শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ০১:৫১ পূর্বাহ্ন

জামায়াত জোট ছাড়তে কওমি দলগুলোকে হেফাজতের চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের বৈঠক।

দেশের ইসলামি রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ ও বড় ধরণের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আভাস মিলছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট থেকে কওমি ঘরানার দলগুলোকে বের করে এনে একটি স্বাধীন ও বৃহত্তর ইসলামি ঐক্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ ও নজিরবিহীন বৈঠকে বসেছে অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ঐতিহাসিক বাবুনগর মাদ্রাসায় এই চাঞ্চল্যকর রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি শুরু হয়। বৈঠকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে থাকা কওমি ঘরানার ইসলামি দলসহ মাঠপর্যায়ের আরও বেশ কয়েকটি সমমনা ইসলামি রাজনৈতিক দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তাদের শীর্ষ নেতারা এই নীতি নির্ধারণী সভায় যোগ দেন।

রাজনৈতিক ও কওমি অঙ্গন সূত্রে জানা গেছে, ১১ দলীয় জোট গঠনের শুরু থেকেই হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এই মোর্চার বিরুদ্ধে অত্যন্ত শক্ত ও অনমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। কওমি ঘরানার কোনো আদর্শিক রাজনৈতিক দল যাতে কোনোভাবেই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন এই নতুন জোটে শামিল না হয়, সে বিষয়ে তিনি শুরু থেকেই ভীষণ সোচ্চার ছিলেন। বর্তমান দেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসলামি দলগুলোর মধ্যকার বিদ্যমান দূরত্ব দূর করে একটি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ সমন্বিত কর্মপন্থা ও কৌশল নির্ধারণে এই বৈঠকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে কওমি ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোকে জামায়াতের প্রভাব বলয় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে আনা এবং জোট ত্যাগে বাধ্য করাই এই বিশেষ বৈঠকের মূল এজেন্ডা হওয়ায় গোটা দেশের কওমি ও ইসলামি অঙ্গনের সজাগ নজর এখন এই ফটিকছড়ির সভার দিকে।

অত্যন্ত গোপনীয়তা ও গুরুত্বের সাথে আয়োজিত এই বিশেষ আলোচনা সভাটি মূলত হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, সংগঠনের সিনিয়র নায়েবে আমির ও দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসার সম্মানিত মহাপরিচালক আল্লামা খলিল আহমদ কাসেমী এবং মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমানের যৌথ বিশেষ আহ্বানে আহ্বান করা হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো দলগুলোর প্রতি প্রেরিত অফিসিয়াল চিঠিতে হেফাজতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন যে, বর্তমান দেশের ইমান-আকিদা সংরক্ষণ, ইসলামি মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় রোধ এবং দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সমস্ত ইসলামি শক্তির পারস্পরিক ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এই অভিন্ন জাতীয় ও ধর্মীয় লক্ষ্য অর্জনের পথ সুগম করতেই কওমি ঘরানার সমস্ত ইসলামি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে এই জরুরি মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে।

ফটিকছড়ির এই বিশেষ রাজনৈতিক সভায় সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রতিটি আমন্ত্রিত রাজনৈতিক দলকে তাদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বা আমিরসহ সর্বোচ্চ তিনজন করে শীর্ষ স্তরের প্রতিনিধি পাঠানোর জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছিল। দেশের প্রধান প্রধান কওমি দলগুলো হেফাজতের এই ডাককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাদের শীর্ষ নেতাদের সেখানে পাঠিয়েছে। সূত্র নিশ্চিত করেছে, বৈঠকে আমন্ত্রিত সাতটি মূল রাজনৈতিক দল হলো—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট এবং ঐতিহ্যবাহী নেজামে ইসলাম পার্টি। এই দলগুলোর উপস্থিতির মাধ্যমে কওমি রাজনীতির প্রায় সবকটি ধারার এক বিরল মিলনমেলা ঘটেছে বাবুনগর মাদ্রাসায়।

ঐতিহাসিক এই বৈঠকে হেফাজতের মূল সারির নেতাদের মধ্যে সশরীরে উপস্থিত আছেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, মহাসচিব মুফতি সাজিদুর রহমান, সিনিয়র নায়েবে আমির ও হাটহাজারী মাদ্রাসার মুফতি খলিদ আহমদ কাসেমী, নায়েবে আমির আল্লামা আব্দুল হামিদ (যিনি মধুপুরের পীর হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত), নায়েবে আমির মাওলানা জসিম উদ্দীন, নায়েবে আমির ও দেশের অন্যতম বৃহৎ নানুপুর মাদ্রাসার মহাপরিচালক মাওলানা সালাহউদ্দীন নানুপুরী এবং কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) প্রভাবশালী চেয়ারম্যান মাওলানা মাহফুজুল হক। শীর্ষ ধর্মীয় গুরুদের এমন সশরীরে উপস্থিতি বৈঠকের গুরুত্বকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে, আমন্ত্রিত ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর হেভিওয়েট নেতাদের মধ্যে এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জনপ্রিয় আমির মাওলানা মামুনুল হক, দলটির নায়েবে আমির মাওলানা আলী উসমান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, নেজামে ইসলাম পার্টির আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইজহার, খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী এবং নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন। জামায়াত জোটের বাইরে থাকা এবং জোটে থাকা দলগুলোর নেতাদের মুখোমুখি বসিয়ে হেফাজত নেতৃত্ব দীর্ঘক্ষণ ধরে একক ইসলামি ব্লক তৈরির যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।

রুদ্ধদ্বার এই বৈঠকের ভেতরের পরিস্থিতি ও অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মীর ইদ্রীস গণমাধ্যমকে জানান যে, অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ মিটিংটি এখনো চলমান রয়েছে। দেশের বর্তমান অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ইসলামি দলগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক দীর্ঘদিনের ভুল বোঝাবুঝি ও সমন্বয়হীনতা দূর করা এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে কওমি শক্তির একক ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল ও রূপরেখা কী হবে, তা নিয়ে সভায় অত্যন্ত বিস্তারিত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করা হচ্ছে। বৈঠক শেষ হলে গৃহিত প্রস্তাবনাসমূহ ও জামায়াত জোট ছাড়ার বিষয়ে দলগুলোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দেশবাসীকে বিস্তারিত জানিয়ে দেওয়া হবে।

তথ্যসূত্র: এশিয়া পোস্ট


এ জাতীয় আরো খবর...