শিরোনামঃ
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে সংবিধানে সুযোগ আছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী মেডিকেল শিক্ষার্থীদের দেশসেবায় আত্মনিয়োগের আহ্বান ডা. জুবাইদা রহমানের সাংবাদিকতা পেশা নির্ধারণে যথাযথ কর্তৃপক্ষ থাকা জরুরি : তথ্যমন্ত্রী ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি জনভোগান্তির মূল কারণ: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না জুলাইয়ের বিচার : হামিদুর রহমান আযাদ আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে যা বললেন সালমান খান দিল্লি পুলিশকে ‘গুন্ডা’ বললেন নাসিরুদ্দিন শাহ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আটক অভিনেত্রী আয়েশা খান
শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৪ পূর্বাহ্ন

শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালে নতুন বালিশ কাণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১১ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মেগা প্রকল্প থার্ড টার্মিনাল নির্মাণকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম ও সরকারি অর্থ হরিলুটের নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আলোচিত ‘বালিশ কাণ্ডে’র মতো এবার বিমানবন্দরের শোভা বর্ধনে ৫০০ টাকার চারা গাছ লাখ টাকায় কেনা, কৃত্রিম পুকুর তৈরিতে কোটি কোটি টাকার অপচয় এবং অহেতুক ফিতা কাটার আয়োজনেই কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমান মিলেছে। মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিশেষ অডিট রিপোর্ট এবং স্টার নিউজের অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা তোয়াক্কা না করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সুবিধা দিয়েছে। কেবল তাই নয়, কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই শত শত খাতে পরিশোধ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ, যা এখন একনেক বৈঠকের মাধ্যমে পেছনের তারিখে বৈধ করে নেওয়ার এক জঘন্য তোড়জোড় শুরু হয়েছে।

অনুসন্ধানী নথিপত্র অনুযায়ী, থার্ড টার্মিনালের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য লাগানো ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া ও কাঠগোলাপের মতো অতি সাধারণ চারা গাছের একেকটির পেছনে প্রাক্কলিত দাম ধরা হয়েছে ৫ হাজার থেকে শুরু করে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। অথচ স্থানীয় নার্সারিগুলোতে এসব সাধারণ চারা গাছের বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ৫০০ টাকা মাত্র। কেবল গাছ কেনার নামেই প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়নি, বরং অত্যন্ত অদ্ভুতভাবে এই স্বল্পমূল্যের চারা গাছগুলোর পরিচর্যার অজুহাতে অতিরিক্ত আরও ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিল উত্তোলন করা হয়েছে। একইভাবে প্রকল্পের ভেতর আগে থেকেই বিদ্যমান একটি সাধারণ জলাশয়কে কেবল সামান্য সংস্কার করে নতুন ‘পুকুর’ হিসেবে সাজিয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এডিসিকে ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। স্যাটালইট প্রযুক্তি গুগল আর্থের অতীত ও বর্তমান চিত্র বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট প্রমান পাওয়া গেছে যে, ওই স্থানে দীর্ঘদিন ধরে জলাশয় বিদ্যমান ছিল, যা সম্পূর্ণ নতুনভাবে নির্মাণের ভিত্তিহীন দাবি করে সরকারি অর্থের পাহাড় চুরির সুযোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের মাটি অপসারণ ও পরিবহন খাতকে কেন্দ্র করেও ব্যাপক জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী কেটে নেওয়া মাটি সাড়ে ছয় কিলোমিটার দূরের নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ফেলা হয়েছে মাত্র দুই কিলোমিটারের ভেতরের একটি নিচু এলাকায়। কিন্তু ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধ করা হয়েছে দূরবর্তী স্থানে পরিবহন দেখানোর সাড়ে ছয় কিলোমিটারের হিসাব ধরে। কেবল এই এক খাতেই প্রায় ৮৩ কোটি টাকা খরচ দেখিয়ে সরকারের অন্তত ৫২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি সাধন করা হয়েছে। হরিলুটের এই প্রতিযোগিতা এখানেই থেমে থাকেনি; অডিট রিপোর্ট বলছে, থার্ড টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ফিতা কাটা ও আনুষঙ্গিক সাজসজ্জার নামেই উড়ানো হয়েছে ৪ কোটি টাকা, যা মূল চুক্তিতে বিন্দুমাত্র উল্লেখ ছিল না। এছাড়া ডিজেল পাম্প বসানো, পাওয়ার ইউপিএস সরবরাহ, জ্বালানি তেল কেনা এবং কাজের গতি বাড়ানোর অদ্ভুত অজুহাতে সিভিল এভিয়েশন ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ২১৭ কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতবদল করেছে।

মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের বিশেষ অডিট রিপোর্টে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র। রিপোর্ট অনুযায়ী, থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে অন্তত ৬০০টি পৃথক খাতে কর্তৃপক্ষের কোনো পূর্বানুমতি ছাড়াই ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার বিল মেটানো হয়েছে। সরকারি আর্থিক বিধিমালা অনুযায়ী যেকোনো প্রকল্পে অতিরিক্ত কাজের জন্য বা ভ্যারিয়েশন বাবদ সর্বোচ্চ এক শতাংশ খরচ করার আইনগত একতিয়ার থাকলেও, এই মেগা প্রকল্পে ক্ষমতা অপব্যবহার করে বিধি ভেঙে ২৩ শতাংশ অর্থ অতিরিক্ত দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পটিতে প্রায় ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত বিল পরিশোধ ও আর্থিক অসঙ্গতির প্রমান মিলেছে। উক্ত প্রকল্পের বড় পদে দায়িত্বে থাকা প্রকৌশল ও বুয়েট বিশেষজ্ঞরা অনিয়মের বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তারা বলছেন যে, অনুমোদনহীন বিপুল অঙ্কের এই ভ্যারিয়েশন সম্পূর্ণ বেআইনি হলেও তা তৎকালীন কর্তৃপক্ষের প্রভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল।

প্রকল্পের এই নজিরবিহীন আর্থিক জালিয়াতি ধামাচাপা দিতে এবং অনিয়মের সাথে জড়িতদের আইনি সুরক্ষা দিতে এখন অন্যরকম এক কূটকৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। সিভিল এভিয়েশনের ভেতরের যে সকল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের সরাসরি অভিযোগ রয়েছে, তাদের দিয়েই গঠিত ‘অ্যামিকেবল সেটলমেন্ট কমিটি’ বা বিরোধ নিষ্পত্তি বোর্ডের মাধ্যমে সমুদয় অনিয়মকে সামাজিকভাবে মিটিয়ে ফেলার জোর চেষ্টা চলছে। একই সাথে একনেকের বিশেষ অনুমোদন বা ‘পোস্ট-ফ্যাক্ট অ্যাপ্রুভাল’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পূর্বে বেআইনিভাবে খরচ করা টাকাগুলোকে আইনি বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ট্রান্সপারেন্সি বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ার পর পেছনের তারিখে অনুমোদন দেওয়া নিজেই আরেকটি বড় ধরনের অপরাধ ও দুর্নীতি। যদি এই পোস্ট-ফ্যাক্ট অ্যাপ্রুভাল দেওয়া হয়, তবে হাজার কোটি টাকা লোপাটকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা আত্মসাৎ করা অর্থ পুনরুদ্ধার করা আর কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।

আওয়ামী লীগ আমলের এই মেগা প্রকল্পটিতে শুরুতে প্রাক্কলন ব্যয় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও, ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে অবিশ্বাস্যভাবে ২২ হাজার কোটি টাকায় ঠেকানো হয়। তবে বর্তমান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তদের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে যারাই জড়িত থাক না কেন তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। অনিয়মকে কোনো মধ্যস্থতা বা আপসের মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রকল্পের ফাইল থমকে যাওয়া, অবাস্তব ভ্যারিয়েশন তৈরি করা এবং সরকারি তহবিল আত্মসাতের সাথে জড়িত প্রতিটি কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

তথ্যসূত্র: স্টার নিউজ


এ জাতীয় আরো খবর...