বিগত সরকারগুলোর রাজনৈতিক অপশাসন, চরম সামাজিক অসঙ্গতি কিংবা শাসনব্যবস্থার শীর্ষ ব্যক্তিদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিক যখন সরাসরি ক্ষোভ উগড়ে দিতে বা সমালোচনা করতে পারতেন না, তখন ক্ষোভ প্রকাশের রাজনৈতিক রূপক হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগান্ডার নাম বেছে নেওয়া হতো। কুমড়ার বেগুনি কিংবা কাঁঠালের বার্গারের মতো হাস্যকর সব প্রসঙ্গ তুলে ধরে তৎকালীন রাষ্ট্র পরিচালকদের ট্রল করতে গিয়ে নেটিজেনরা অহেতুক আফ্রিকান এই দেশটির সাথে তুলনা টানতেন। কিন্তু বাস্তবতার চাকা আজ একেবারে উল্টো ঘুরে গেছে। যে দেশটিকে আমরা দীর্ঘকাল কেবল ট্রল বা উপহাসের পাত্র বানিয়ে রেখেছিলাম, আজ ভাগ্য বদলানোর তাগিদে বাংলাদেশের অদম্য তরুণ উদ্যোক্তারা সেই উগান্ডার বুকেই গড়ে তুলছেন নিজেদের নতুন ভবিষ্যৎ।
সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলা একটি ভিডিও বার্তা বাঙালি সমাজের বহুদিনের লালিত বদ্ধমূল ধারণাকে যেন সরাসরি এক বাস্তবতার সম্মুখীন করেছে। নীল রঙের টি-শার্ট পরা মুজাহিদুল ইসলাম জাহিদ নামের এক উদ্যোক্তা উগান্ডার এক বিশাল ও দিগন্তজোড়া কৃষি খামারে দাঁড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সাফল্যের কথা তুলে ধরেছেন। পেশায় আইটি ও কৃষি উদ্যোক্তা জাহিদ ‘দ্য আফ্রিকান ড্রিমস’ এবং ‘ফেসি ফার্ম’-এর যৌথ উদ্যোগে উগান্ডার ক্যাপ্রোবায়িং জেলায় প্রায় ৫ হাজার একর জমি ক্রয় করে এক মেগা কৃষি প্রকল্প বাস্তবায়নে নেমেছেন। তাঁর সদ্য সমাপ্ত ১৫০ একর জমির ভুট্টার চোখজুড়ানো ফলন এবং প্রাকৃতিকভাবে চাষ করা সয়াবিন ও ধানের বিশাল সম্ভার পুরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে যেখানে অতিরিক্ত কীটনাশক ও কেমিক্যাল সারের যথেচ্ছ ব্যবহারে চাষযোগ্য জমিগুলো ক্রমেই বিষাক্ত ও অকার্যকর হয়ে পড়ছে, সেখানে উগান্ডার মাটি সম্পূর্ণ আলাদা এক গল্প শোনায়। জাহিদ জানান, সেখানকার অতীব উর্বর ও প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ মাটিতে কোনো ধরনের রাসায়নিক সার বা কৃত্রিম অনুঘটক প্রয়োগ না করেই কেবল স্বাভাবিক পরিচর্যায় রেকর্ড পরিমাণ ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে। পোকামাকড় থেকে ফসল রক্ষা করার জন্য কেবল প্রাথমিক এক-দুটি স্প্রে দেওয়া ছাড়া আর বাড়তি খরচ করতে হয় না। শুধু ভুট্টার চাষই নয়, সেখানে একই সাথে প্রাকৃতিকভাবে সয়াবিন থেকে ভোজ্য তেল নিষ্কাশন, ব্যাপক পরিসরে বর্ষাকালীন ধান রোপণ এবং দুম্বা ও ছাগলের বিশাল এক বাণিজ্যিক খামার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কোনো দেশের সরকারের বিদেশি বিনিয়োগ সংক্রান্ত নীতি কতটা নমনীয় ও বন্ধুত্বপূর্ণ হতে পারে, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে উগান্ডা। তানজানিয়াসহ আফ্রিকার অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে ব্যবসা করতে গেলে যেখানে দীর্ঘমেয়াদী লিজ ব্যবস্থার জটিলতা বা চড়া ভ্যাট-ট্যাক্সের রাজস্ব আইনি জটিলতায় পড়তে হয়, সেখানে উগান্ডায় প্রবাসীদের জন্য এমন কোনো আমলাতান্ত্রিক বাধা নেই। জমির তুলনামূলক কম দাম, সুলভ শ্রমবাজার এবং অসাধারণ অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এটি যেকোনো বিদেশি কৃষি উদ্যোক্তার জন্য এক আদর্শ ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। এই কারণেই আজ বাংলাদেশের যুবকেরা সুদূর আফ্রিকায় প্রায় ৫ হাজার একর বিশাল জমি নিয়ে নিজেদের স্বপ্নের নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতার সবচেয়ে বড় প্রতীক হিসেবে ধরা হয় তার পাসপোর্টের গ্লোবাল র্যাঙ্কিং বা অবস্থানকে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা হংকংয়ের মতো আধুনিক দেশগুলোতে চিকিৎসা, পর্যটন কিংবা শিক্ষা সংক্রান্ত কাজের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে যেন তীর্থযাত্রার মতো কঠিন হয়ে পড়েছে। রাশি রাশি ডকুমেন্টস উপস্থাপন ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিশাল ব্যালেন্স প্রদর্শন করেও আমাদের নাগরিকদের প্রায়ই ভিসা রিফিউজালের তিক্ত হতাশায় নিমজ্জিত হতে হয়। অথচ যে উগান্ডাকে সাধারণ মানুষ সবসময় পিছিয়ে পড়া বা অনুন্নত মনে করত, সেই উগান্ডার সাধারণ নাগরিকেরা কোনো পূর্বানুমতি বা অগ্রিম ভিসা ছাড়াই স্রেফ প্লেনের টিকিট কেটে সিঙ্গাপুর, হংকং, মালয়েশিয়া কিংবা ফিলিপাইনের মতো সমৃদ্ধ দেশগুলোতে অন-অ্যারাইভাল ভিসার সুবিধা নিয়ে সরাসরি ভ্রমণ করতে পারেন। আন্তর্জাতিক মর্যাদা এবং ভিসামুক্ত চলাচলের দিক থেকে উগান্ডার পাসপোর্টের ওজন বাংলাদেশের চেয়ে বহুদূরে অবস্থিত।
পশ্চিমা গণমাধ্যমের নানাবিধ নেতিবাচক প্রচারণার কারণে আফ্রিকান সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে বহির্বিশ্বে এক ধরনের কৃত্রিম সংশয় কাজ করলেও, বাস্তবিক বিচারে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষায় উগান্ডা অনন্য এক উদাহরণ স্থাপন করেছে। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে পথে-প্রান্তরে বা রাজপথে নারীদের পোশাক বা চলাফেরা নিয়ে যেভাবে প্রতিনিয়ত নীতিপুলিশি, অবান্তর হেনস্তা বা কটূক্তির মুখে পড়তে হয়, উগান্ডার উদার সমাজে এমন দৃশ্য সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সেখানে ধর্মের দোহাই দিয়ে কোনো গোষ্ঠীর পক্ষে কাউকে জনসমক্ষে নাজেহাল বা অপদস্থ করার ন্যূনতম সুযোগ বা অধিকার প্রদান করা হয় না। নিজস্ব জীবনচর্চায় ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধকে মর্যাদা দেওয়া এবং অপরের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করার ক্ষেত্রে উগান্ডার সমাজব্যবস্থা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও পরিশীলিত।
বৈশ্বিক মানদণ্ডে কোনো সমাজের মূল্যায়নে মেগা প্রজেক্ট বা কেবল সুবিশাল কংক্রিটের ব্রিজের চেয়েও মানুষের সার্বিক সুখের সূচক, মানসিক প্রশান্তি, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই (FDI) এবং সামাজিক মর্যাদাকেই প্রধান বিবেচ্য হিসেবে ধরা হয়। বিশ্ব সুখ সূচক (World Happiness Index)-এ বাংলাদেশ যেখানে একদম তলানির দিকে অবস্থান করছে, সেখানে উগান্ডার মানুষের প্রতিদিনকার মানসিক প্রশান্তি ও জীবনযাত্রার মান অনেক বেশি সুসংহত। ২০ কোটি জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে যখন নানা কসরত করতে হয় এবং বছরে প্রায় ১.৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি এফডিআই আনতেই সীমাহীন পথ পেরোতে হয়, সেখানে মাত্র ৫ কোটি মানুষের দেশ উগান্ডা তাদের সুষম অর্থনৈতিক নীতি, মুক্ত বাণিজ্য এবং পরিবেশবান্ধব ইকো-ট্যুরিজমের সুবাদে গত ২০২৩ সালেই ৩.৪ বিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ নিজেদের দেশে নিয়ে এসেছে।
একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে ৫০ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রম করার পরও যখন কাঙ্ক্ষিত সূচকগুলোতে আমরা আশাব্যঞ্জক উন্নতি দেখতে ব্যর্থ হচ্ছি, তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের এই আত্মতুষ্টির মুখোশটি খুলে ফেলা অত্যন্ত প্রয়োজন। রাজনৈতিক বৈষম্য বা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে গিয়ে যে দেশকে নিয়ে বছরের পর বছর সস্তা ট্রল বানিয়ে বিনোদন খোঁজা হয়েছে, সেই উগান্ডা আজ নিভৃতেই নীরবে গড়ে তুলেছে এক অভাবনীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লব। মুজাহিদুল ইসলাম জাহিদের মতো তরুণেরা আজ বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে হীনমন্যতা ও অলস ট্রলের সংস্কৃতি পরিহার করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে প্রতিকূল পরিবেশেও ইতিহাস সৃষ্টি করা সম্ভব। আমরা যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ ভুল ও খামতিগুলো শুধরে নিতে দ্রুত বাস্তবমুখী ভূমিকা পালন করতে না পারি, তবে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বমঞ্চে অন্য কোনো জাতি নিজেদের সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক ব্যর্থতাকে তুলে ধরতে রূপক ট্রল হিসেবে বাংলাদেশ নামটি ব্যবহার শুরু করবে।
তথ্যসূত্র: ঢাকা পেপার্স