শুক্রাবাদে এসে জমা হয় এবং ধারণক্ষমতা না থাকায় ম্যানহোল দিয়ে পানি উল্টো উপচে ওঠে। ফলে সাধারণ মানুষকে স্বাভাবিক ২০ টাকার রিকশা ভাড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকা দিয়ে গন্তব্যে যেতে হয়।

আসন্ন বর্ষা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় দুই সিটি করপোরেশনই কিছু দৃশ্যমান তৎপরতা শুরু করেছে। ডিএনসিসি তাদের ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থার (GIS) মাধ্যমে ডিজিটাল হটস্পট চিহ্নিত করে ১০টি অঞ্চলের জন্য ৩৬০ জন কর্মীর ২০টি কুইক রেসপন্স টিম গঠন করেছে। মিরপুর-১ দারুস সালাম রোড, বেগম রোকেয়া সরণির কাজীপাড়া ও উত্তরা সেক্টর-৪ সংলগ্ন নর্দমা সংস্কারের কাজ চলছে। অপরদিকে ডিএসসিসি ৩৩টি ঝুঁকিপূর্ণ হটস্পট চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে রাপা প্লাজা মোড়, গ্রিন রোড, শান্তিনগর, খিলগাঁও, পল্টন এবং পুরান ঢাকার জুরাইন ও চানমারী মোড় অন্যতম। ডিএসসিসি প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০ সদস্যের বিশেষ টিম এবং ১০টি পোর্টেবল পাম্প প্রস্তুত রেখেছে। এছাড়া শিল্পকলা একাডেমি থেকে টিটিপাড়া পর্যন্ত তিন কিলোমিটার বক্স কালভার্ট পরিষ্কারের পাশাপাশি মান্ডা, জিরানী, শ্যামপুর ও কালুনগর খালের উন্নয়ন প্রকল্পের ২০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে।

উদ্যোগ অনেক থাকলেও মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের রাতের যাতায়াত ও দৈনন্দিন জীবন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির পানিতে রাস্তা ও গর্ত একাকার হয়ে যাওয়ায় খোলা ম্যানহোলে পড়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। মেরুল বাড্ডার একটি ভাতের হোটেলের কর্মী মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম জানান, রাতে কাজ শেষে খাবার ভর্তি ডেকচি নিয়ে ফেরার সময় পানির নিচে গর্ত দেখা যায় না। একদিন গর্তে পড়ে তাঁর সব খাবার নষ্ট হয়ে গেছে। সূত্রাপুরের বাসিন্দা মুবাশশির আলম বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই বাড়ির নিচতলা ডুবে আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে যায় এবং নোংরা পানির দুর্গন্ধে ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে নোংরা ও চর্মরোগের ঝুঁকিপূর্ণ পানির মধ্য দিয়েই মানুষকে চলাচল করতে হচ্ছে।

ঢাকার এই স্থায়ী জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান ও নীরব ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে নিষিদ্ধ পলিথিন। ২০০২ সাল থেকে ২০ মাইক্রনের কম পুরুত্বের পলিথিন আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হলেও বাজারে এর অবাধ ব্যবহার চলছে। কারওয়ান বাজার ও রামচন্দ্রপুর খাল থেকে শুরু করে শহরের প্রায় প্রতিটি ড্রেনেই পলিথিনের স্তূপ জমে আছে, যা ভূগর্ভস্থ পাইপের মুখ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। যদিও ডিএনসিসি ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ২২২ কিলোমিটার স্টর্ম ওয়াটার ড্রেন পরিষ্কার করেছে এবং আধুনিক ‘জেট অ্যান্ড সাকার’ মেশিন দিয়ে বিপুল পরিমাণ পলিথিন অপসারণ করেছে, কিন্তু উৎসে এর ব্যবহার বন্ধ করা যাচ্ছে না।

গত বছর দুই সিটি মিলে ‘ব্লু-নেটওয়ার্ক’ কর্মসূচির আওতায় বাউনিয়া, কড়াইল, রূপনগর, বেগুনবাড়ি, মান্ডা ও কালুনগর—এই ৬টি গুরুত্বপূর্ণ খাল সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও সেখানে পলিথিনের প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে জলপ্রবাহ পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মাঝারি বৃষ্টিতেই মিরপুর বা যাত্রাবাড়ী পানির নিচে চলে যাওয়ার মূল কারণ হলো তদারকি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, আইন ও অভিযানের মাধ্যমে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হলেও সাধারণ মানুষের জন্য সস্তা ও সহজলভ্য কোনো বিকল্প পরিবেশবান্ধব ব্যাগ বাজারে আনা সম্ভব হয়নি। তাই জনসচেতনতা বৃদ্ধি, উৎসে প্লাস্টিক বন্ধ এবং সমন্বিত মহাপরিকল্পনা ছাড়া এই হাজার কোটি টাকার খণ্ডিত প্রকল্প দিয়ে ঢাকাকে সচল করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ


এ জাতীয় আরো খবর...