রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৯ পূর্বাহ্ন

কে হচ্ছেন নতুন রাষ্ট্রপতি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৯ বার
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের শারীরিক অসুস্থতাজনিত আকস্মিক পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক আলোচনার জন্ম হয়েছে। সংবিধানের বিধি অনুযায়ী স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেও সবার দৃষ্টি এখন বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দার দিকে। সরকার গঠনের সাড়ে পাঁচ মাসের মাথায় রাষ্ট্রপ্রধানের এই পদটি শূন্য হওয়ায় নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন—তা নিয়ে সরকারি দল বিএনপি, আমলাতন্ত্র ও সুশীল সমাজের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও জোর গুঞ্জন ও জল্পনা-সংস্থান তৈরি হয়েছে। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা থাকায় এবং আগামী সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদের পরবর্তী নিয়মিত অধিবেশন আহ্বান করার কথা থাকায়, সংসদ সদস্যদের পরোক্ষ ভোটেই চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপ্রধানের নাম। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালেই পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক রদবদলগুলো অনুষ্ঠিত হবে।

পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সর্বাধিক প্রাধান্য পাচ্ছে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম ও দুঃসময়ে বিএনপির হাল ধরা জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের নাম। এই দৌড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন দলটির টানা এক দশকের বেশি সময় মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করা এবং বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তৃণমূল থেকে উঠে আসা স্বচ্ছ ভাবমূর্তির এই রাজনীতিক সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য। দলের অভ্যন্তরে ও বাইরের বড় একটি অংশ তাকেই দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত প্রার্থী হিসেবে মনে করছে। তবে বার্ধক্যজনিত শারীরিক জটিলতা সত্ত্বেও আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আবদুল মঈন খান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. খন্দকার মোশাররফ একাধিকবার মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হিসেবে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং শিক্ষক হিসেবেও দল-মত নির্বিশেষে সম্মানিত। অপরদিকে পদার্থবিজ্ঞানের প্রাক্তন অধ্যাপক ও নরসিংদী থেকে চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. আবদুল মঈন খান অত্যন্ত সজ্জন, মেধাভিত্তিক ও ক্লিন ইমেজের রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির পরিচ্ছন্ন ও প্রবীণ নেতা নজরুল ইসলাম খানের নামও ব্যাপকভাবে চর্চিত হচ্ছে, যিনি অন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতো সংসদ সদস্য না হলেও একজন নীতিবান ও ত্যাগী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সুপরিচিত।

রাজনীতিকদের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও কারিগরি দক্ষতা বিবেচনায় এনে আলোচনার তালিকায় উঠে এসেছে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রবীণ আমলা ও বিচারকদের নাম। আমলাদের মধ্যে সবচেয়ে জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম নাসিমুল গণির নাম। বিসিএস ১৯৮২ ব্যাচের এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অতীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের গণবিভাগের সচিবের মতো সংবেদনশীল পদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীকালে তাকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। দক্ষ ও অভিজ্ঞ এই আমলাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসিয়ে সরকার প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনায় ভারসাম্য আনতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের এক অংশ মনে করছে। বিচার বিভাগের প্রেক্ষাপট থেকে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন দেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। আইন অঙ্গনে নিরপেক্ষতা ও যোগ্যতার সুখ্যাতি থাকায় তাকে রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে বসানোর বিষয়ে রাজনৈতিক নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের মধ্যে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া সংকটকালে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও কোনো কোনো মহলে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের অগ্রাধিকারে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নামের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিয়ে ইতোমধ্যেই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে কোনো কোনো সূত্রে জানা যায়, স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের শারীরিক প্রতিকূলতা, অসুস্থতা কিংবা বয়সের কারণে যদি শেষ পর্যন্ত কোনো বিকল্প সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়, তবে একজন প্রভাবশালী নারী ব্যক্তিত্ব বা সুশীল সমাজের গ্রহণযোগ্য কাউকে চমক হিসেবে মনোনীত করা হতে পারে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাদের দলীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেই নির্ধারিত হবে, অন্যদিকে আইনমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন যে বিশেষ অধিবেশনের প্রয়োজন না থাকায় সেপ্টেম্বরের নিয়মিত সংসদ অধিবেশনে এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। সংবিধানে পরোক্ষ নির্বাচনের বিধান থাকায় সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সিদ্ধান্ত মূলত বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং দলটির স্থায়ী কমিটির হাতেই রয়েছে। রাজনীতি ও প্রশাসনের বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের নির্বাচন নিছক এক পদপূরণ নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখতে একজন সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিত্ব বেছে নেওয়াই বর্তমান ক্ষমতাসীনদের প্রধান লক্ষ্য।


এ জাতীয় আরো খবর...