রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪২ পূর্বাহ্ন

খাজনা বাকি ৭ হাজার কোটি টাকা: তালিকায় সরকারী প্রতিষ্ঠানও

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬

আইন মেনে রাষ্ট্রকে কর দেওয়া সাধারণ নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক হলেও, খোদ সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোই নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধে চরম উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছে। সাধারণ ভূমির মালিকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ে প্রশাসনের তৎপরতা দেখা গেলেও সরকারি সংস্থার ক্ষেত্রে সেই নিয়ম যেন শিথিল। কিন্তু এবার আর ছাড় দেওয়ার পক্ষে নয় সরকার। ভূমি সংস্কার বোর্ডের সাম্প্রতিক হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে ভূমি উন্নয়ন করের মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিশাল অঙ্কের অনাদায়ী রাজস্বের মধ্যে প্রায় ৫৫৬ কোটি টাকা বকেয়া ঝুলছে কেবল বিভিন্ন সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ঘাড়ে। বিপুল পরিমাণ এই বকেয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে এবার অভূতপূর্ব কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়।

রাজস্ব আদায় সচল করতে ও বকেয়ার পাহাড় ভাঙতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ে সম্প্রতি এক বিশেষ জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ভূমিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেই নীতি নির্ধারণী সভায় স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, খাজনা আদায়ে আর কোনো শিথিলতা বা ওজর-আপত্তি সহ্য করা হবে না। রাষ্ট্রীয় অর্থাগারে রাজস্ব প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে এখন থেকে অনাদায়ী করদাতাদের বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে লাল নোটিশ জারি, আইনগত সার্টিফিকেট মামলা দায়ের, বকেয়াগ্রস্ত এলাকায় বিশেষ রাজস্ব ক্যাম্প স্থাপন এবং সরাসরি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মতো কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হবে। শুধু তা-ই নয়, যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভূমির খাজনা বকেয়া থাকবে, তাদের জমি বিক্রি, হস্তান্তর, অন্য কারও কাছে বন্ধক রাখা কিংবা নতুন কোনো ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি বিধিনিষেধসমূহ অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

ভূমি সংস্কার বোর্ডের প্রস্তুত করা পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেশের ভূমি কর আদায়ের এক করুণ ও হতাশাজনক চিত্র সামনে আসে। বর্তমানে সারাদেশে ভূমি উন্নয়ন কর বাবদ সরকারের মোট পাওনার পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৮৫৩ কোটি ৩৭ লাখ ৬৪ হাজার ৯৬৭ টাকা। তবে অর্থবছরের মাঠপর্যায়ের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই বিপুল দাবির বিপরীতে আদায় করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৯১৪ কোটি ৩২ লাখ ৬২ হাজার ৭৭৫ টাকা। অর্থাৎ মোট পাওনার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে। বাকি ৬ হাজার ৯৩৯ কোটি ৫ লাখ ২ হাজার ১৯২ টাকা এখনো বকেয়া হিসেবে জমে আছে।

এই প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার অনাদায়ী রাজস্বের বিশাল অংশকে দুটি মূল ভাগে বিভক্ত করেছে মন্ত্রণালয়। যার মধ্যে সাধারণ নাগরিক ও ব্যক্তিগত মালিকানাধীন করদাতাদের কাছে বকেয়ার পরিমাণ ৬ হাজার ৩৮২ কোটি ৩১ লাখ টাকা। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছায়ায় থাকা বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, আধাসরকারি সংস্থা ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৫৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। বছরের পর বছর ধরে অনাদায়ী পড়ে থাকা এই বিপুল অর্থ রাজস্ব খাতের একটি বড় ধরনের দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা ও ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ করদাতাদের নিয়মিত কর পরিশোধে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন সময় সামাজিক প্রচার-প্রচারণা চালানো হলেও অনেক সরকারি সংস্থা বিষয়টিকে দীর্ঘকাল ধরে গুরুত্বহীন মনে করে আসছে। অনেক সময় দেখা যায়, উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য কোনো সরকারি সংস্থা জমি অধিগ্রহণ করলেও সেই জমির স্বত্ব বা নামজারি (মিউটেশন) যথাসময়ে সম্পন্ন করে না। আবার অনেক দপ্তর থেকে অজুহাত দেখানো হয় যে, তাদের বার্ষিক বাজেট বরাদ্দে ‘ভূমি উন্নয়ন কর’ মেটানোর জন্য পৃথক অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি। এই ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অবহেলার দরুন প্রতিবছর কর জমতে জমতে একসময় তা শত শত কোটির বকেয়ায় রূপ নেয়।

একই সাথে দেশের বাণিজ্যিক ও শিল্পোন্নত জেলাগুলোতে রাজস্ব আদায়ের গতি সবচেয়ে কম দেখা গেছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা, শিল্পনগরী গাজীপুর, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, রংপুর, সাতক্ষীরা, কুমিল্লা ও যশোরের মতো অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রত্যাশিত হারে খাজনা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে ঢাকা ও গাজীপুরের মতো এলাকায় যেখানে ভূমির বাজারমূল্য আকাশচুম্বী এবং বিপুল পরিমাণ শিল্পকারখানা ও সরকারি দপ্তর গড়ে উঠেছে, সেখানেও রাজস্ব আদায়ে চরম স্থবিরতা বিরাজ করছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে সাধারণ ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের হার ঢাকায় মাত্র ১১ শতাংশ, ময়মনসিংহে ১০, খুলনায় ৬, রংপুরে ৬, রাজশাহীতে ১২, চট্টগ্রামে ১৩, সিলেটে ৯ এবং বরিশাল বিভাগে ১৭ শতাংশ। নগর এলাকায় ভূমির সীমানা বা মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা, স্বত্ব রেকর্ড সংশোধনের ধীরগতি এবং বছরের পর বছর ঝুলে থাকা দেওয়ানি মামলার কারণেও কর আদায়ে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।

সারাদেশের বেশিরভাগ জেলা কর আদায়ে পিছিয়ে থাকলেও ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে দেশের কয়েকটি জেলা। প্রশাসনিক সমন্বয় ও মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তার কারণে কিছু অঞ্চলে সাফল্য লক্ষ্য করা গেছে। বরগুনা, পঞ্চগড়, মাগুরা, ঝালকাঠি, গোপালগঞ্জ, ভোলা, মুন্সীগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, মাদারীপুর ও মেহেরপুর জেলা ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ে উল্লেখ করার মতো অগ্রগতি দেখিয়েছে। এসব জেলার ভূমি প্রশাসনের কর্মকর্তারা শুধু দপ্তরে বসে না থেকে নিয়মিত কর মেলানো ক্যাম্প, গণসচেতনতামূলক উদ্বুদ্ধকরণ সভা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। যার ফলে স্থানীয় জমি মালিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বকেয়া পরিশোধে এগিয়ে এসেছেন।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন নীতি নির্ধারকরা স্পষ্ট করেছেন যে, সচেতনতা বৃদ্ধি কিংবা মৌখিক উদ্বুদ্ধকরণের দিন শেষ। এবার ব্যবস্থা হবে কাজের মাধ্যমে। প্রতিটি মৌজায় যারা বড় ও প্রভাবশালী ভূমি মালিক—চাই তারা ব্যক্তি হোক বা কোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান—তাদের নামের তালিকা তৈরি করে নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। প্রভাবশালী করদাতাদের কাছ থেকে বকেয়া আদায় সম্ভব হলে তা সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও সঠিক বার্তা পৌঁছাবে।

আধুনিক গণতান্ত্রিক ও উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিক কিংবা প্রতিষ্ঠান কারোরই রাষ্ট্রীয় পাওনা ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জনসেবামূলক খাতগুলোকে সচল রাখতে সরকারের নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন হয়। তাই প্রশাসনিক কোনো শিথিলতা না রেখে বকেয়ার পাহাড় ভাঙতে আইনগত সব ধরনের কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে ভূমি প্রশাসন।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


এ জাতীয় আরো খবর...