বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:২২ অপরাহ্ন

বাজারে সিন্ডিকেটের রাজত্ব : টানা দুই বছর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি প্রতিযোগিতা কমিশন

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬

দেশের মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সুষম প্রতিযোগিতা বজায় রাখা, সিন্ডিকেট বা একচেটিয়া ব্যবসা রোধ এবং প্রতিযোগিতাবিরোধী যেকোনো অশুভ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার মূল দায়িত্ব যার কাঁধে, সেই বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন নিজেই এখন গভীর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংকটে পড়েছে। প্রতিযোগিতা আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বার্ষিক প্রতিবেদন জনসমক্ষে বা রাষ্ট্রে পেশ করার কথা থাকলেও বিগত দুটি অর্থবছরের কোনো প্রতিবেদনই প্রকাশ করা হয়নি। কমিশনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রতিবেদনটি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কোনো দাপ্তরিক মূল্যায়ন বা প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের এমন দীর্ঘমেয়াদি গোপনীয়তা ও দায়িত্বহীনতা বাজার ব্যবস্থাপনাকে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
আইনের কঠোর বিধান অনুযায়ী, প্রতিটি অর্থবছর শেষ হওয়ার পর পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমিশনকে তাদের বার্ষিক কার্যাবলির বিস্তারিত বিবরণ সংবলিত প্রতিবেদন মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার কথা রয়েছে, যা পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নির্ধারিত সেই সময়সীমা অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। অথচ কমিশনের ওয়েবসাইট কিংবা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এসব প্রতিবেদনের কোনো অস্তিত্ব নেই। কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা বা রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে নয়, একটি রেগুলেটরি বডি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বচ্ছতা, আর্থিক হিসাব, গৃহীত তদন্ত এবং বাজার সমীক্ষার সামগ্রিক চিত্র ফুটিয়ে তোলার প্রধান দলিল হলো এই বার্ষিক প্রতিবেদন। গত দুই বছর ধরে এই নথিপত্রগুলো জনসাধারণের চোখের অন্তরালে থাকায় সাধারণ ভোক্তারা কখনোই জানতে পারছেন না যে কমিশন আসলেই বাজারে কোন্ কোন্ অনিয়ম বা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
প্রতিবেদনের এই দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের বিষয়ে প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান এ এইচ এম আহসান অবশ্য দাবি করেছেন যে, প্রতিবেদনগুলো প্রকাশের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে এবং খুব দ্রুতই সেগুলো জনসমক্ষে আনা হবে। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রতিবেদন নতুন আঙ্গিকে ঢেলে সাজানোর কাজ এবং তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের আকস্মিক কর্মস্থল পরিবর্তনের কারণেই মূলত এই অপ্রত্যাশিত বিলম্ব ঘটেছে। তিনি আরও জানান যে, ২০২৩-‍২৪ অর্থবছরের খসড়া ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত হয়েছে এবং পরবর্তী অর্থবছরের কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে কমিশনের এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ধীরগতিকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে নারাজ সচেতন মহল ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো। তাদের মতে, যখন দেশের সাধারণ মানুষ চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে ডিম ও কাঁচাবাজারের সিন্ডিকেটের কারণে প্রতিনিয়ত চরম আর্থিক নাভিশ্বাসের মুখে পড়ছে, তখন বাজারের অসাধু চক্রকে দমন করার দায়িত্বে থাকা সংস্থার এমন নীরবতা জনস্বার্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
বাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, প্রতিযোগিতা কমিশনের মূল কাজ কেবল কিছু অভিযোগ জমা নিয়ে আধা-বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা নয়; বরং বাজারে প্রতিযোগিতার প্রতিবন্ধকতাগুলো কঠোরহস্তে দূর করা এবং ব্যবসার ক্ষেত্রে সবার জন্য সমতল মাঠ তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারগুলো হাতে গোনা মাত্র চার-পাঁচটি প্রভাবশালী কোম্পানির মুঠোয় বন্দি রয়েছে। এই সিন্ডিকেটগুলো যখন ইচ্ছা তখনই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে, অথচ প্রতিযোগিতা কমিশনকে কখনোই এই অলিগার্কদের বিরুদ্ধে স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় না। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ক্যাবের পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়েছে যে, বর্তমান কমিশনের নিষ্ক্রিয়তার কারণে ভোক্তারা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন এবং বাধ্য হয়েই ক্যাব থেকে সম্পূর্ণ কমিশনটি পুনর্গঠনের জন্য মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে বলছেন, একটি স্বাধীন সংস্থাকে যদি জনগণের করের টাকায় টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে তাকে অবশ্যই তার কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। তারা কোন বাজারে কী ধরনের একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙল, কতটি মামলা নিষ্পত্তি করল এবং কোন কোম্পানির বিরুদ্ধে কী শাস্তি দিল—তার পরিষ্কার হিসাব জনগণের সামনে থাকা উচিত। বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের এই লাগাতার ব্যর্থতা কেবল আইনি লঙ্ঘনই নয়, এটি বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণহীনতার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নিজেরাই আইনি বাধ্যবাধকতা লংঘন করে আড়ালে চলে যায়, তবে দেশের সাধারণ ভোক্তা সমাজ কার ওপর ভরসা করে বেঁচে থাকবে—সেই প্রশ্ন আজ চতুর্দিকে জোরালো হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


এ জাতীয় আরো খবর...