রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৭ পূর্বাহ্ন

আমলাতন্ত্রের মারপ্যাঁচে থমকে গেল প্রটোকল ব্যয় কমানোর উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

জাতীয় বাজেটের অপচয় রোধ এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্যে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রটোল সুবিধায় যে নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালে আটকে গেছে। সুদমুক্ত বিশেষ ঋণে গাড়ি কেনা সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দকৃত বিশাল অংকের মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকায় নামিয়ে আনার প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছিল। তবে সম্প্রতি সচিবালয় নির্দেশমালার একটি পুরনো ধারার অজুহাত তুলে প্রশাসনিক পর্যায়ে নির্ধারিত বৈঠকটি স্থগিত করে দেওয়া হয়। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক মারপ্যাঁচ ব্যবহার করে নিজেদের বিশেষ আর্থিক সুবিধা টিকিয়ে রাখার এই ঘটনাটি নিয়ে সিভিল সার্ভিস ও সচেতন নাগরিক সমাজে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দেশের সুদের হার যখন ১৫ শতাংশেরও বেশি, তখন প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের আমলারা সম্পূর্ণ সুদমুক্ত সুবিধায় গাড়ি ক্রয়ের বিশেষ সুবিধা উপভোগ করছেন। কেবল ঋণের সুবিধাই নয়, এর সাথে যুক্ত রয়েছে প্রতি মাসে প্রদেয় বিপুল অংকের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা। দেশের সাধারণ মানুষ যখন লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার চরম ব্যয়ের সাথে প্রতিদিন লড়াই করছে, তখন এই ভাতার পরিমাণ অর্ধেক কমিয়ে আনা হলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। কিন্তু সচিবালয় নির্দেশমালার ১৫০ ধারায় উল্লিখিত বিশেষ শর্তকে ঢাল বানিয়ে এই সংস্কার প্রস্তাব আটকে দেওয়া হয়েছে। উক্ত ধারায় বিধান রয়েছে যে, যেকোনো সরকারি মেমো বা প্রশাসনিক আদেশে রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রী সরাসরি ও ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এমন বাক্য ব্যবহার করা যাবে না, বরং ‘সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে’ বাক্যটি লিখতে হবে। ড্রাফটিং বা খসড়া তৈরির এই সামান্য কারিগরি ত্রুটিটি তাত্ক্ষণিকভাবে সংশোধন করে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তা না করে আদেশটিকেই স্থগিত করে দেওয়া হয়।

প্রশাসনিক তথ্য ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বর্তমানে সরকারের প্রায় ২ হাজার ৪০০ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই গাড়ি ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধার আওতায় রয়েছেন। শুধু কর্মকর্তা প্রতি এই মাসিক ভাতা বাবদ প্রতি মাসে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকার বিপুল বরাদ্দ ব্যয় করা হয়। একজন উপসচিব বা তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মকর্তা ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ পেয়ে নিজস্ব গাড়ি ক্রয় করতে পারেন এবং মাসিক ৫০ হাজার টাকা ভাতা গ্রহণ করেন। অভিযোগ রয়েছে যে, নির্ধারিত আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করার পরও অনেকেই নিয়ম বহির্ভূতভাবে নিজ নিজ কার্যালয়ের রুট সার্ভিস কিংবা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের পাজেরো জিপ ব্যবহার অব্যাহত রেখেছেন। অর্থাৎ সরকারি জ্বালানি, চালক ও വാഹന ব্যবহার করার পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণের সরকারি অর্থও ব্যক্তিগত ভাণ্ডারে জমা হচ্ছে, যা সাধারণ করদাতাদের অর্থের অপচয় ও অনৈতিকতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

আর্থিক সুবিধার এই বণ্টন নীতি নিয়ে সিভিল সার্ভিস বা ক্যাডার কাঠামোর ভেতরের কর্মচারীদের মধ্যেও তীব্র বৈষম্য ও অসন্তোষ বিদ্যমান। সরকারের মোট ২৬টি বিসিএস ক্যাডারের মধ্যে মূলত নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রশাসন ও প্রভাবশালী ক্যাডারের কর্মকর্তারা এবং উচ্চপদস্থ কতিপয় সদস্যই এই রাজকীয় সুবিধা গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু সমমানের গ্রেডে অবস্থান করা সত্ত্বেও বাকি ২৫টি ক্যাডারের সিংহভাগ কর্মকর্তা ও সাধারণ চাকরিজীবীরা এই সুবিধা সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। সংবিধান প্রদত্ত সবার সমঅধিকারের নীতি এখানে ক্ষুণ্ন হলেও কেবল কতিপয় সুবিধাভোগী আমলার কারণে এই প্রথা দীর্ঘদিন ধরে টিকে রয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সিভিল সার্ভিসের দিকে তাকালে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনুকরণীয় চিত্র দেখা যায়। যেমন ভারতে বেশ কয়েক বছর আগেই সব ধরনের গাড়ি থেকে বিশেষ ভিআইপি কালচার ও লালবাতি ব্যবহারের সংস্কৃতি স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছে। এমনকি যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশগুলোতে আমলাদের জন্য এই ধরনের অযৌক্তিক ব্যক্তিগত ভাতার ব্যবস্থা নেই; বরং তারা যৌথ পুলকার ব্যবহার বা গণপরিবহনে চলাচলে উৎসাহিত হন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের মতে, আগস্টের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সচিবালয়ের মূল কলকাঠি ও নীতি নির্ধারণী সংস্কারগুলো পুরনো ধাঁচের আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্যেই বন্দি হয়ে আছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত এই ধরনের বিলাসি সুবিধা বন্ধে যখনই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, তখনই আইনি উপধারা ও নিয়মের পবিত্রতা রক্ষার দোহাই দিয়ে তা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। অথচ ইতিপূর্বে প্রশাসন ও আমলাদের নিজেদের বেতন-ভাতা কিংবা অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধির বেলাতে কোনো ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক জটিলতার অজুহাত দেখা যায়নি। রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের গড়া এই জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রাচীর ভাঙতে না পারলে কিংবা কোনো সুনির্দিষ্ট আদেশ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে জাতীয় পর্যায়ের বড় কোনো রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এই ধরনের অনৈতিক ভাতার সংস্কৃতি বন্ধ করে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

তথ্যসূত্র: ঢাকা পেপারস


এ জাতীয় আরো খবর...