শিরোনামঃ
নির্বাচনী ইশতেহার ও জুলাই সনদ একসঙ্গে বাস্তবায়ন হচ্ছে: প্রেস সচিব নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধন ভূ-রাজনীতি নয়, অর্থনীতিই বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি : তথ্যমন্ত্রী এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল ৩ বছর বাড়ানোর আহ্বান বাণিজ্যমন্ত্রীর কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে কাজ করছে সরকার : হুইপ দুলু প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে ‘নজরুল ভিলেজ’ উদ্বোধন করা হবে: ভূমিমন্ত্রী বউ নিয়ে বাজি: আর্জেন্টিনার জয়ে বিবাহিতা কবিতার যে পরিণতি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত যেতে বাধ্য হবো: নাহিদ বায়ু-শব্দদূষণ রোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর চীনের সঙ্গে জিও পলিটিক্যাল ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে: মির্জা ফখরুল
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৮ পূর্বাহ্ন

স্থানীয় নির্বাচনে নিষিদ্ধ দলের অযোগ্যতার দাবি জামায়াতের

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

দেশের আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এক বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আভাস মিলছে। সম্প্রতি দেশের একটি অন্যতম রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল প্রস্তাব জমা দিয়েছে। তাদের মূল দাবি হলো, রাষ্ট্রীয়ভাবে বা সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে এমন কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী কিংবা সক্রিয় নেতাকর্মীদের আসন্ন কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে এই বিধানটি প্রস্তাবিত নির্বাচনি আচরণ বিধিমালায় জরুরি ভিত্তিতে যুক্ত করার জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সূত্র থেকে জানা গেছে, যদি এই নতুন সুপারিশটি কমিশন কর্তৃক গৃহীত এবং আচরণ বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে আসন্ন সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবেন না। এর আগে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুরূপ একটি কঠোর বিধান কার্যকর করা হয়েছিল, যার ফলে ওই জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা অংশ নিতে পারেননি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সাধারণত নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হওয়ার আইনি কাঠামোর কারণে এই নতুন নিয়মটি আচরণ বিধিমালায় এখনই যুক্ত করা হবে কি না, সে বিষয়ে কমিশন এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।

এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের নীতি নির্ধারকেরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, দেশের প্রচলিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আওয়ামী লীগের সমস্ত রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। আর সেই আইনি বাধ্যবাধকতার কারণেই দলটির কোনো স্তরের নেতাকর্মী কোনো ধরণের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আইনি যোগ্যতা রাখেন না। তারা নির্বাচন কমিশনকে এই বিষয়ে দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাদের সুনির্দিষ্ট মতামত ও চাপ প্রয়োগ করেছেন। তাদের মতে, কমিশন যদি সময়মতো এই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে এবং মাঠপর্যায়ে কোনো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে তার সমস্ত দায়ভার সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনকেই বহন করতে হবে। আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যে দেশের স্থানীয় সরকারের কয়েকটি স্তরে নির্বাচন সম্পন্ন করার একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে বর্তমান কমিশনের। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আগামী আগস্ট মাসের শেষভাগে অথবা সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিকে এই নির্বাচনগুলোর আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানা গেছে। শুরুতে বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ এবং পৌরসভা নির্বাচনগুলো আয়োজনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তবে এই নির্বাচনগুলোর আগে কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সরাসরি কোনো সংলাপ বা গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করবে না। আর এই কারণেই সিটি, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের খসড়া আচরণ বিধিমালার ওপর লিখিত মতামত সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

নির্বাচন কমিশনের কাছে খসড়া আচরণ বিধিমালার ওপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে নানামুখী দূরদর্শী ও সংস্কারমূলক সুপারিশ জমা পড়েছে, যার সময়সীমা গত ত্রিশে জুনে শেষ হয়েছে। এর মধ্যে একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল প্রস্তাব করেছে যে, স্থানীয় সরকারের মেয়র ও চেয়ারম্যান পদের প্রার্থীদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা সমমান এবং কাউন্সিলর ও সাধারণ সদস্যদের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা মাধ্যমিক বা সমমান নির্ধারণ করে দিতে হবে। এছাড়া নির্বাচনি প্রচারণার ক্ষেত্রে দেশের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব বিস্তার ও প্রচারণা বন্ধের বিধান আরও বেশি স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে। নির্বাচনের তফসিল চলাকালীন সময়ে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা যাতে কোনোভাবেই তাদের নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় অবস্থান করতে না পারেন, সেই বিষয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব এসেছে। একই সাথে ভোটকেন্দ্রে নিয়োজিত গণমাধ্যমকর্মী ও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তা বিধানের দাবি জানানো হয়েছে। আরেকটি রাজনৈতিক দল দেশের প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সশস্ত্র সেনাবাহিনী মোতায়েন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, ঋণখেলাপি, চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও অর্থ পাচারকারীদের নির্বাচনে চিরতরে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে।

নতুন প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে নির্বাচনি প্রচারণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করার প্রস্তাবও ইসির টেবিলে জমা পড়েছে। এর পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিটি ওয়ার্ডে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নারী সদস্য নির্বাচন করা এবং প্রচলিত সংরক্ষিত নারী সদস্যপদ বাতিল করার মতো আমূল পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের কারণে যদি কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়, তবে তাকে ন্যায়বিচারের স্বার্থে আইনি আপিল করার সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্য একটি রাজনৈতিক দল আবার সরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বহাল রাখা, ভোটকেন্দ্রে সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং সামগ্রিক নির্বাচনি পরিবেশকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও যাতে কোনো ধরনের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে না পারে, সেই বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারির প্রস্তাব করেছেন এক সাবেক নির্বাচন সচিব। তিনি মাঠপর্যায়ের কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেছেন যে, বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোটারদের প্রভাবিত করতে অন্যায়ভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর সংগ্রহ করার প্রবণতা দেখা গেছে, এমনকি ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে বেহেশত বা জান্নাতের টিকিট বিক্রির মতো প্রচারণা চালানো হয়েছে, যা নতুন বিধিমালায় সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা উচিত।

নির্বাচনে প্রাক-নির্বাচনি ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রার্থিতা বাতিলের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা টিআইবি। তারা প্রার্থীর দাখিল করা হলফনামার তথ্য কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বেতারে কোনো বিশেষ প্রার্থীর পক্ষে প্রচার বন্ধের দাবি জানিয়েছে। তবে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ সিংহভাগ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সুপারিশ বা মতামত ইসিতে জমা দেয়নি। নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব জানিয়েছেন যে, প্রাপ্ত সমস্ত সুপারিশ ও প্রস্তাবগুলো বর্তমানে ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে যাচাই-বাছাই করছেন। আগামী মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে এই সমস্ত প্রস্তাবনা কমিশনের টেবিলে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হবে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের স্থানীয় নির্বাচনে অযোগ্য করার দাবির বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, এই বিষয়ে যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার কেবল নির্বাচন কমিশনের সভার ওপরই ন্যস্ত রয়েছে এবং সভার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এই বিষয়ে আগাম কিছু বলা সম্ভব নয়। সার্বিকভাবে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে এই আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগগুলো দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে এক নতুন ও গভীর সমীকরণ তৈরি করেছে।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


এ জাতীয় আরো খবর...