বাংলাদেশের সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ঘটনায় ৩৫ বছর পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের অপেক্ষায় দেশ। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা।
এবার প্রতিদ্বন্দিতা করছেন বিএনপি মনোনীত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অলি আহমদ।
স্বাধীন বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১৮ জন ২২ মেয়াদে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন, যাদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ছাড়াও ছিলেন অস্থায়ী ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন গঠিত প্রবাসী সরকারের রাষ্ট্রপতি করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতির পদে ছিলেন তিনি।
১৯৭২ সালে দেশে ফিরে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
তিন বছর পর ১৯৭৫ সালে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করে দেশে রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকার প্রবর্তন করা হয়। সে বছর ২৫ জানুয়ারি পুনরায় রাষ্ট্রপতি হন শেখ মুজিবুর রহমান। ফলে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম ও পঞ্চম রাষ্ট্রপতি।
একই বছরের ১৫ই অগাস্ট সপরিবারে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের পদে বহাল ছিলেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবুর রহমানের অবর্তমানে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি পর্যন্ত সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
এর আগে ১৯৬৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ২৫শে মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারের পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলে রাষ্ট্রপতির শূন্যস্থান পূরণ করেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তিনি ওই বছর ১২ই জানুয়ারি লন্ডন থেকে দেশে ফিরে এ দায়িত্ব বুঝে নেন এবং ১৯৭৩ সালের ১০ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে পুনঃনির্বাচিত হন।
তবে পদে থাকা অবস্থায় নানা বিষয়ে মতভেদ নিয়ে কেবল দুই বছরের মাথায় ১৯৭৩ সালের ২৪শে ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন তিনি।
আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্বে থাকা মুহম্মদুল্লাহ ১৯৭৪ সালের ২৭শে জানুয়ারি পর্যন্ত অর্থাৎ এক মাসের কিছু বেশি সময় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২৭ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিক শপথ নিয়ে ১৯৭৫ সালে ২৫শে জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
১৯৫০ সাল থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা মুহম্মদুল্লাহ পেশায় আইনজীবী ছিলেন। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি মুহম্মদুল্লাহর মেয়াদ শেষ হয়।
শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদীয় মন্ত্রী।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভায় তিনি বিদ্যুৎ, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরে বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানের পর ৬ নভেম্বর তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তিনি মোট ৮১ দিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন।
খন্দকার মোশতাক আহমেদের পর ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম।
বলা হয়, আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ছিলেন ‘পুতুল’ রাষ্ট্রপতি। কারণ তিনি রাষ্ট্রপতি হলেও তখন রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল কার্যত সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের হাতে।
পদে থাকার দেড় বছর পর ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি।
১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হন তৎকালীন সেনাপ্রধান এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ৩০শে মে একদল সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালের ৩০শে মে উপরাষ্ট্রপতি থেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি আবদুস সাত্তার। অন্তর্বর্তী দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বিতর্কিত এক নির্বাচনে ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে ২০শে নভেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
এর চার মাস পর ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
আবদুস সাত্তারকে অপসারণের তিনদিন পর ২৭শে মার্চ বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহ্সান উদ্দীন চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন। তবে নয় মাস পর ১৯৮৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর স্বেচ্ছায় ক্ষমতা থেকে সরে যান তিনি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো সামরিক শাসন জারি করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৬ সালের ২৩শে অক্টোবর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন তিনি।
১৯৮৬ সালে বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করে আবারও তিনি রাষ্ট্রপতি হন এবং শেষে প্রবল গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ।
পরে সব বিরোধী দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ একটি ‘নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক’ সরকার গঠন করেন, যার একমাত্র দায়িত্ব ছিল তিন মাসের মধ্যে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা।
দায়িত্ব শেষে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে সরে যান।
পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবারও রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে ২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নেন তিনি। এতে ১২ ও ১৪ তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন সাহাবুদ্দিন আহমদ।
বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ বিদায় নেওয়ার পরে রাষ্ট্রপতি হন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বরিশাল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭৯-৮০ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় পাটমন্ত্রী এবং ১৯৮১-৮২ সালে বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদে ছিলেন।
নিজের মেয়াদ পূর্ণ করে ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর বিদায় নেন তিনি।
বাংলাদেশের ১৫তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর শপথ নেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।
জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়া- দুই সরকারের সময়ই তিনি মন্ত্রী ছিলেন এবং বিভিন্ন সময় স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
তবে বিএনপি সংসদে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা আনায় মাত্র সাত মাসের মাথায় ২০০২ সালের ২১শে জুন পদত্যাগ করেন তিনি।
একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ২১শে জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন স্পিকার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।
বিভিন্ন মেয়াদে মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার পররাষ্ট্র, শিক্ষা, গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন ইয়াজউদ্দিন আহমদ। উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্বও নেন।
পরে সংসদ নির্বাচন নিয়ে অব্যাহত রাজনৈতিক অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালের প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়লেও রাষ্ট্রপতি পদে বহাল ছিলেন তিনি।
ফলে সার্বিক পরিস্থিতিতে পদের মেয়াদ শেষ হবার পরও আরও দুই বছর অর্থাৎ ২০০৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান মো. জিল্লুর রহমান।
তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং ২০০৭ সালে শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হলে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৩ সালের ২০শে মার্চ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মো. জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি পদে বহাল ছিলেন।
বাংলাদেশে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন মো. আবদুল হামিদ। জিল্লুর রহমানের অসুস্থাবস্থায় ২০১৩ সালের ১৩ই মার্চ স্পিকার থেকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকারে থাকাকালীন ২০শে মার্চ থেকে ২৩শে এপ্রিল পর্যন্ত অস্থায়ী এবং একই বছরের ২৪শে এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের ২৩শে এপ্রিল পর্যন্ত দুই মেয়াদে পদে বহাল ছিলেন তিনি।
সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ দুই মেয়াদের দায়িত্ব পালন শেষে মো. আবদুল হামিদের পদত্যাগের পর ২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হন মো. সাহাবুদ্দিন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের কয়েক মাস পর্যন্ত পদটিতে বহাল ছিলেন তিনি। তিনটি ভিন্ন সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন তিনি।
পরে শারীরিক জটিলতার কারণ দেখিয়ে ২০২৬ সালের ২৪শে জুলাই পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদের দায়িত্ব পালন করছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ