দেশের কৃষিখাতের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রায়ত্ত সার উৎপাদনকারী সাতটি কারখানার মধ্যে বর্তমানে ছয়টিই সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। তীব্র গ্যাস সংকট, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাব এবং বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দীর্ঘ দিন ধরে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় এই ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কেবল ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসি কারখানায় সীমিত পরিসরে উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব হয়েছে। এমতাবস্থায় আসন্ন আমন মৌসুমের জন্য প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ নিয়ে দেশের কৃষক সমাজ এবং কৃষি খাতের সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আমদানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই সাতটি সার কারখানার মোট দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ১০০ টন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই বিশাল সক্ষমতার সিংহভাগই অলস পড়ে আছে। গ্যাস সংকটের জাঁতাকলে পড়ে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে চট্টগ্রামের চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (সিইউএফএল) এবং যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানির উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। সিইউএফএলে দৈনিক এক হাজার থেকে বারোশ টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও কাঁচামালের অভাবে কারখানাটির বিশাল চত্বর এখন নিষ্প্রাণ। একইভাবে যমুনা সার কারখানায় গত বছরের নভেম্বর থেকে প্রায় বন্ধের দশা চলছে, যার ফলে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে রাষ্ট্র। এছাড়া আশুগঞ্জ সার কারখানা এবং অন্যান্য কয়েকটি কারখানায় গ্যাস ও ফসফরিক অ্যাসিডের মতো অতি প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন লাইন একেবারে স্থবির হয়ে গেছে।
উৎপাদন বন্ধ থাকার এই করুণ চিত্রের বিপরীতে সরকারি তরফ থেকে অবশ্য দেশজুড়ে সারের কোনো ঘাটতি নেই বলে বারবার দাবি করা হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সব ধরনের সারের মোট চাহিদা প্রায় ৬৭ লাখ ৭০ হাজার টন। এর মধ্যে ইউরিয়ার চাহিদা ২৬ লাখ লাখ টনের বেশি এবং ডিএপির চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ টন। সংশ্লিষ্ট সচিব দাবি করেছেন যে, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বর্তমানে গুদামগুলোতে সারের মজুত সন্তোষজনক রয়েছে। বিকল্প রুট ব্যবহার করে কাতার, সৌদি আরব, কানাডা ও রাশিয়া থেকে নতুন চালান আমদানির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মাঠপর্যায়ে সার বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য দেশের চৌষট্টি জেলায় বিশেষ ট্যাগ অফিসারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তবে সরকারি এই আশ্বাসের বাস্তব চিত্রের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার আকাশ-পাতাল তফাত দেখা যাচ্ছে। রংপুরের বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, আমন ধানের চারা রোপণের এই সংকটলগ্নে সার ডিলারদের দোকানে গেলে খালি হাতে ফিরে আসতে হচ্ছে। কোথাও ইউরিয়া পাওয়া গেলেও এমওপি বা টিএসপি সারের চরম সংকট রয়েছে। আবার খুচরা বাজারে গেলে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় করা হচ্ছে। বরেন্দ্র বা সেচনির্ভর জমিতে যখন সময়মতো সার ও পানি একসঙ্গে দেওয়া জরুরি, ঠিক সেই মুহূর্তে সারের এই কৃত্রিম বা বাস্তব ঘাটতি কৃষকদের চরম বিপাকে ফেলেছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা সরকারের এই আমদানিনির্ভর নীতির তীব্র সমালোচনা করে বলছেন, একসময়ে বিসিআইসির কারখানাগুলো দেশের মোট চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি ইউরিয়া সার নিজেই উৎপাদন করতে সক্ষম ছিল। অথচ বর্তমানে ভুল নীতি ও অবহেলার কারণে নিজস্ব সক্ষমতা কমিয়ে মাত্র ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা যখন যেকোনো মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে, ঠিক সেই ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খাতকে চাঙ্গা না করে আমদানির ওপর ভরসা করা অত্যন্ত আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। কারখানাগুলো শাটডাউন করে বিদেশ থেকে চড়া দামে সার আমদানির এই প্রবণতা কেবল রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপই সৃষ্টি করছে না, বরং সার সিন্ডিকেটগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে সামনের রবি মৌসুমেও এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই অবিলম্বে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোকে সচল করতে হবে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানির ওপর চাপ কমানো না গেলে দেশের কোটি কোটি কৃষকের মুখের অন্ন উৎপাদন অনিশ্চিত হয়ে পড়াসহ সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ব।