দেশের জ্বালানি খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় এক গভীর ও উদ্বেগজনক সংকট দানা বেঁধেছে। স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক দুই হাজার ছয়শ ষাট মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও, বর্তমানে তা হ্রাসের কারণে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় আঠারো শতাংশ। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বা এলএনজির ভাসমান টার্মিনালগুলোর কারিগরি ত্রুটি এবং নতুন কার্গো আমদানির জটিলতার পাশাপাশি এই সংকটের পেছনে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে স্থানীয় গ্যাস ফিল্ডগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিক পতন। বিশেষ করে দেশের জ্বালানি জোগানের প্রধান উৎস বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ড থেকে যেভাবে উৎপাদন কমতে শুরু করেছে, তাতে নীতিনির্ধারক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। স্থানীয় উৎপাদনের এই নিম্নমুখী প্রবণতা চলতে থাকলে আগামী দিনে পুরো দেশের অর্থনীতি এক অসহনীয় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের মোট স্থানীয় গ্যাসের প্রায় ৪৫ শতাংশ জুগিয়ে আসছে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন পরিচালিত মৌলভীবাজার ও জালালাবাদসহ বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ড। কিন্তু গত সাড়ে পাঁচ মাসের ব্যবধানে কেবল এই একক ফিল্ড থেকেই দৈনিক প্রায় ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম উৎপাদিত হচ্ছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে যেখানে উৎপাদন আটশো কুড়ি মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি ছিল, সেখানে বর্তমান হিসাব অনুযায়ী তা সাতশো চল্লিশ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। দেশের অন্য কোনো গ্যাস ফিল্ড থেকে বড় আকারে উৎপাদন বাড়িয়ে এই ঘাটতি পূরণ করার মতো কোনো সক্ষমতা নেই। তিতাস, রশিদপুর বা হবিগঞ্জের মতো দুয়েকটি বড় ক্ষেত্র ছাড়া বাকি বেশিরভাগ ফিল্ডের উৎপাদন হয় নামমাত্র, নতুবা প্রায় শূন্যের কোঠায় ঠেকেছে। বিবিয়ানার মতো প্রধান ও নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে প্রতি মাসে গড়ে ১২ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার এই ধারাবাহিকতা জাতীয় গ্রিডের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।
দেশজুড়ে গ্যাসের এই আকস্মিক ও তীব্র ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ভারী শিল্প-কারখানা, টেক্সটাইল সেক্টর, সার কারখানা এবং সাধারণ আবাসিক খাত পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালানোর জন্য যেখানে দৈনিক আড়াই হাজার মিলিয়নের বেশি গ্যাসের প্রয়োজন, সেখানে সরবরাহ মিলছে মাত্র নয়শ পঁয়তাল্লিশ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাসের অভাবে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। যার অনিবার্য ফল হিসেবে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মফস্বল এলাকায় তীব্র লোডশেডিংয়ের মহোৎসব চলছে। গ্রামীণ জনপদের ক্ষুদ্র শিল্প, কোল্ড স্টোরেজ, বরফকল এবং কৃষিজ খামারগুলোর কার্যকারিতা এই লোডশেডিংয়ের কারণে প্রায় ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে।
বিশেষ করে রপ্তানিমুখী পোশাক বা টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্ট চালাতে গিয়ে চরম অনিশ্চয়তার শিকার হচ্ছেন। দিনেরবেলা তো বটেই, রাতের বেলাও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় মিলগুলোর উৎপাদন রেশনিং করে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানাচ্ছেন যে, গ্যাস সরবরাহ না মিললেও ঠিক সময়ে কারখানার ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে, শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন দিতে হচ্ছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্যের চালান ডেলিভারি দিতে ব্যর্থ হতে হচ্ছে। এ ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা বজায় থাকলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান এই খাতটি চিরতরে মুখ থুবড়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিল্পপতিরা।
জ্বালানি খাত নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাংক আইইইএফএর প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, এই সংকটের মূল কারণ গত এক দশকে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করার দীর্ঘমেয়াদী উদাসীনতা। বিগত দিনে স্থানীয় খনিতে ড্রিলিং বা কূপ খনন না করে চড়া মূল্যে এলএনজি আমদানির ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভর করায় কোষাগারের শত শত কোটি ডলার অপচয় হয়েছে। ২০২৫ সালে এলএনজি আমদানিতে যেখানে প্রায় চার বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি বলছে যে চলতি বছরে সেই অঙ্ক ছয় বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। অথচ এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার একটি অংশ যদি দেশীয় নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও অনুসন্ধানে ব্যয় করা হতো, তবে আজকের এই চরম আমদানিনির্ভর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না। পাশাপাশি বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের চুরি ও অপচয় রোধ করা গেলে অভ্যন্তরীণ ঘাটতি অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব ছিল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে অবশ্য নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি করা হয়েছে। বিগত সরকারের শেষ সময়ে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। বর্তমানে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন করে একশ পঞ্চাশটি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ত্রিশটির কাজ ইতোমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলে কেবল খাতার কলমে পরিকল্পনা সাজালে চলবে না, বরং দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্যাস খনিগুলোর উৎপাদনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। আমদানি নীতির চোরাবালি থেকে বেরিয়ে নিজস্ব শক্তির ওপর ভরসা করতে না পারলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা অচিরেই সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।