শিরোনামঃ
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে সংবিধানে সুযোগ আছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী মেডিকেল শিক্ষার্থীদের দেশসেবায় আত্মনিয়োগের আহ্বান ডা. জুবাইদা রহমানের সাংবাদিকতা পেশা নির্ধারণে যথাযথ কর্তৃপক্ষ থাকা জরুরি : তথ্যমন্ত্রী ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি জনভোগান্তির মূল কারণ: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না জুলাইয়ের বিচার : হামিদুর রহমান আযাদ আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে যা বললেন সালমান খান দিল্লি পুলিশকে ‘গুন্ডা’ বললেন নাসিরুদ্দিন শাহ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আটক অভিনেত্রী আয়েশা খান
শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৩ পূর্বাহ্ন

পাঁচ মাসে ছয় এমপির কর্মকাণ্ডে জামায়াতে ইসলামী ব্যাকফুটে

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের প্রথম পাঁচ মাস সময়কালে রাজনৈতিক ময়দান ছিল চরম তর্ক-বিতর্ক, নতুন প্রত্যাশা এবং নানা হিসাব-নিকাশের এক জটিল সমীকরণ। নির্বাচনে অভূতপূর্ব সফলতা অর্জন করে এককভাবে ৬৮টি এবং জোটে মোট ৭৭টি আসনে জয়লাভ করে দীর্ঘ সময় পর সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে নতুন এই ঐতিহাসিক যাত্রার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সংসদে এবং সংসদের বাইরে দলটির অন্তত ছয়জন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের বিভ্রান্তিকর মন্তব্য, দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ, স্বজনপ্রীতি এবং অনৈতিক কেলেঙ্কারির কারণে চরম ব্যাকফুটে ও বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে দলটির কেন্দ্রীয় হাইকম্যান্ড। নতুন আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল বিরোধী দলীয় ভূমিকার আশা থাকলেও, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে জনমনে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নিয়ে নানা নেতিবাচক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

দলটির তরুণ ও আলোচিত সংসদ সদস্য কুষ্টিয়া-৩ আসনের আমির হামজাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। গত মার্চ মাসে এক ধর্মীয় আলোচনায় বিএনপির এক সিনিয়র নেতাকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক মানহানির মামলা দায়ের হয়, যার প্রেক্ষিতে আদালত থেকে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি উচ্চ আদালত থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান। তবে বিতর্ক এখানেই শেষ হয়নি; মেগা বাজেট অধিবেশনের প্রাক্কালে বাজেটের আকার নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ভুল তথ্য দিয়ে হাস্যাস্পদ পরিস্থিতির জন্ম দেন তিনি। কয়েক হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দের মতো দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য কেন্দ্রীয় জামায়াত নেতৃত্বকে এতটাই বেকায়দায় ফেলে দেয় যে, পরবর্তীতে ওই সংসদ সদস্য ভুল স্বীকার করে লিখিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে নিজের অবস্থান সাফাই গাওয়ার চেষ্টা চালান।

সংসদের ভেতরে জীবনযাত্রার সুযোগ-সুবিধা চেয়ে অনভিপ্রেত দাবি তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন চাঁপাই নবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। সংসদের মতো জাতীয় নীতি নির্ধারণী মঞ্চে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকট কিংবা জনদুর্ভোগের বিষয়টি তোলার পরিবর্তে এমপিদের সরকারি আবাসনের জন্য ডাবল পর্দা, স্বয়ংক্রিয় ওয়াশিং মেশিন ও উন্নত মাইক্রোওভেনের মতো বিলাসী আসবাবপত্র বরাদ্দের জোর দাবি জানিয়ে বসেন তিনি। এক চরম অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের সময়ে বিরোধী দলীয় একজন জনপ্রতিনিধির মুখে এ জাতীয় নাগরিক সুবিধা ও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের দাবি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। রাজপথ থেকে সংসদে আসা একটি দল কীভাবে জনস্বার্থের ইস্যু বাদ দিয়ে ব্যক্তিগত উপকরণের জন্য সোচ্চার হলো, তা নিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতেও তীব্র কটাক্ষের শিকার হতে হয় বিরোধী দলকে।

সংসদের ফ্লোরে ইতিহাস ও পরিবার নিয়ে অসত্য তথ্য পরিবেশন করে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য কাণ্ডটি ঘটান নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম। বাজেট অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করে বসেন যে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার মায়ের অসামান্য সংগঠক ভূমিকা ছিল এবং তার পিতা, পিতামহ ও নিকটাত্মীয় মিলে প্রায় ৪৭ জন পরিবারের সদস্য সরাসরি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে, ওই সংসদ সদস্যের জন্ম আশির দশকে এবং তার পিতা আজও জীবিত। নিজ পরিবারের বীরত্ব গাঁথা ইতিহাস ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে এহেন অসত্য গল্প ফাঁদার কারণে সংসদে ও সংসদের বাইরে চরম ট্রল ও কটাক্ষের শিকার হন তিনি। অনভিপ্রেত এই বিভ্রান্তি এড়াতে পরবর্তীতে নিজের বক্তব্য সংশোধনের আবেদন জানিয়ে স্পিকারের কাছে চিঠি দিতে বাধ্য হন এই সংসদ সদস্য।

রাষ্ট্রীয় বরাদ্দের ক্ষেত্রে আত্মীয়করণ ও চরম অনিয়মের স্পষ্ট প্রমাণ মেলে নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমানের ক্ষেত্রে। তার নামে বরাদ্দকৃত সরকারি ঐচ্ছিক তহবিলের দুস্থ ও অসহায় সহায়তা তালিকায় দেখা যায় যে, সংসদ সদস্যের নিজস্ব কন্যার নাম দুটি পৃথক স্থানে সুনির্দিষ্ট অনুদান পাওয়ার জন্য অনুমোদিত হিসেবে যুক্ত রয়েছে। এই অনিয়মের নথি ও সরকারি চিঠি ফেসবুকে ফাঁস হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে দলটির সংসদীয় দপ্তর নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণের দোহাই দিয়ে সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারীকে অবিলম্বে বরখাস্ত করে একটি দাপ্তরিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে দায় এড়ানোর চেষ্টা চালায়। তবে রাষ্ট্রীয় ফান্ডের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির এমন প্রত্যক্ষ মহড়া জামায়াতের নৈতিক রাজনীতির মূলমন্ত্রকেই বড় ধরনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।

রাজনৈতিক কোন্দল ও পেশিশক্তির হুমকির অডিও ফাঁস নিয়েও চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া এলাকার রাজনীতিতে নিজের অভ্যন্তরীণ আধিপত্য বজায় রাখতে স্থানীয় আরেক প্রবীণ ও প্রভাবশালী সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীকে প্রকাশ্যে পায়ে গুলি করার হুমকির একটি ফাঁস হওয়া অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনা স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম আশঙ্কা তৈরি করে এবং এতে স্পষ্ট হয় যে, দলের ভেতরের শৃঙ্খলা ও আন্তঃদলীয় কোন্দল কতটা উগ্র রূপ নিয়েছে। তবে বিতর্ক ও নৈতিক স্খলনের সমস্ত সীমা অতিক্রম করেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। এক তরুণীর সাথে হোটেলে কাটানো গোপনীয় ও আপত্তিকর মুহূর্তের ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে পড়ার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জামায়াত কেন্দ্রীয় কমিটি তদন্ত করে তার ‘নৈতিক পদস্খলন ও পর্দা লঙ্ঘন’ প্রমাণিত হওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে দল থেকে বহিষ্কার বা বরখাস্ত করেছে।

পরপর ঘটে যাওয়া এই ছয়টি স্বতন্ত্র ঘটনা কেবল কতিপয় আইনপ্রণেতার ব্যক্তিগত ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, কারণ তাদের প্রতিটির সাথে জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় রাজনৈতিক কৌশল, নেতৃত্বের প্রস্তুতি এবং নৈতিক অবস্থান গভীরভাবে জড়িত। সম্প্রতি সাতক্ষীরার এমপিকে স্থায়ীভাবে দল থেকে বরখাস্তের মাধ্যমে জামায়াত কোনো অসংগতি বা নৈতিক স্খলনকে প্রশ্রয় না দেওয়ার বার্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। তবে বিরোধী দলীয় সমন্বয়করা প্রকাশ্যে দায়ীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানালেও, এই পাঁচ মাসের ধারাবাহিক বিতর্কিত ঘটনা রাজপথের বিরোধী শক্তি হিসেবে জামায়াতের দীর্ঘমেয়াদী পথচলাকে অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে। উদ্ভূত সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে দলটিকে তাদের জনপ্রতিনিধিদের আচরণে কঠোর সংযম, দায়িত্বশীলতা ও নীতিভিত্তিক সংসদীয় রাজনীতি চর্চার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে; অন্যথায় অর্জনগুলো ঢাকা পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


এ জাতীয় আরো খবর...