রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৭ পূর্বাহ্ন

ব্যাংকিং খাতে পরিচালকদের অনিয়ম রুখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর পদক্ষেপ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো এবং বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন প্রবর্তিত ইন্টারনাল কন্ট্রোল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা আইসিএমএস নির্দেশিকার অধীনে এখন থেকে যেকোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কিংবা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অনিয়ম বা দুর্নীতির তথ্য সম্পূর্ণ গোপনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জানাতে পারবেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষকরা। এতদিন পর্যন্ত ব্যাংকের শীর্ষ পদের ব্যক্তিদের অনিয়ম প্রকাশের ক্ষেত্রে যে প্রাতিষ্ঠানিক বাধা বা প্রশাসনিক ভয় ছিল, তা দূর করতে প্রথমবারের মতো দেশের সমস্ত তফসিলি ব্যাংকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হুইসেলব্লোয়ার’ বা গোপন তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা বাধ্যবাধকতা করা হয়েছে। একই সাথে বিগত ২০১৬ সালে জারি করা পুরোনো অভ্যন্তরীণ পরিপালন বিষয়ক নির্দেশিকাটি বাতিল ঘোষণা করে তার স্থানে আধুনিক ও যুগোপযোগী আন্তর্জাতিক তদারকি রূপরেখা কার্যকর করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে যে, অতীতে ব্যবহৃত পরিপালন ব্যবস্থা তৎকালীন সনাতন কাঠামোর জন্য কিছুটা উপযুক্ত থাকলেও বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আধুনিক ‘রিস্ক বেইজড সুপারভিশন’ বা ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি পদ্ধতি বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে। এই নতুন তদারকি কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্য রাখতেই আইসিএমএস সংক্রান্ত পুরোনো নির্দেশনায় মূলগত ও ব্যাপক পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়েছিল। ব্যাংকিং ব্যবস্থার সার্বিক ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য যদিও একটি স্বতন্ত্র নীতিমালা আলাদাভাবে প্রণীত হবে, তবুও এই নীতিমালার মাধ্যমে ব্যাংকের ভেতরের নিরপেক্ষে নিরীক্ষা ও কমপ্লায়েন্স কীভাবে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব ছাড়া পরিচালিত হবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে কোনো ব্যাংকের পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিজেদের পদমর্যাদা ব্যবহার করে আর্থিক দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলে তা প্রতিহত করা আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ ও কার্যকর হবে।

নতুন প্রকাশিত নির্দেশনার অন্যতম প্রধান ও বড় সংস্কারটি হলো ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট এবং কমপ্লায়েন্স বিভাগ দুটিকে সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বাবলম্বী দুই কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা। ইতিপূর্বে ব্যাংকগুলোতে ‘হেড অব আইসিসি’ বা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন প্রধান নামে একজন একক কর্মকর্তাই একই সাথে অডিট এবং কমপ্লায়েন্স দুই বিভাগের নীতিনির্ধারণী দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের নতুন নিয়মানুযায়ী এখন থেকে ‘হেড অব ইন্টারনাল অডিট’ এবং ‘হেড অব কমপ্লায়েন্স’ দুটি সম্পূর্ণ পৃথক পদ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এই দায়িত্বে নিয়োজিত দুই শীর্ষ কর্মকর্তার পদমর্যাদা ও ক্ষমতা সমান রাখা হয়েছে। পূর্বে যেকোনো অনিয়ম ধরে অডিট বিভাগ রিপোর্ট করলে কমপ্লায়েন্স বিভাগ বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সেটি মাঝপথেই চেপে যাওয়ার যে সুযোগ বা সুযোগসন্ধানী মানসিকতা তৈরি হতো, এই প্রাতিষ্ঠানিক বিভক্তিকরণের ফলে অডিট রিপোর্ট আর চেপে রাখার সুযোগ বা সম্ভাবনা থাকবে না।

নতুন নীতিমালার প্রশাসনিক ক্ষমতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রেও আনা হয়েছে অভাবনীয় পরিবর্তন। এখন থেকে ব্যাংকের অডিট প্রধানকে কোনো ধরনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা ব্যাংকের দৈনন্দিন নির্বাহীদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে না; বরং তিনি সরাসরি পরিচালকদের নিয়ে গঠিত পর্ষদের অডিট কমিটির নিকট প্রতিবেদন পেশ করবেন। তদুপরি, অডিটে যদি খোদ পরিচালনা পর্ষদের কোনো প্রভাবশালী সদস্য বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির প্রাথমিক তথ্য মেলে, তবে তা কোনো অনুমোদন ছাড়াই গোপনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং তদারকি বিভাগের নিকট দ্রুত পাঠাতে হবে। অভিযোগ গ্রহণ সহজ করতে প্রতিটি ব্যাংকে বিশেষ হটলাইন সেবা, গোপন ই-মেইল ঠিকানা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা সিলগালা পেটি রাখতে হবে। তথ্য প্রকাশকারীর (হুইসেলব্লোয়ার) পরিচয় সর্বোচ্চ গোপনীয়তায় রাখতে হবে এবং নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ থাকলে বেনামি অভিযোগের ওপর ভিত্তি করেও সততার সাথে তদন্ত পরিচালনা করতে হবে। একই সাথে, তথ্য প্রকাশ করায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার সাময়িক বরখাস্ত, পদাবনতি বা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিলে অপরাধী ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রথাগত অডিট ব্যবস্থার গণ্ডি পেরিয়ে ডিজিটাল ও আধুনিক ব্যাংকিং পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিভিত্তিক তিন ধরনের অডিট পরিচালনার সুস্পষ্ট আদেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেগুলো হলো ফরেনসিক অডিট, কনকারেন্ট বা সমসাময়িক অডিট এবং ভার্চুয়াল অডিট। ব্যাংকে কোনো বড় ধরনের জালিয়াতি বা আর্থিক অপরাধ ঘটে গেলে ফরেনসিক অডিটের সাহায্যে এমনভাবে সূক্ষ্ম তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হবে, যা পরবর্তীতে সরাসরি আদালতের বিচারে দণ্ড দেওয়ার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। অন্যদিকে, লেনদেন চলাকালেই রিয়েল-টাইমে নজরদারির জন্য কনকারেন্ট অডিট কাজ করবে এবং ভার্চুয়াল অডিটের মাধ্যমে দূরের শাখাগুলোর ওপর নিরাপদ দূরবর্তী পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করা যাবে। একই সাথে বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার বা ট্রেড বেসড মানি লন্ডারিং রোধ, ঋণ ও বাজার ঝুঁকি শনাক্তকরণ, সাইবার নিরাপত্তা রক্ষা এবং জালিয়াতি ঠেকাতে ব্যাংকগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশের সকল তফসিলি ব্যাংককে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোতে এই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে নিয়মটি পুরোদমে বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

তথ্যসূত্র: আমার দেশ


এ জাতীয় আরো খবর...