রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৮ পূর্বাহ্ন

১৮ মন্ত্রীর বিশেষ পুলিশ নিরাপত্তা বহর প্রত্যাহার

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩৩ বার
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

জাতীয় অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, দেশের সার্বিক জ্বালানি সংকটের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং বাংলাদেশ পুলিশের অভ্যন্তরীণ জনবল ও পরিবহন সংকট নিরসনে এক যুগান্তকারী ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন। স্বয়ং দেশের প্রধান নির্বাহী বা প্রধানমন্ত্রীর নিজের সুনির্দিষ্ট ও কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনী কাটছাঁট করার ধারাবাহিকতায় এবার সরকারের বড় বড় নীতি-নির্ধারক অর্থাৎ মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিশেষ ট্রাফিক ও নিরাপত্তা বহরে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলো। গৃহীত নীতি অনুযায়ী, বর্তমানে দায়িত্ব পালনরত ১৮ জন প্রভাবশালী পূর্ণ মন্ত্রীর দৈনিক চলাচলের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পুলিশের বিশেষ প্রটোকল ও প্রোটেকশন এস্কর্ট সুবিধা সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। তবে পদের সংবেদনশীলতা এবং মন্ত্রণালয়ের কাজ বিবেচনা করে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন উপদেষ্টা এবং ছয়জন প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর এই বিশেষ সড়ক নিরাপত্তা বহর সুবিধা পূর্বের ন্যায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। রাজধানী ঢাকার আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করেছে।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যগণ তাদের শপথগ্রহণের পর থেকেই রাজধানীতে যাতায়াতের সময় সার্বক্ষণিক পুলিশের স্পেশাল প্রটোকল স্কর্ট সুবিধা ব্যবহার করে আসছিলেন। সরকারের বর্তমান পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামোতে মোট ২৪ জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং আরও ২৫ জন প্রতিমন্ত্রী ও বিশেষ মর্যাদা প্রাপ্ত উপদেষ্টা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্স ও বিশেষ সূত্র মারফত জানা গেছে যে, সড়ক নিরাপত্তার প্রটোকল স্কর্ট বহর প্রত্যাহার বা বাতিল করা হলেও নিয়মানুযায়ী অন্য সকল গুরুত্বপূর্ণ ভিআইপিদের ন্যায় এই ১৮ জন মন্ত্রীর জন্য বরাদ্দকৃত ব্যক্তিগত সশস্ত্র বন্দুকধারী (গানম্যান), সরকারি বাসভবনের নিরাপত্তা প্রহরী (হাউস গার্ড) এবং রাজধানীর সীমানা ছাড়িয়ে ঢাকার বাইরে সফর করার সময়ে বিশেষ নিরাপত্তা সুবিধা বলবৎ থাকবে। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল সংক্ষেপ করার এই মূল পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্যই হলো অপ্রয়োজনীয় সরকারি খরচ সামলানো এবং মূল আইনশৃঙ্খলা কাজে প্রয়োজনীয় পুলিশ সদস্যদের ফেরত পাঠানো।

সাধারণত জাতীয় প্রটোকল নিয়মাবলি অনুযায়ী একজন পূর্ণ মন্ত্রীর চলাচলের নিরাপত্তায় নিয়োজিত বিশেষ স্কর্টে একজন সাব-ইন্সপেক্টর বা এসআইয়ের নেতৃত্বে চারজন সশস্ত্র পুলিশ কনস্টেবলের একটি ক্ষিপ্র টিম সার্বক্ষণিক কাজ করে। তাদের যাতায়াত নিশ্চিত করতে পুলিশের একটি নিজস্ব পিকআপ ভ্যান বা বিশেষ গাড়ি বরাদ্দ রাখতে হয়। এই টিম পরিচালনায় প্রতি মাসে বেতন-ভাতা, ঝুঁকিভাতা এবং গাড়ির জ্বালানি সংক্রান্ত যে বিপুল অংকের আর্থিক ব্যয় হয়, তা সরাসরি দেশের রাজস্ব খাত থেকে বহন করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি দিকনির্দেশনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে পুলিশের সদর দপ্তরকে ভিআইপি সুরক্ষায় অযৌক্তিক ব্যয় কমানোর তাগিদ দিয়ে পরিপত্র জারি করা হয়। এছাড়াও ডিএমপিতে জনবলের মারাত্মক ঘাটতি ও বহরে যানবাহনের অপ্রতুলতা এই রূপান্তরের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে। সেই নির্দেশনা ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সে পৌঁছানোর পর দ্রুত ব্যবস্থা হিসেবে গত সপ্তাহ হতেই ধাপে ধাপে ১৭ জন মন্ত্রী ও পরবর্তীতে আরও এক মন্ত্রীর বিশেষ প্রটোল কার তুলে নেওয়া হয়।

প্রশাসনের শীর্ষপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যে গুরুত্বপূর্ণ ৬ জন মন্ত্রী ও ১ জন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এখনো নিয়মিত প্রটোকল সুবিধা পাচ্ছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডা. আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। অন্যদিকে যাদের নিয়মিত সড়ক প্রটোকল প্রত্যাহার করা হয়েছে তারা হলেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, পরিবেশ মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন, ডাক ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কেবল ঢাকা মহানগরেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও নিরাপদ গমনাগমনে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রাখতে হয়। ১ হাজার ৬৯১ জনের বিশাল এক পুলিশ টিম দিনে-রাতে ৪৯ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ ভিআইপিদের নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত আছে। নিয়ম অনুযায়ী ভিআইপিদের বাসভবনে শিফট অনুযায়ী চারজন, কার্যালয়ে একজন এবং বিশেষ প্রটোল গাড়িবহরে পাঁচজন পুলিশ সদস্যানুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) থেকে পার্সোনাল গানম্যান সরবরাহ করতে হয়। ভিআইপি তালিকায় রয়েছেন দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, বিরোধীদলীয় নেতা ও সিইসি। এছাড়াও বিশেষ প্রজ্ঞাপন বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সহ নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, রাষ্ট্রপতির বাসভবন বঙ্গভবনে ১৩৫ জন, প্রধানমন্ত্রীর গুলশানের বাসভবনে ৪০ জন এবং বিরোধী দলীয় নেতার সুরক্ষায় বিশেষ ট্রাফিক ও নিরাপত্তা সদস্যরা দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।

তথ্য বিশ্লেষণ করে ডিএমপির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, ঢাকায় ভিআইপি সুরক্ষায় মূল অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী ২ হাজার ৫৭৫ জন পুলিশ সদস্যের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১ হাজার ৬৯১ জন। ৮৯৬ জন সদস্যের এই বিশাল শূন্য পদের ঘাটতি রেখে ভিআইপি প্রটোকল সামলাতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের ওপর অস্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছিল। অধিকন্তু, ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে বিভিন্ন থানায় হামলা ও নাশকতার কারণে পুলিশের বহু গুরুত্বপূর্ণ যানবাহন পুরোপুরি ভস্মীভূত ও ধ্বংস হয়ে যায়, যার ধাক্কা এখনও সামলে ওঠা সম্ভব হয়নি। এর ফলে বিদ্যমান সীমিতসংখ্যক গাড়ি দিয়ে একজন মন্ত্রীকে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যেই আবার অন্য ভিআইপির নিরাপত্তা স্কর্টের জন্য গাড়ি নিয়ে ছুটতে হচ্ছে। সার্বিক এই তীব্র জটিলতা ও জন ভোগান্তি লাঘবে প্রটোকল সংস্কারের এই সিদ্ধান্তকে বেশ ফলপ্রসূ মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও আমলারা।

তথ্যসূত্র: প্রতিদিনের বাংলাদেশ


এ জাতীয় আরো খবর...