কক্সবাজারের বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত মহেশখালীর ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে আকস্মিক ও মারাত্মক কারিগরি ত্রুটির কারণে সমগ্র দেশজুড়ে তীব্র ও নজিরবিহীন গ্যাস সংকট ছড়িয়ে পড়েছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পর্যবেক্ষণ শুরু করলেও ঠিক কী কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে বা ত্রুটি কোথায় ঘটেছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে কবে নাগাদ জাতীয় গ্রিডে স্বাভাবিক পুনর্সংযোগ বা সরবরাহ চালু করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো দিনক্ষণ জানাতে পারছে না সংশ্লিষ্ট পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ। রি-গ্যাসফাইড এলএনজি বা আরএলএনজি সরবরাহ অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে আসায় এর সরাসরি মারাত্মক প্রভাব পড়েছে রাজধানী ঢাকার বাসাবাড়ির রান্নাঘর, সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও মূল উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানাগুলোতে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত জ্বালানি কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ওই ভাসমান টার্মিনালটিতে গত মঙ্গলবার সকালে হঠাৎ করে যান্ত্রিক গোলযোগ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এরপর প্রারম্ভিক মেরামতের মাধ্যমে পরদিন ভোরে গ্যাস সরবরাহ সচল করার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও দেশীয় প্রকৌশলীদের ব্যর্থতায় তা সম্ভব হয়নি। সংকট উত্তরণে এক্সিলারেট এনার্জি তড়িঘড়ি করে যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর এবং রোমানিয়া থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের উড়িয়ে এনেছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারজুড়ে ওই বিশেষজ্ঞ দলটি দুর্ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করলেও টার্মিনালের মূল ত্রুটির গোড়াপত্তন খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়নি। ফলে ত্রুটি শনাক্তের পর তা পূর্ণাঙ্গ মেরামতের প্রক্রিয়া শেষ করতে ঠিক কতদিন সময় লাগবে, সে বিষয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সার্বিক চাহিদা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করা হচ্ছিল। তবে মহেশখালীর ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ধারণক্ষমতার একটি ভাসমান টার্মিনাল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে দৈনিক মোট সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ২৬৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ৫৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এমন এক গভীর পরিস্থিতিতেও বিতরণকারী মূল রাষ্ট্রীয় তদারকি সংস্থা পেট্রোবাংলা রহস্যজনক নীরবতা বজায় রেখেছে এবং উদ্ভূত জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে কী ধরনের কৌশল নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো প্রশাসনিক ব্যাখ্যা বা বিবৃতি দেয়নি।
উৎপন্ন বড় ধরনের ঘাটতি সামাল দেওয়ার কৌশল হিসেবে বিদ্যুৎ বিভাগ ইতোমধ্যেই গ্যাসভিত্তিক বিদুৎকেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন অস্বাভাবিক মাত্রায় কমিয়ে এনেছে। সাধারণ সময়ে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্যাস দিয়ে উৎপাদন করা হলেও সংকটের কারণে তা কমিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৯৪১ মেগাওয়াটে নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন একলহমায় বন্ধ রেখে আনুমানিক ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে। তা সত্ত্বেও জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুটের একটি বড় ঘাটতি বিদ্যমান থাকছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি গ্যাস বাঁচানোর উদ্দেশ্যে এর চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করা হয়, তবে দেশজুড়ে মারাত্মক বিদ্যুতের লোডশেডিং শুরু হবে, যা গ্যাসের পাশাপাশি চরম বিদ্যুৎ সংকট তৈরি করবে।
এদিকে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের ফিলিং স্টেশনগুলোর চিত্র অত্যন্ত করুণ আকার ধারণ করেছে। সিএনজি পাম্পগুলোতে দীর্ঘ কয়েক কিলোমিটার বিস্তৃত গাড়ির লাইন ও অনেক স্থানে ‘গ্যাস নেই’ লেখা প্লেকার্ড ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। স্টেশন সচল থাকা জায়গাগুলোতে গ্যাসের চাপ বা প্রেশার নামমাত্র পর্যায়ে নেমে আসায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি ট্যাংক পূর্ণ হতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ অতিরিক্ত সময় নষ্ট হচ্ছে। এতে করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন চালক ও সাধারণ যাত্রীরা। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি আলোচনার উদ্দেশ্যে সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দায়িত্বশীলদের তড়িঘড়ি করে পেট্রোবাংলায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
বিদ্যমান এই বিপর্যয়কর সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ আঁচ পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপর। রাজধানীর বনশ্রী, হাজীপাড়া সহ প্রায় সবকটি আবাসিক এলাকায় রান্নার চুলা প্রায় বন্ধ বললেই চলে। তীব্র গ্যাসের অভাবে বহু পরিবার বিকল্প উপায়ে মাটির চুলা, ইলেকট্রিক ইন্ডাকশন বা সিলিন্ডার ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন অথবা দোকান থেকে অতিরিক্ত মূল্যে খাবার কিনে খাচ্ছেন। একই সাথে শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও ময়মনসিংহের শিল্পকারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বস্ত্র, পোশাক, সিরামিক, কাচ, স্টিল ও কেমিক্যাল কারখানার মেকানিক্যাল চাকা স্তব্ধ হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ ও কারখানা পরিচালনার উৎপাদন মূল্যে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধস নামার বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর