শিরোনামঃ
যৌন কেলেঙ্কারির ক্ষতিপূরণ দাবি ৯৮ কোটি, অভিনেত্রী পেলেন ৫ কোটি ছাদের অব্যবহৃত পরিসরে বছরে ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের মেগা পরিকল্পনা আলোচনায় ইউনাইটেড এর যুবদলে খেলা বাংলাদেশী বংশদ্ভূত মোহাম্মদ নেহাল ৩ মিনিটের যে ব্যায়াম ৯০ মিনিটের ওয়ার্কআউটের চেয়েও বেশি কার্যকর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মস্তিষ্কে মিথ্যা তথ্যের বিষবাষ্প: শত কোটি ডলারের গোপন ইসরায়েলি প্রচার অভিযান হিমালয়ের চূড়ায় গলিত বরফের তাণ্ডব: উজানের আকস্মিক ঢল কি বাংলাদেশের জন্য মহাবিপদের পদধ্বনি? সৈকতের বালিয়াড়ি কেটে সড়ক নির্মাণ: পরিবেশের ঝুঁকি ও আইনি নোটিশের মুখে কাজ স্থগিত ছয় মাসের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কী পেল, কী হারাল? সরকারি খাতে কোথায় কত ঘুষ: ৮০৪টি অভিযোগে ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকার দাবি খাদ্যগুদামে নয়ছয় হলে ছাড় নয়, সিন্ডিকেটও রেহাই পাবে না: খাদ্যমন্ত্রী
শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১০:০৬ পূর্বাহ্ন

ছাদের অব্যবহৃত পরিসরে বছরে ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের মেগা পরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ০ বার
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬

বিদ্যমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনে এক নজিরবিহীন মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। দেশের সরকারি ও বেসরকারি ভবনের ছাদকে কাজে লাগিয়ে আগামী মাত্র এক বছরের মধ্যে চার হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের এক সাহসী উদ্যোগ উন্মোচন করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ বা সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য উৎস থেকে জোগানের যে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার রয়েছে, তারই অংশ হিসেবে এই বৃহৎ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এই উদ্যোগটি দ্রুততম সময়ে কার্যকর করার লক্ষ্যে বিদ্যুৎ খাতকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে তাদের সরাসরি অংশীদারিত্ব ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করার সর্বাত্মক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
গত ১৯ ও ২৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক নীতি-নির্ধারণী বৈঠকে বেসরকারি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। দ্রুততম সময়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরকার প্রথম ছয় মাসের মধ্যে প্রকল্প সম্পন্নকারীদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার কথা ভাবছে। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেসব উদ্যোক্তা আগামী ছয় মাসের মধ্যে সোলার প্যানেল স্থাপন সফলভাবে শেষ করবেন, তারা নিজেদের ব্যবহৃত বিদ্যুতের অতিরিক্ত অংশ জাতীয় গ্রিডে অপেক্ষাকৃত বেশি ও লাভজনক মূল্যে বিক্রির সুযোগ পাবেন। খুব শীঘ্রই এই সংক্রান্ত বিশদ ও স্পষ্ট নীতিমালা একটি আনুষ্ঠানিক পরিপত্রের মাধ্যমে দেশব্যাপী জারি করা হবে।
ঐতিহ্যগতভাবে প্রচলিত সরকারি অর্থায়নের বদলে এই পুরো প্রকল্পটি পরিচালিত হবে মূলত পরিচালন ব্যয় বা ‘ওপেক্স’ (OPEX) ব্যবসায়িক মডেলে। এই পদ্ধতিতে শিল্প কারখানা, বাণিজ্যিক কার্যালয় কিংবা ব্যক্তিগত বাসাবাড়ির মালিকদের নিজেদের পকেট থেকে প্রাথমিক কোনো অর্থ বা মূলধন বিনিয়োগ করতে হবে না। অনুমোদিত বেসরকারি পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ দায়িত্বে সম্পূর্ণ অর্থায়ন করবে, যন্ত্রপাতি বসাবে এবং সিস্টেমটির সার্বক্ষণিক রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার ভার বহন করবে। ছাদ বা ভবনের মালিক কেবল তার ছাদের অব্যবহৃত জায়গা ভাড়া দেবেন কিংবা উৎপাদিত বিদ্যুৎ তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে ব্যবহার করে বাড়তি বিদ্যুৎ জাতীয় সঞ্চালন লাইনে সরবরাহ করতে পারবেন।
উদ্যোগটি বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ বিভাগ সুনির্দিষ্ট তিনটি পরিচালন কাঠামো চূড়ান্ত করেছে। প্রথম মডেলে উৎপাদিত সমস্ত বিদ্যুৎ গ্রাহক নিজস্ব কাজে সম্পূর্ণ ব্যবহার করবেন, যা থাকবে জাতীয় গ্রিডের সম্পূর্ণ বাইরে। দ্বিতীয় মডেলে গ্রাহক নিজ প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ কোনো ছাদভাড়া ছাড়াই সরাসরি জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করবেন। আর তৃতীয় মডেলে গ্রাহক একটি নির্দিষ্ট অংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন, উদ্বৃত্ত অংশ গ্রিডে যাবে এবং মূল ছাদের মালিক ওই কোম্পানি থেকে নিয়মিত নির্দিষ্ট অঙ্কের ছাদভাড়া বুঝে পাবেন। ছাদের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশাপাশি এই নির্বাচিত সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সৌরচালিত সেচ পাম্প, সৌরভিত্তিক হিমাগার, বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জিং স্টেশন এবং ভাসমান সোলার প্যানেল স্থাপনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করার অনুমতি পাবে।
বৃহৎ আকারের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ‘নেট মিটারিং নির্দেশিকা ২০২৫’ সংশোধন করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়। নতুন নিয়মে গ্রাহকের অনুমোদিত বা স্যাংশনড বিদ্যুৎ লোডের পরিমাণ ছাড়িয়ে গেলেও বিতরণ কোম্পানির অনুমতিসাপেক্ষে তারা সর্বোচ্চ ১০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত সোলার প্যানেল স্থাপন করতে পারবেন। এর ফলে শিল্প ও বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় পরিসরে সৌর প্যানেল বসিয়ে গ্রিডে বিদ্যুৎ বিক্রি করার আইনি বাধা পুরোপুরি দূর হবে। সরকারের সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং জমিতে স্থাপিত কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বিত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পুরো কার্যক্রমটিকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের সুবিধার্থে ভৌগোলিক এলাকা ও বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির আওতায় বেসরকারি সার্ভিস প্রোভাইডার তালিকাভুক্তির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। ঢাকার ডেসকো ও ডিপিডিসি এলাকার পাশাপাশি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) রংপুর ও ঢাকার বৃহত্তর অংশে কাজ করবে। এছাড়া পিডিবি চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও সিলেটে; নেসকো রাজশাহী অঞ্চলে এবং ওজোপাডিকো খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে তদারকির দায়িত্ব পালন করবে। প্রতিটি বিতরণ সংস্থা, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ ও ন্যাশনাল লোড ডেসপ্যাচ সেন্টারের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের মূল্যায়ন কমিটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এই কোম্পানিগুলোকে বাছাই করবে।
যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় ও নতুন উদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা প্রদানের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। নিজ জেলায় কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলো সর্বোচ্চ ৪০ পয়েন্ট সুবিধা পাবে। পাশাপাশি নতুন স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য ১৫ পয়েন্ট এবং নারী পরিচালিত একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য ১০ পয়েন্ট বাড়তি বরাদ্দের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আবেদনকারীদের বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), হালনাগাদ ট্যাক্স সার্টিফিকেট এবং ব্যাংকে ন্যূনতম ১০ লাখ টাকার আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণপত্র থাকতে হবে। এছাড়া ইতিপূর্বে অন-গ্রিড বা অফ-গ্রিড পদ্ধতিতে অন্তত ২ কিলোওয়াটের সোলার প্যানেল স্থাপনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকলেই প্রতিষ্ঠানগুলো আবেদন করতে পারবে। নামমাত্র ফি দিয়ে নিবন্ধিত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকার প্রাথমিক মেয়াদ থাকবে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
দেশের শীর্ষস্থানীয় সৌরবিদ্যুৎ উদ্যোক্তারা সরকারের এই সমন্বিত পদক্ষেপকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক বলে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তবে তারা মনে করছেন, এই সুবিশাল লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সহজ শর্তে কম সুদের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া আমদানিকৃত সোলার যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করা, হুইলিং চার্জের স্পষ্ট নির্দেশনা এবং কোনো কারখানা বন্ধ হলে বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি নিরসনের আইনি সুরক্ষাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই নাজুক মুহূর্তে আমদানিনির্ভর গ্যাস ও তেলের ঝুঁকি এড়িয়ে জাতীয় গ্রিডে চার হাজার মেগাওয়াট দেশীয় সৌরশক্তি যুক্ত করা সম্ভব হলে তা দেশের শিল্প উৎপাদন ও সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে।


এ জাতীয় আরো খবর...