শিরোনামঃ
আমাদের মোহিত কামাল ভাই জেলা পরিষদের প্রশাসক-চেয়ারম্যানদের রাষ্ট্রীয় প্রটোকল নিশ্চিতে ডিসিদের নির্দেশ পাবনায় চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু বরিশালের বাকেরগঞ্জে বোমাসদৃশ বস্তুর বিস্ফোরণে দগ্ধ ৩ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব এককভাবে কারও নয়: রিজভী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের নির্দেশনার অপেক্ষায় ইসি: ইসি সচিব প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানেই উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকা: প্রতিমন্ত্রী জুলাইয়ে রেকর্ড বৃষ্টির পর আগস্টে তাপপ্রবাহ ও বন্যার ঝুঁকি খেলাধুলার মাধ্যমে মাদক-অপরাধ থেকে দূরে থাকবে তরুণরা: ত্রাণমন্ত্রী ওজন কমাতে কোন ব্যায়ামে মিলবে বেশি উপকার
মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪৬ পূর্বাহ্ন

ব্যাংকের বাইরে ক্যাশ টাকার রেকর্ড প্রবৃদ্ধি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৯ বার
প্রকাশ: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোর দ্রুত বিকাশ এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) বহুল ব্যবহারের পরও দেশে নগদ কাগুজে টাকার ব্যবহার না কমে উল্টো সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। ব্যাংকিং খাতের বাইরে সাধারণ মানুষের হাত ও সিন্দুকে জমা থাকা কাগুজে টাকার পরিমাণ আশঙ্কাজনক গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস শেষে ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। তবে পরবর্তী দুই মাসে অর্থাৎ জুন ও জুলাইয়ে ইসলামী ব্যাংকের অস্থিরতাসহ ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন ইস্যুতে নগদ অর্থ ব্যাংকের বাইরে চলে যাওয়ার গতি আরও ত্বরান্বিত হয়, যা বর্তমানে ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড সীমানাকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

প্রযুক্তিভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থার প্র অভূতপূর্ব অগ্রগতি সত্ত্বেও এই বিপুল পরিমাণ কাগুজে টাকা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতেই হাতবদল হচ্ছে। বর্তমানে ঘরে বসেই অ্যাপস বা কার্ডের মাধ্যমে বিল পরিশোধ থেকে শুরু করে যাবতীয় আর্থিক লেনদেন সচল রয়েছে। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের এই অতিমাত্রায় নগদনির্ভরতা সামগ্রিক অর্থনীতি ও ব্যাংকিং কাঠামোর একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে সামনে আসছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি (ইনফরমাল ইকোনমি), দীর্ঘদিনের অনাস্থা, অনিয়ম, অন্যায্য কর ফাঁকির প্রবণতা এবং সাম্প্রতিক সময়ের চড়া মূল্যস্ফীতি মানুষকে ব্যাংক ছেড়ে হাতে টাকা জমিয়ে রাখতে উৎসাহিত করছে। বিপুল অর্থ ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের বাইরে অলস পড়ে থাকার ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবাহে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে, যা উৎপাদনশীল খাতে প্রয়োজনীয় ঋণ বিতরণে বড় ধরণের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

বেসরকারি নীতি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের অন্যতম সদস্য ড. ফাহমিদা খাতুন বিষয়টিকে এক পরস্পরবিরোধী অর্থনৈতিক বার্তা বলে উল্লেখ করেছেন। সাধারণত পেমেন্ট ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হলে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার ছোট হয়ে আসার কথা। কিন্তু দেশে উল্টো চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে; যেখানে ব্যাংকে আমানত প্রবৃদ্ধির হার ভালো থাকার পাশাপাশি ব্যাংকের বাইরের নগদ টাকাও রেকর্ডের পর রেকর্ড ভাঙছে। কোনো অর্থনীতিতে দুর্নীতি, অবৈধ কালো টাকার প্রবাহ এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা সংকট তৈরি হলেই কেবল নগদ টাকার প্রচলন বৃদ্ধি পায়। এই টাকার উৎস বৈধ কি না কিংবা সরকার নির্ধারিত কর প্রদান করা হয়েছে কি না, তা অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।

পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১১ সালে দেশে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকার পরিমাণ ছিল মাত্র ৫৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২১ সালের জুনে তা দাঁড়ায় ২ লাখ ৯ হাজার ৫১৭ কোটি টাকায় এবং ২০২৩ সালে তা পৌনে তিন লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করে। তবে সাম্প্রতিক জুন মাসে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-র শীর্ষ পদে রদবদল ও পরিচালনা পর্ষদ কেন্দ্রিক উত্তেজনার ফলে আমানতকারীদের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়, যা থেকে এক মাসের ব্যবধানেই ব্যাংকটি থেকে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার আমানত প্রত্যাহার করা হয়। এর প্রভাব পড়ে পুরো ব্যাংকিং খাতে। ইসলামী ব্যাংকের এই অস্থিরতার জের ধরে অন্যান্য ব্যাংক থেকেও আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, যা নগদ টাকার স্থিতিকে জুলাই শেষে ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকায় রূপ দেয়। পরবর্তীতে ব্যাংকে প্রাশাসক নিয়োগ এবং তারল্য সহায়তা প্রদানের পর বর্তমানে লেনদেন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।

বর্তমান ব্যাংকিং খাতের এই বিপুল ক্যাশ প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে বছরের পর বছর ধরে চলা অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ মূল্যস্ফীতি। সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিনের মতে, মূল্যস্ফীতির প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবামূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে সাধারণ কেনাকাটা সম্পন্ন করতেই মানুষকে আগের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ক্যাশ বহন করতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত টাকা মূলত খুচরা বাজারেই হাতে হাতে ঘুরছে। সাধারণ মানুষের এই বাজারনির্ভরতা ও দুর্বল ব্যাংকগুলো থেকে টাকা তুলে ঘরে রাখার মানসিকতাই ক্যাশ বাড়ার অন্যতম কারণ। তাঁর মতে, ডিজিটাল পেমেন্ট চ্যানেলগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে দেশের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত “বিকাশ”-এর মতো শক্তিশালী মাধ্যমকে সম্প্রসারিত করতে হবে অথবা সমমানের আরও কয়েকটি পেমেন্ট ব্র্যান্ড বাজারে আনতে হবে।

এমএফএস প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে এবং ব্যাংকগুলোর অ্যাপস ও ডিজিটাল পেমেন্ট মাধ্যমেও সমান অঙ্কের লেনদেন হলেও, কেনাকাটার পয়েন্টে কিউআর কোড (QR Code) বা পয়েন্ট অব সেলস (POS) প্রযুক্তির অপ্রতুলতা সাধারণ মানুষকে নগদ টাকায় কেনাকাটা করতে বাধ্য করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে সব ব্যবসায়ীকে ‘বাংলা কিউআর’-এর আওতায় আনার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও কাগুজে টাকার এমন প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য এক বিরাট দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা দ্রুত ও আধুনিক হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ কেন ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

অর্থনীতিকে দ্রুত গতিশীল ও স্বচ্ছ করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ফিরিয়ে আনা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বিকল্প নেই। ব্যাংক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের হারানো আস্থা পুনরায় ফেরত আনতে হলে পরিচালনা পর্ষদের জালিয়াতি বন্ধ, দুর্বল ব্যাংক সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি যদি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং দেশের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ক্যাশলেস বা ডিজিটাল লেনদেনের সুদৃঢ় অবকাঠামো নিশ্চিত করা যায়, তবেই সাধারণ মানুষ টাকা ঘরে না রেখে পুনরায় ব্যাংকিং ধারায় ফিরিয়ে আনবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির টেকসই ভিত্তিকে সুসংগঠিত করবে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...