শিরোনামঃ
আমাদের মোহিত কামাল ভাই জেলা পরিষদের প্রশাসক-চেয়ারম্যানদের রাষ্ট্রীয় প্রটোকল নিশ্চিতে ডিসিদের নির্দেশ পাবনায় চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু বরিশালের বাকেরগঞ্জে বোমাসদৃশ বস্তুর বিস্ফোরণে দগ্ধ ৩ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব এককভাবে কারও নয়: রিজভী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের নির্দেশনার অপেক্ষায় ইসি: ইসি সচিব প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানেই উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকা: প্রতিমন্ত্রী জুলাইয়ে রেকর্ড বৃষ্টির পর আগস্টে তাপপ্রবাহ ও বন্যার ঝুঁকি খেলাধুলার মাধ্যমে মাদক-অপরাধ থেকে দূরে থাকবে তরুণরা: ত্রাণমন্ত্রী ওজন কমাতে কোন ব্যায়ামে মিলবে বেশি উপকার
মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪৫ পূর্বাহ্ন

প্রযুক্তির মোড়কে আধুনিক টোল কাউন্টার: কার স্বার্থে জিম্মি সাধারণ মানুষ?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৩ বার
প্রকাশ: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

বর্তমান যুগে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে কয়েক স্পর্শেই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে টাকা পৌঁছে যাচ্ছে। যে প্রবাসীর কষ্টার্জিত অর্থ স্বজনদের হাতে পৌঁছাতে একসময় সপ্তাহজুড়ে ব্যাংকের চক্কর কাটতে হতো কিংবা হুন্ডির মতো মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পথের ওপর নির্ভর করতে হতো, আজ তা কয়েক মুহূর্তে স্থানান্তরিত হচ্ছে। বাংলাদেশে বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) সেবাগুলো নিঃসন্দেহে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। দেশের সাড়ে আট কোটিরও বেশি মানুষ, যাদের বড় একটি অংশের জন্য কখনো প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার দরজা খোলেনি, তারা আজ ডিজিটাল অর্থায়নের আওতাভুক্ত। তবে এই সুবিধাজনক ও গতিশীল ব্যবস্থার অপর পিঠে গ্রাহকের ঝুলিতে জমা হচ্ছে এক নীরব প্রশ্ন—প্রতি হাজার টাকায় ১৭.৫০ থেকে ১৮.৫০ টাকা ক্যাশ আউট ফি বা লেনদেন মাশুল কি কেবলি সেবা টিকিয়ে রাখার যৌক্তিক খরচ, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থার মনোপলি ও মাত্রাতিরিক্ত মুনাফার সমীকরণ?

যেকোনো বাণিজ্যিক বা প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে মূলধন ও পরিচালন ব্যয় (Operational Expenditure) থাকাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। ডিজিটাল ওয়ালেটগুলো কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়। কোটি কোটি গ্রাহকের তথ্যের সাইবার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা, অত্যাধুনিক সার্ভার মেইনটেইন করা, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, এজেন্টদের বিশাল নেটওয়ার্ক সচল রাখা এবং দেশজুড়ে লাখো এজেন্টদের কমিশন পরিশোধ করার জন্য প্রতি মাসেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হয়। ফলে এমএফএস প্রদানকারী ব্যাংক বা তাদের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলো সার্ভিস চার্জ হিসেবে নির্দিষ্ট মাশুল নেবে এবং সেখান থেকে মুনাফা অর্জন করবে—ব্যবসার স্বাভাবিক নিয়মে এতে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। ফ্রি সার্ভিস বা সম্পূর্ণ মাশুলহীন সেবা দেওয়া কোনো বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে সম্ভবও নয়। কিন্তু বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু সার্ভিস চার্জের অস্তিত্ব নিয়ে নয়; বরং বিতর্কের স্থানটি হলো—এই চার্জের হার কতটা যৌক্তিক এবং গ্রাহকের সামনে সাশ্রয়ী বিকল্পের উপস্থিতির অভাব।

বাংলাদেশে ক্যাশ আউট বা টাকা তোলার প্রক্রিয়ায় যে মাশুল নির্ধারণ করা আছে, তা আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটের তুলনায় যথেষ্ট বেশি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য ও সূচক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে ক্যাশ আউটের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি এবং মিয়ানমারের তুলনায় তা প্রায় দ্বিগুণ। অন্যদিকে ভারতের ইউপিআই (Unified Payments Interface) মডেলে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যাংক থেকে ব্যাংকে এবং ওয়ালেট থেকে ওয়ালেটে লেনদেন চালুর নজির রয়েছে। প্রশ্ন হলো, ভারত যদি এই ব্যয় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারে, তবে বাংলাদেশে লেনদেনের পরতে পরতে কেন এত উচ্চহারে সার্ভিস চার্জ প্রদান করতে হচ্ছে?

এর উত্তরের গভীরে রয়েছে দেশের লেনদেন সংস্কৃতির বিশেষ একটি দিক—নগদ টাকার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা। উন্নত বা বিকাশমান অনেক দেশেই আজ দোকানে কেনাকাটা থেকে শুরু করে ইউটিলিটি বিল পরিশোধে সরাসরি ডিজিটাল ওয়ালেট বা স্ক্যানিং ব্যবস্থার প্রচলন রয়েছে, যেখানে পকেট থেকে টাকা বের করার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু বাংলাদেশে ই-কমার্স থেকে শুরু করে খুচরা বাজার—সর্বত্রই আজও “ক্যাশ অন ডেলিভারি” বা নগদের রাজত্ব কায়েম রয়েছে। ডিজিটাল ফান্ড ওয়ালেটে আসার পরও যেহেতু দোকানপাট বা দৈনন্দিন বাজারে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যাপক অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি, তাই বাধ্য হয়েই সাধারণ মানুষকে সেই ই-মানিকে ক্যাশ আউটের মাধ্যমে ফিজিক্যাল কাগুজে টাকায় রূপান্তর করতে হয়। আর ঠিক এই রূপান্তরের বা টাকা তোলার ক্ষণটিতেই কাটা পড়ে মোটা অঙ্কের সার্ভিস চার্জ। যদি দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসা ও পাইকারি বাজারে সরাসরি ডিজিটাল ওয়ালেট গ্রহণের চর্চা বৃদ্ধি পেত, তবে মানুষ টাকা ক্যাশ আউট করা কমিয়ে দিত এবং মাশুল দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও অনেকখানি কমে আসত।

আর্থিক ও আইনি কাঠামোর গভীর বিশ্লেষণ করলে আরেকটি স্পর্শকাতর জায়গা সামনে আসে, তা হলো ‘ই-মানি’ (e-money) এবং ব্যাংকিং আমানতের (Deposit) মৌলিক পার্থক্য। ব্যাংক বা এমএফএস নীতিমালার অধীনে বিকাশ বা নগদের মতো ওয়ালেটে রাখা কোটি কোটি সাধারণ গ্রাহকের অর্থ ব্যাংকের খাতায় কেবলই ই-মানি বা ডিজিটাল দেনা হিসেবে নিবন্ধিত থাকে। তবে বাস্তব সত্য হলো, দেশে প্রায় ৮ থেকে ৯ কোটি গ্রাহকের ছোট ছোট অব্যবহৃত ই-মানির পুঞ্জীভূত বিশাল অংশটি কিন্তু একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় ট্রাস্ট অ্যাকাউন্টে বা বাণিজ্যিক ব্যাংকে জমা রাখা হয়। প্রচলিত আইনে গ্রাহক ব্যাংকের আমানতের ওপর বাৎসরিক সুদ পাওয়ার অধিকার রাখলেও, ওয়ালেটে রাখা ই-মানির বিপরীতে গ্রাহককে কোনো মুনাফা বা সুদ দেওয়া হয় না। সেই সুদের সমুদয় অর্থ জমা হয় কোম্পানির রিজার্ভে। ফলে দেখা যাচ্ছে, একদিকে গ্রাহকের আলসে পড়ে থাকা অর্থের জমা সুদ এবং অন্যদিকে ক্যাশ আউট ও অন্যান্য সার্ভিস চার্জ—এই দুই প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে বিকাশ বা নগদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর নেট প্রফিট বা নিট মুনাফা বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৪ সালে কেবল বিকাশের রাজস্ব ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসেই তাদের নিট মুনাফা রেকর্ড ৫০০ কোটি টাকা স্পর্শ করে, যা আগের বছরগুলোর প্রবৃদ্ধিকে বহুগুণে ছাড়িয়ে গেছে।

তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, ভারতে কীভাবে ইউপিআই মডেল সম্পূর্ণ ফ্রিতে চালু রয়েছে? ভারতের সফলতার নেপথ্যে রয়েছে তিন ধাপের একটি সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় নীতি। প্রথমত, ‘জনধন’ প্রকল্পের অধীনে ভারতের অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা হয়েছিল সম্পূর্ণ শূন্য খরচে। দ্বিতীয়ত, সরকারি উদ্যোগ ও ব্যাংকগুলোর এক যৌথ অলাভজনক ফোরাম—’ন্যাশনাল পেমেন্টস করপোরেশন অব ইন্ডিয়া’ (NPCI) গঠন করে ইউপিআই নেটওয়ার্কের উন্মুক্ত অবকাঠামো তৈরি করা হয়। এখানে গুগল পে (Google Pay) বা ফোনপে (PhonePe)-এর মতো অ্যাপগুলো কেবল একটি সংযোগমাধ্যম মাত্র; মূল অর্থ ব্যবহারকারীর নিজ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থাকে এবং অ্যাপগুলো গ্রাহকের টাকা আটকে রাখতে পারে না। তৃতীয়ত, দেশটির সরকার কেন্দ্রীয় আইনের মাধ্যমে যেকোনো ডিজিটাল ট্রানজ্যাকশনের ফি পুরোপুরি মওকুফ ঘোষণা করেছে এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্ক সচল রাখার পরিচালন ব্যয় সরকার নিজেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে অনুদান বা ভর্তুকি হিসেবে সরবরাহ করে।

বাংলাদেশে ইউপিআই-এর মতো কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় অলাভজনক ডিজিটাল অবকাঠামো না থাকায়, পুরো বাজারটি বেসরকারি বা ব্যাংকিং সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মনোপলি বা একচেটিয়া বাণিজ্যিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। একই সাথে ব্যাংক টু ব্যাংক কিংবা এক এমএফএস ওয়ালেট থেকে অন্য এমএফএস ওয়ালেটে সরাসরি ফ্রিতে বা কম খরচে টাকা স্থানান্তরের জন্য প্রবর্তিত ‘ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ’ বা ইন্টারঅপারেবিলিটি প্ল্যাটফর্মও নানা প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অনীহার কারণে শতভাগ সফল হতে পারেনি। প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারের অভাব এবং একটি নির্ভরযোগ্য সরকারি বা ফ্রি ডিজিটাল চ্যানেল না থাকায়, সাধারণ গ্রাহকের সামনে অন্য কোনো বিকল্প খোলা থাকে না। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের নির্ধারিত অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ মেনে নিতে হয়।

প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের কথা বিবেচনা করলে এই অতিরিক্ত চার্জের ক্ষতিকর দিকটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়। একজন বৈদেশিক শ্রমিক তাঁর দিনরাত পরিশ্রমের উপার্জন দেশে পাঠালে রাষ্ট্র তাকে প্রণোদনা দিয়ে উৎসাহিত করে সত্য, কিন্তু সেই টাকা স্বজনদের হাতে পৌঁছে চূড়ান্ত ধাপে ক্যাশ আউট হতে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ ফি হিসেবে কেটে নেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের এই ক্ষোভ ও আইনি অসঙ্গতিগুলোর কারণেই সম্প্রতি দেশের উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট) এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো সেবাদাতাদের অতিরিক্ত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ সার্ভিস চার্জ কেন বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না এবং একটি পৃথক সুনির্দিষ্ট ‘মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস আইন’ তৈরির নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না—তা জানতে চেয়ে অর্থ সচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে রুল জারি করা হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ও টেকসই বিকাশ যেমন অপরিহার্য, তেমনি দেশের মেহনতি মানুষ ও গ্রাহকদের পকেটের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও রেগুলেটরি সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব। কোম্পানিগুলো অবশ্যই চার্জ নেবে এবং পরিষেবা নিশ্চিত করে নিয়মতান্ত্রিক মুনাফা করবে, তবে তা যেন সাধারণ নাগরিকের উপার্জনের ওপর অতিরিক্ত বোঝা বা জিম্মিদশায় পরিণত না হয়। একটি স্বাধীন রেগুলেটরি বডি দ্বারা পরিচালন খরচের নিরিখে যৌক্তিক ক্যাশ আউট ফি পুনঃনির্ধারণ করা, দেশে ক্যাশলেস পেপারলেস ট্রানজ্যাকশন সংস্কৃতি জোরদার করা এবং একটি অলাভজনক জাতীয় ও সমন্বিত পেমেন্ট চ্যানেল তৈরি করাই হতে পারে এই ডিজিটাল মাশুল বিতর্কের টেকসই সমাধান।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


এ জাতীয় আরো খবর...