শিরোনামঃ
বাংলাদেশকে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই : প্রধানমন্ত্রী আমির হামজার গাড়িবহরে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দাবি ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত করলেন প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ সংকট: প্রধানমন্ত্রীর ‘চ্যালেঞ্জ’ গ্রহণ করে হাসনাতের ৪ প্রস্তাব ইউরোপের বাজারে পোশাক বাণিজ্যে বড় ধাক্কা: ছয় মাসে আয় কমেছে ১৬ শতাংশের বেশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: মির্জা ফখরুল ও অলি আহমদের মনোনয়নপত্র বৈধ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয় বাংলাদেশের শেখ হাসিনাকে ফেরতসহ ৩ শর্তে ভারত সফর করবেন তারেক রহমান ইসরাইলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করা লেবাননের অধিকার: ইরান যেভাবে নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে ভারত
রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪৯ অপরাহ্ন

ঢাকার নতুন সমীকরণে দিল্লির কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাস: টানাপোড়েন ছাপিয়ে বাস্তববাদী সম্পর্কের পথে দুই প্রতিবেশী

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্কের পুনর্গঠন নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ চলছিল। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক এবং বৈঠকের পরপরই দূতের জরুরি দিল্লি যাত্রা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাৎ দুই দেশের মধ্যকার শীতলতা কাটিয়ে নতুন করে বোঝাপড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই দিনে ভারতীয় বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) প্রধান পরাগ জৈনের অনানুষ্ঠানিক ও উচ্চপর্যায়ের ঢাকা সফর এই কূটনৈতিক তৎপরতার গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এই দ্রুত কূটনৈতিক দৃশ্যপটের পটভূমি তৈরি হয়েছিল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বিতর্কিত সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে। ৫ আগস্ট দিল্লিতে একটি ক্লাবে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসার বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি বর্তমান প্রশাসনিক রূপরেখা নিয়ে নানা মন্তব্য করেন। ঢাকা বিষয়টি নিয়ে কঠোর কূটনৈতিক আপত্তি জানায় এবং স্পষ্ট করে দেয় যে, একজন পলাতক ও দণ্ডিত রাজনীতিবিদের এমন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত হানছে। তবে এই ইস্যুতে ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান ছিল বেশ সংযত ও ভারসাম্যপূর্ণ। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল পরিষ্কারভাবে জানান যে, ওই সংবাদ সম্মেলনটি একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছিল এবং বাংলাদেশ সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে সেখানে দেওয়া কোনো বক্তব্যের সাথে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা বা সমর্থন নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, গত দুই বছরের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সম্পর্কের টানাপোড়েন পেছনে ফেলে ভারত এখন বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে নতুন কূটনৈতিক পথরেখা তৈরি করতে চাইছে। অতীতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতার যে কৌশল দিল্লির বিরুদ্ধে সমালোচিত হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি ভারতকে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল কার্যকর সরকারের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ায় বাধ্য করেছে। বর্তমান নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সাথে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল কাজের সম্পর্ক গড়ে তোলাই এখন দিল্লির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তবে একই সাথে দিল্লি যে ভারতের মাটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অবস্থানের বিষয়ে হঠাৎ করে কোনো নাটকীয় বা দৃশ্যমান কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করবে না, তাও স্পষ্ট। যতক্ষণ পর্যন্ত এসব কর্মকাণ্ড ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকছে, ততক্ষণ ভারত সরকার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করছে না। এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব সত্ত্বেও আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশন এবং একটি আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক সফরের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। বিমসটেক জোটের বর্তমান চেয়ার হিসেবে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে তারেক রহমানের এই সফর আঞ্চলিক রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সফর ও কূটনৈতিক সমীকরণ নিয়ে গভীর মেরুকরণ ও আলোচনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য সমমনা দলগুলো শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে জুলাই-আগস্টের ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে অনড়। বিরোধীদের ভাষ্য, কোনো ধরনের দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকের আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে প্রত্যর্পণ করার বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া দরকার। অন্যদিকে রাজনৈতিক মহলে এই আলোচনাও রয়েছে যে, শেখ হাসিনা যদি স্বেচ্ছায় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দিয়ে দেশে আসেন, তা তাঁর জন্য রাজনৈতিক সুবিধার তৈরি করতে পারে; ফলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাশা করা হচ্ছে তাঁকে যেন আইনি প্রক্রিয়ায় প্রত্যর্পণের মাধ্যমে দেশে এনে বিচারাধীন করা হয়।
একই সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বহুমুখী কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও ভারতকে কিছুটা ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্কের উষ্ণতা এবং আঞ্চলিক পরাশক্তি চীনের সাথে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির প্রবণতা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। নিজের সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি প্রভাবশালীর অবস্থান ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে অবিলম্বে আস্থার সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ছাড়া ভারতের অন্য কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।
এই জটিল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকেও দেশের ভেতরের রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও জাতীয় স্বার্থের মাঝে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের তীব্র ভারতবিরোধী মনোভাব এবং ন্যায়বিচারের দীর্ঘ প্রতীক্ষাকে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে, তেমনি বৃহত্তম প্রতিবেশী দেশের সাথে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদী অববাহিকা সমস্যা, বাণিজ্য ঘাটতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে গঠনমূলক কাজের সম্পর্ক বজায় রাখাও অপরিহার্য। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অভিমত, দিল্লির সাথে সক্রিয় আলোচনার মাধ্যমেই বিচার ও প্রত্যর্পণের মতো আইনি দাবিগুলো আরও কার্যকরভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব।
সার্বিকভাবে স্পষ্ট যে, ঢাকা ও দিল্লির বর্তমান যোগাযোগ কেবল গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ব্যক্তির আনুগত্যের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্রীয় ও কৌশলগত স্বার্থের ভিত্তিতে যদি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সমমর্যাদার সম্পর্ক তৈরি করা যায়, তবে তা কেবল দুই দেশের সম্পর্কের বরফই গলাবে না, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে।

 

 

তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার


এ জাতীয় আরো খবর...