শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার পদ্মা নদীবেষ্টিত জনপদ বিলাসপুর ইউনিয়ন যেন এক অনন্ত সংঘাতের উপত্যকা। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে পদ্মা নদীর কোলঘেঁষা এই ইউনিয়নটির এক প্রান্তে মুন্সিগঞ্জ এবং অন্য প্রান্তে চাঁদপুরের জলসীমানা। নদীমাতৃক এই উর্বর ভূখণ্ডে প্রকৃতি যেখানে শান্ত হওয়ার কথা ছিল, সেখানে চার দশক ধরে প্রতিনিয়ত বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বারুদের ঝাঁজালো গন্ধ। স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জয়-পরাজয়, নদীতে জেগে ওঠা নতুন চরের জমি দখল, বালু উত্তোলনের মহাল নিয়ন্ত্রণ এবং পদ্মার বিস্তৃত নৌপথে মাছ শিকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা—এসবকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে একের পর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। আর এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রধান ও সবচেয়ে প্রাণঘাতী হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন হাতবোমা বা ককটেল। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, গত চল্লিশ বছরে এই অঞ্চলে হাতবোমা বিস্ফোরণ এবং আধিপত্যের লড়াইয়ে অন্তত ১১ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে এবং বোমার স্প্লিন্টারে ক্ষতবিক্ষত হয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে কমপক্ষে ২৫ জন মানুষকে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতেও এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে একসাথে তিন তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। কিন্তু একের পর এক প্রাণহানির পরও এই অঞ্চলে বোমার তাণ্ডব এতটুকু কমেনি। বসতবাড়ির সেপটিক ট্যাংক, বাথরুমের ছাদ, ফসলি মাঠ, কবরস্থান কিংবা ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে প্রায় নিয়মিত বিরতিতেই উদ্ধার হচ্ছে অবিস্ফোরিত বোমা অথবা ঘটছে আকস্মিক বিস্ফোরণ। সচেতন মহলের মতে, বোমা তৈরিতে বিপুল অঙ্কের কালো টাকার জোগান, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়, নদীপথের দুর্গমতাকে কাজে লাগিয়ে কাঁচামাল পরিবহন এবং মামলা দায়েরের পর তদন্তে পুলিশের ধীরগতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই বিলাসপুরে অস্ত্রের এই বিস্তার থামানো যাচ্ছে না। ফলে প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে নিরীহ গ্রামবাসীকে।
এই অঞ্চলে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের গোড়াপত্তন হয়েছিল প্রায় চার দশক আগে। তখন বিলাসপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মাদবর ওরফে মেছের মাস্টার এবং আরেক সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ার মাদবরের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দিয়ে এই বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় মেছের মাস্টার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করার পর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে মারা যান। এরপর তার রাজনৈতিক দলের হাল ধরেন তারই চাচাতো ভাই সোবহান মাস্টার। অন্যদিকে আনোয়ার মাদবরের বলয়ের নেতৃত্ব চলে যায় বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য কুদ্দুস বেপারীর হাতে। পরবর্তী সময়ে সোবহান মাস্টারের পক্ষে নেতৃত্বে আসেন পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা জলিল মাদবর। সময়ের ব্যবধানে নেতৃত্বের হাতবদল হলেও সংঘাতের তীব্রতা বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং তা আরও বেশি আধুনিক ও প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করেছে।
বর্তমানে এই দুই প্রভাবশালী নেতার অধীনে গড়ে উঠেছে দুটি পৃথক সশস্ত্র বাহিনী। এই বাহিনীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বোমা তৈরি ও নিক্ষেপে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত একাধিক দল। যারা শুধু সংঘাতের সময়েই সক্রিয় হয় না, বরং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রতিপক্ষের এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি, লুটপাট এবং জমি দখলের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত অংশ নেয়। সংঘাতের এই সংস্কৃতির কারণে বিলাসপুর এখন কেবল নিজের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই; এখান থেকে তৈরি হওয়া হাতবোমা পার্শ্ববর্তী একাধিক ইউনিয়ন ও জেলার সীমান্তবর্তী অপরাধী চক্রের কাছে নিয়মিত বিক্রি ও সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিলাসপুরে হাতবোমার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে কৌশলগত কিছু পরিবর্তন কাজ করেছে। প্রায় দুই দশক আগেও এই চরাঞ্চলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ব্যবহৃত হতো দেশীয় টেঁটা, ঢাল, সরকি, বল্লম ও রামদার মতো সনাতনী অস্ত্র। কিন্তু গত বিশ-বাইশ বছরে সেই ধারা পুরোপুরি বদলে গিয়ে দখল নিয়েছে হাতবোমা। কারণ দেশীয় ধারালো অস্ত্রে সরাসরি মুখোমুখি লড়াইয়ে বিপুল জনবলের প্রয়োজন হয় এবং এতে নিজেদের পক্ষের বহু মানুষ সরাসরি আহত বা নিহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে হাতবোমার ক্ষেত্রে সামান্য লোকবল নিয়ে দূর থেকেই প্রতিপক্ষের দিকে নিক্ষেপ করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করা যায় এবং খুব সহজেই এলাকায় ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষকে হটিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। ফলে কম লোকবলে বেশি আতঙ্ক ছড়াতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছে বোমাই প্রধান পছন্দের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
পদ্মার চরে গড়ে ওঠা বোমা তৈরির এই অবৈধ শিল্পের পেছনে কাজ করছে একদল স্থানীয় তরুণ কারিগর। সম্প্রতি এই প্রতিবেদক সরেজমিনে বিলাসপুরের মুলাই বেপারী কান্দিসহ কয়েকটি দুর্গম এলাকায় গিয়ে কথা বলেন বিশ থেকে পঁচিশ বছর বয়সী কয়েকজন বোমা তৈরির কারিগরের সাথে। তারা মূলত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই বড়দের কাজ দেখে দেখে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই বিস্ফোরক তৈরির বিদ্যা রপ্ত করেছেন। তাদের একজন জানান, বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান কাঁচামাল যেমন গানপাউডার বা বারুদ মূলত চাঁদপুর ও মুন্সিগঞ্জের নৌপথ ব্যবহার করে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় আনা হয়। এছাড়া কিছু রাসায়নিক উপাদান মাদারীপুর ও ঢাকা থেকে সড়কপথে বিভিন্ন কৌশলে চরাঞ্চলে প্রবেশ করানো হয়। পদ্মার জনমানবহীন দুর্গম চর, ঘন কলাবাগান কিংবা বসতবাড়ির পেছনের পরিত্যক্ত রান্নাঘরে বসে অত্যন্ত সংগোপনে এই বোমাগুলো বাঁধা হয়।
বোমাগুলোর বিধ্বংসী ক্ষমতা বাড়াতে এর ভেতরে গানপাউডারের সাথে মেশানো হয় ছোট ছোট লোহার তারকাটা, নৌকার পাতাম, কাচের মার্বেল এবং উচ্চমাত্রার বলিবন্দ বারুদ। ফলে বিস্ফোরণের সাথে সাথে এই ধারালো ধাতব কণাগুলো গুলির মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের শরীরকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ওই কারিগরের ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র এক কেজি বারুদ দিয়ে অন্তত দশটি শক্তিশালী হাতবোমা তৈরি করা যায় এবং একজন দক্ষ কারিগর এক ঘণ্টায় প্রায় একশটি বোমা প্রস্তুত করতে পারেন। একেকটি বোমা তৈরির জন্য কারিগরদের দেওয়া হয় মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক। দিনভর কাজ করলে একেকজন কারিগর বিপুল অঙ্কের অর্থ উপার্জন করতে পারেন। তবে এই কাজের মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত ভয়াবহ। নিজের চোখের সামনে সহকর্মীর অকাল মৃত্যু দেখে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন এমন এক তরুণ জানান, অতিরিক্ত অর্থের লোভে এই পেশায় জড়িয়ে অনেকেই নিজের প্রাণ হারিয়েছেন কিংবা স্থায়ীভাবে হাত-চোখ খুইয়ে পঙ্গু হয়েছেন।
হাতবোমার এই নির্মম তাণ্ডবের ক্ষতচিহ্ন বহন করে বেঁচে আছেন বহু স্থানীয় মানুষ। মেহের আলী মাদবর কান্দি এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মজিবুর রহমান মোল্লা তাদেরই একজন। ২০১২ সালের এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সময় তার সামনে সরাসরি একটি হাতবোমা এসে বিস্ফোরিত হয়। নিজের মুখ ও মাথা রক্ষা করতে গিয়ে তার একটি হাতের কব্জি উড়ে যায়। আজ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি সেই পঙ্গুত্বের অসহ্য শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছেন। তিনি আক্ষেপ করে জানান, পুরো ইউনিয়নে তার মতো অন্তত সাত-আটজন রয়েছেন যাদের বোমায় হাত বা পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং প্রায় পঁচিশ জনের বেশি মানুষ শরীরের নানা অংশে স্প্লিন্টার নিয়ে পঙ্গু জীবনযাপন করছেন। তার মতে, বাইরে থেকে শক্তিশালী মহল যদি অর্থের জোগান দেওয়া বন্ধ না করে এবং প্রশাসন যদি কঠোর না হয়, তবে এই ধ্বংসযজ্ঞ কখনোই থামবে না।
চিকিৎসকদের মতে, স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব হাতবোমা অত্যন্ত অনিরাপদ ও মারাত্মক ক্ষতিকর। জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা জানান, বিস্ফোরণের সময় নির্গত স্প্লিন্টার মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে মারাত্মক অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হাতের আঙুল বা কব্জি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং চোখের দৃষ্টিশক্তি চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। যেসব স্প্লিন্টার মাংসপেশি বা হাড়ের গভীরে ঢুকে যায়, সেগুলো অস্ত্রোপচার করে বের করাও অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে সারা জীবন সেই বিষাক্ত ধাতব টুকরো শরীরে নিয়ে রোগীদের অবর্ণনীয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভুগতে হয়। উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত আইসিইউ ও আধুনিক সার্জারি সুবিধা না থাকায় মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত ঢাকায় স্থানান্তর করতে হয়, যার কারণে পথিমধ্যেই অনেকের মৃত্যু ঘটে।
বোমা সংঘাতের প্রভাব এখন কেবল বিলাসপুরের সীমানায় আটকে নেই, বরং এর বারুদের বিস্তার ছড়িয়ে পড়েছে পাশের সেনেরচর, বিকেনগর ও মূলনা ইউনিয়নের মতো সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও। গত মে মাসে সেনেরচর ইউনিয়নের মরিচক্ষেতে কুড়িয়ে পাওয়া বোমা নিয়ে খেলতে গিয়ে দশ বছরের এক নিষ্পাপ শিশুর দুই হাত ঝলসে যায়। জুলাই মাসে বিকেনগরের একটি বসতবাড়ির বাথরুমের ছাদে রাখা বোমা বিস্ফোরিত হয়ে পুরো ভবন ধসে পড়ার ঘটনা ঘটে। এমনকি আগস্টের শুরুতে মূলনা ইউনিয়নের লাউখোলা এলাকায় আধিপত্যের জেরে হওয়া সংঘর্ষে হাতবোমার আঘাতে প্রাণ হারান এক ব্যক্তি এবং আহত হন আরও অন্তত দশজন। স্থানীয়দের অভিযোগ, পার্শ্ববর্তী যেকোনো ইউনিয়নে বিরোধ সৃষ্টি হলেই বিলাসপুর থেকে ভাড়াটে বোমাবাজ ও তৈরি বোমা সংগ্রহ করা হয়। ফলে পুরো জাজিরা উপজেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা এখন এই একটি ইউনিয়নের ওপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, বিগত সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ার কারণে এই অপরাধী চক্রগুলো বারবার পার পেয়ে গেছে। সাবেক সংসদ সদস্যদের আশীর্বাদপুষ্ট থাকায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমানে শীর্ষ দুই নেতা কুদ্দুস বেপারী ও জলিল মাদবর কারাগারে থাকলেও তাদের অনুপস্থিতিতে পরিবারের অন্য সদস্যরা এবং দ্বিতীয় স্তরের ক্যাডাররা পুরো নেটওয়ার্ক সচল রেখেছে। কুদ্দুস বেপারীর পক্ষে তার ভাই ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা এবং জলিল মাদবরের পক্ষে তার ঘনিষ্ঠ অনুসারীরা মাঠপর্যায়ে এই সংঘাতের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। ফলে মূল হোতারা জেলে থাকলেও চরে বোমাবাজি ও দখলদারিত্বের ধারাবাহিকতা পুরোপুরি বজায় রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিলাসপুরে বোমা তৈরির বিপুল ব্যয়ের পেছনে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ এবং স্থানীয় চাঁদাবাজির বড় ভূমিকা রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যে বেশ কয়েকজন অর্থ জোগানদাতার নাম উঠে এসেছে, যার মধ্যে ইতালি প্রবাসী এক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও তদন্ত চলছে। যদিও অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বিদেশে অবস্থান করায় এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের দাবি করছেন। তবে স্থানীয় নিরীহ পরিবারগুলোর দাবি, বাইরে থেকে আসা বিপুল অঙ্কের কালো টাকাই তাদের অল্প বয়সী সন্তানদের বিপথগামী করছে এবং তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মরণাস্ত্র।
পুলিশের তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা এবং আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতিও এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে। জেলা পুলিশের তথ্যমতে, গত চার বছরে এই অঞ্চলে হত্যা, বিস্ফোরক ও মারামারির ঘটনায় ৬৭টি মামলা দায়ের হলেও তার বেশিরভাগই বছরের পর বছর ধরে তদন্তের পর্যায়ে ঝুলে রয়েছে। যে কয়েকটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, সেগুলোতেও আদালতে সাক্ষীদের নিয়মিত হাজির না হওয়ার কারণে বিচার নিষ্পত্তি হচ্ছে না। ফলে আসামিরা সহজেই জামিন পেয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এমনকি নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করতে গেলে স্থানীয় থানায় নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় এবং উল্টো নিরীহ স্বজনদের ফাঁসিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গ্রামবাসীর অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পদ্মা-মেঘনার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের ভৌগোলিক জটিলতা এবং চলাচলের দুর্গমতার কারণে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, সম্প্রতি যেসব বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে তার অনেকগুলোই দীর্ঘদিন আগে লুকিয়ে রাখা বোমার মেয়াদ শেষ হয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে নিজে থেকেই ফাটছে। তবে অপরাধীদের গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
বিলাসপুরের সাধারণ জনগণের একমাত্র দাবি, এই চিরস্থায়ী আতঙ্কের অবসান। কেবল সাময়িক অভিযান বা পুলিশের রুটিন টহল দিয়ে এই চার দশকের গভীর ক্ষত নিরাময় সম্ভব নয়। চরাঞ্চলে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন, নৌপথে কাঁচামালের সরবরাহ বন্ধে কঠোর নজরদারি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নেপথ্যের গডফাদার ও অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনা এবং বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমেই কেবল বিলাসপুরকে ‘বোমার গ্রাম’ অপবাদ থেকে মুক্ত করে একটি শান্ত ও নিরাপদ জনপদে রূপান্তর করা সম্ভব।