চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সারা দেশের ৩১২ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। সোমবার, ১০ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে যে, দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের অধীনে থাকা মোট ৩১২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। অর্থাৎ, এসব প্রতিষ্ঠানের পাসের হার শূন্য শতাংশ। সকাল ১০টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে ফল প্রকাশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী ডক্টর আ ন ম এহছানুল হক মিলন। দেশের সকল সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের উপস্থিতিতে ফলাফল হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে এই বিষাদময় চিত্রটি সর্বসমক্ষে উন্মোচিত হয়, যা তৃণমূলের শিক্ষা মান নিয়ে নীতি-নির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে।
উন্মোচিত পরিসংখ্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শূন্য পাসের গ্লানি টানা প্রতিষ্ঠানের সিংহভাগই মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত। মোট ৩১২টি শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে করুণ অবস্থায় রয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, যার অধীনস্থ ২২৬টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এর পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৯টি প্রতিষ্ঠান এবং দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনস্থ ৫৭টি স্কুলে শতভাগ ফেলের ঘটনা ঘটেছে। শুধু দেশের ভেতরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নয়, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের একটি কেন্দ্র থেকেও কোনো শিক্ষার্থী পাসের খাতা খুলতে সক্ষম হয়নি। ধর্মীয় ও কারিগরি শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারায় এমন ভয়াবহ ফলাফলকে শিক্ষাবিদরা প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা ও তদারকির অভাব হিসেবেই দেখছেন।
চলতি বছর সারাদেশ থেকে মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী তাদের চূড়ান্ত পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছিল। এই বিশালসংখ্যক পরীক্ষার্থীর মূল ধারায় সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ছিল ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন পরীক্ষার্থী। অন্য ধারার মধ্যে মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করেছিল ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও সমমানের ভোকেশনাল পরীক্ষায় ১ লাখ ৩৪,৬৬০ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধিত ছিল। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ সত্ত্বেও তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠানের শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া নিশ্চিত করে যে, কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে পাঠদানের কোনো নূন্যতম পরিবেশ বা গুণগত মান রক্ষিত হচ্ছে না।
শিক্ষা খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বছরের পর বছর ধরে অনুদান বা সরকারি সুবিধার আশায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন ও মানহীন প্রতিষ্ঠানগুলোই মূলত ফলাফলে এমন ভরাডুবি ডেকে আনছে। শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং যথাযথ তদারকি না থাকা সত্ত্বেও এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হলেও পরীক্ষার হলে তারা ব্যর্থতার চরম পরিচয় দিচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী জানান, যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি, সেগুলোর কারণ খতিয়ে দেখতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। জাতীয় শিক্ষানীতি ও গুণগতমান নিশ্চিত করতে এসব ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।