রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৮ পূর্বাহ্ন

মেয়াদ শেষের আগেই বিদায় নিয়েছেন যে রাষ্ট্রপতিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

বিশ্বরাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, রাষ্ট্রীয় মেয়াদ পূর্ণ করার সৌভাগ্য সব রাষ্ট্রপ্রধানের ভাগ্যে জোটে না। বড় ধরনের রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি, জনরোষ, রক্তক্ষয়ী সংঘাত, তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা, সামরিক অভ্যুত্থান কিংবা অভিশংসন প্রক্রিয়ার মুখে পড়ে অনেক রাষ্ট্রপ্রধানকেই নির্দিষ্ট সময়ের আগেই গদি ছাড়তে হয়েছে। সম্প্রতি এই আন্তর্জাতিক তালিকার সাথে যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশের পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সাল ও সময়ানুক্রম অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে মেয়াদের আগে পদত্যাগ করা বা ক্ষমতাচ্যুত হওয়া উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রপ্রধানদের সামগ্রিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।

বিংশ শতাব্দীর ষষ্ঠ থেকে নবম দশক

১৯৬০ থেকে ১৯৯০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে বহু প্রভাবশালী রাষ্ট্রপ্রধানকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের কারণে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। ১৯৬৯ সালে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের গণভোটে হেরে গিয়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন ফরাসি রাষ্ট্রপতি শার্ল দ্য গোল। ১৯৭৪ সালে বিশ্ব আলোড়িত করা ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির চরম চাপে অভিশংসন এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম ও একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পদ ছেড়ে দেন রিচার্ড নিক্সন। ফিলিপাইনে গণঅভ্যুত্থান ও দুর্নীতির অভিযোগে ১৯৮৬ সালে ক্ষমতাচ্যুত হন ফের্দিনান্দ মার্কোস। ১৯৮৯ সালে আর্জেন্টিনায় লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক ধসের মুখে মেয়াদের ছয় মাস আগেই বিদায় নেন রাউল আলফনসিন। ব্রাজিলে ১৯৯২ সালে দুর্নীতির দায়ে অভিশংসনের মুখে সিনেট ভোটের আগেই পদত্যাগ করেন ফের্নান্দো কলর ডি মেলো। এছাড়া অর্থনৈতিক মন্দা ও সুদীর্ঘ আন্দোলনের মুখে ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৯৮ সালে সুহার্তোর ৩২ বছরের রাজত্বের অবসান ঘটে এবং ১৯৯৯ সালের শেষ দিনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন আকস্মিক পদত্যাগ করে ভ্লাদিমির পুতিনের হাতে শাসনভার তুলে দেন।

একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক

২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যবর্তী সময়েও বিশ্ব রাজনীতিতে মেয়াদের আগে ক্ষমতার রদবদলের বহু দৃষ্টান্ত তৈরি হয়। বিতর্কিত অর্থনৈতিক নীতির কারণে জনরোষের মুখে ২০০৩ সালে বলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি গনজালো সানচেজ ডি লোজাডা দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। ২০০৪ সালে সশস্ত্র বিদ্রোহের মুখে পদত্যাগ করেন হাইতির জাঁ-বারট্রান্ড অ্যারিস্টিড। ২০০৮ সালে পাকিস্তানে অভিশংসনের চরম ঝুঁকি ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ইস্তফা দেন জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। অন্যদিকে ২০১১ সালে ঐতিহাসিক ‘আরব বসন্ত’ নামক গণআন্দোলনের প্রবল ধাক্কায় মিশরের হোসনি মুবারক তার দীর্ঘ ৩০ বছরের ক্ষমতার মায়া ত্যাগ করেন। একইভাবে ২০১২ সালে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহ আরব বসন্তের চাপে ক্ষমতা হস্তান্তরের চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।

২০১০ দশকের রাজনৈতিক রদবদল

২০১০ পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির বিচার ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্বের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমতা হারান। ২০১৬ সালে বাজেট আইন লঙ্ঘনের অপরাধে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ সিনেটের ভোটে অভিশংসিত হন। ২০১৭ সালে দুর্নীতির অভিযোগে দক্ষিণ কোরিয়ার আদালত কর্তৃক বরখাস্ত হন প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন-হাই। একই বছর জিম্বাবুয়েতে টানা ৩৭ বছর ক্ষমতায় থাকা রবার্ট মুগাবেকে সামরিক বাহিনীর চাপে পদ ছাড়তে হয়। ২০১৮ সালে পেরুর পেদ্রো পাবলো কুচিনস্কি, দক্ষিণ আফ্রিকার জ্যাকব জুমা এবং গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের জোসেফ কাবিলা রাজনৈতিক সংকটের মুখে পদত্যাগ করেন। ২০১৯ সালে কাজাখস্তানে জনগণের অসন্তোষের মুখে তিন দশকের শাসন শেষে নুরসুলতান নজরবায়েভ স্বেচ্ছায় বিদায় নেন এবং বলিভিয়ার ইভো মোরালেস সেনাবাহিনীর চাপে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন।

সাম্প্রতিক দশক ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

২০২০ দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকজন শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধানকে অসময়ে দায়িত্ব ছাড়তে দেখা গেছে। ২০২০ সালের নভেম্বরে পার্লামেন্টের অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন পেরুর প্রেসিডেন্ট মার্টিন ভিজকারা। ২০২২ সালে ইতিহাসের ভয়াবহতম অর্থনৈতিক মন্দা ও তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালিয়ে অনলাইনে পদত্যাগপত্র পাঠান। অন্যদিকে ভিয়েতনামে দেশব্যাপী দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অভিযানের মুখে পড়ে ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট নগুয়েন জুয়ান ফুক এবং ২০২৪ সালে তার উত্তরসূরি ভো ভান থুওং মেয়াদের আগেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সর্বশেষে ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই বাংলাদেশে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও শারীরিক অসামর্থ্যের কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন।


এ জাতীয় আরো খবর...