শিরোনামঃ
নতুন টার্মিনাল নির্মাণের তোড়জোড়: এলএনজি আমদানির আর্থিক বোঝা ছাড়াতে পারে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা বিপন্ন হতে পারে রাষ্ট্রীয় ইস্টার্ন রিফাইনারি: আবেদন নাকচের পরেও রিফাইনারি বানাতে কারসাজি পাড়ার নিরাপত্তা মানে নিজের নিরাপত্তা: কিছু পরামর্শ নভোথিয়েটারের সাবেক মহাপরিচালক আরশাদের দেশত্যাগ নিষেধাজ্ঞা স্থানীয় প্রকল্পে বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যাংক গ্যারান্টির সুযোগ অবকাঠামো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাই : এলজিআরডি মন্ত্রী রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ দলনিরপেক্ষভাবে কাজ করব : রাষ্ট্রপতি আমরা তার ছাত্র হওয়ার জন্য আসিনি: সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা এভাবে নিয়ম ভঙ্গ করা হলে সংসদ বেশি দিন চলবে না: স্পিকার সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে বিরোধীদের প্রতিবাদ, পরিস্থিতি উত্তপ্ত
শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন

নতুন টার্মিনাল নির্মাণের তোড়জোড়: এলএনজি আমদানির আর্থিক বোঝা ছাড়াতে পারে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ০ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬

তীব্র গ্যাস ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা ক্রমশ এক বিপজ্জনক আর্থিক ফাঁদে রূপ নিচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেবল এলএনজি আমদানিতেই সরকারের ব্যয় হয়েছে ৫৯ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা এবং এর সঙ্গে অতিরিক্ত ভর্তুকি লেগেছে আরও ১২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে সরকার এখন নতুন করে আরও ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে এবং ইতোমধ্যে একটির নীতিগত অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পরিকল্পনায় থাকা টার্মিনালগুলোর মধ্যে অন্তত দুটিও যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে বিশ্ববাজারের বিদ্যমান অস্থিতিশীল দর ও সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বার্ষিক এলএনজি আমদানি ব্যয় বেড়ে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এমনকি খোলাবাজারের বা স্পট প্রাইসের বর্তমান চড়া দর অব্যাহত থাকলে এই ব্যয় বছরে দেড় লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে।
দেশে এলএনজির আমদানি শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত জাতীয় চাহিদা মেটাতে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা গচ্চা গেছে। এই বিপুল অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে সরকারকে দফায় দফায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি, উচ্চ সুদের বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ এবং গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের (জিডিএফ) অর্থ ব্যবহারের মতো পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। আরও দুটি নতুন টার্মিনাল যুক্ত হলে দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়াবে ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। গত অর্থবছরে দেশে ১১৩টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়েছিল। নতুন দুটি টার্মিনাল যুক্ত হলে কার্গোর সংখ্যা ও ব্যয়ও দ্বিগুণ হয়ে যাবে, যা দেশের সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনাকে এক বিশাল বিপর্যয়ের মুখে ফেলবে।
আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এই আর্থিক ঝুঁকিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট জটিলতার কারণে কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। ফলে বাধ্য হয়ে খোলাবাজার থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) সূচক অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ব স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ ডলার ৯৪ সেন্টে, যা গত ফেব্রুয়ারি মাসের (১০ ডলার ৭২ সেন্ট) তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বা ১১৪ শতাংশ বেশি। অতি সম্প্রতি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি দক্ষিণ কোরিয়ার পসকো ইন্টারন্যাশনাল এবং যুক্তরাজ্যের টোটাল এনার্জিসের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট ২৪ ডলারের বেশি দরে দুটি কার্গো কেনার অনুমোদন দিয়েছে। চলতি অর্থবছরে মোট ১১৫টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে এবং বর্তমান বাজারদর অপরিবর্তিত থাকলে শুধু এলএনজি কিনতেই সরকারের প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। অথচ চলতি বাজেটে এলএনজি খাতে ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছিল সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা, যার বিপরীতে প্রথম দেড় মাসেই ব্যয় হয়ে গেছে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা।
জ্বালানি খাতবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘আইইইএফএ’ তাদের পূর্বাভাসে সতর্ক করে জানিয়েছে যে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান স্থবির থাকলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বজায় থাকলে ২০২৯-৩০ অর্থবছর নাগাদ বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি ব্যয় সাড়ে ৮ বিলিয়ন ডলারে (১ লাখ সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা) পৌঁছাতে পারে। আইইইএফএ-এর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে, নতুন টার্মিনালগুলো যদি ৬৫ শতাংশ সক্ষমতায়ও পরিচালিত হয়, তবুও ২০৩০ সাল নাগাদ ৭৩০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হবে, যার আমদানি ব্যয় বহন করার আর্থিক সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে কি না তা এক বড় প্রশ্ন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, কেবল টার্মিনাল বানিয়ে আমদানির পরিধি বাড়ানো একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল কৌশল। নতুন টার্মিনাল চালু হলে আমদানি ব্যয় ন্যূনতম ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে। এই আর্থিক রক্তক্ষরণ থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে আমদানিনির্ভরতার পথ কমিয়ে দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে উৎপাদন অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দ্রুত সম্পৃক্ত করা এবং সৌরসহ নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের প্রসার ঘটানো ছাড়া টেকসই কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, দেশে বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হওয়া পর্যন্ত ঘাটতি মেটাতে আমদানির অবকাঠামো তৈরি রাখতে হচ্ছে। তবে সংস্থাটির পক্ষ থেকে ১৫০টি নতুন কূপ খননের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে এ পর্যন্ত ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। দেশীয় এই কূপগুলোর কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে গ্রিডে নিজস্ব গ্যাস যুক্ত করা না গেলে আমদানি ব্যয়ের এই লাগামহীন বৃদ্ধি জাতীয় অর্থনীতিকে আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।

 

 

তথ্যসূত্র: বণিকবার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...