বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের পরিবেশগত ভারসাম্য ও প্রাকৃতিক বালিয়াড়িকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে সাগরপাড় ঘেঁষে শুরু হওয়া একটি নতুন সড়ক নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের সুনির্দিষ্ট ছাড়পত্র ছাড়াই শহরের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত সৈকতের ওপর দিয়ে এই সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর তীব্র প্রতিবাদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বরাবর স্মারকলিপি প্রদান এবং উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্যের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ পাঠানোর পর অবশেষে প্রকল্পটি ঘিরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তীব্র সমালোচনার মুখে কক্সবাজার পৌর কর্তৃপক্ষ বালিয়াড়ির ওপর চলমান নির্মাণকাজ আপাতত স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিপত্র থেকে জানা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আরবান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিটি গভর্নেন্স প্রজেক্টের (ইউডিসিজিপি) আওতায় সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলীর হোটেল সায়মন পর্যন্ত ১ দশমিক ২৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ২৮ মিটার প্রশস্ত সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয় কক্সবাজার পৌরসভা। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৮ সালের মে মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা। সরেজমিনে দেখা গেছে, সুগন্ধা সৈকত থেকে দক্ষিণ দিকে কয়েক শত মিটার ইট বিছানো পথ থাকলেও বাকি পুরো অংশটিই সমুদ্রের আদি ও প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি। সেই সংবেদনশীল বালিয়াড়ি ভরাট ও কেটে সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হলে প্রকৃতিপ্রেমী ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানিয়েছেন, সমুদ্রসৈকত একটি ঘোষিত প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ)। উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী এই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের স্থায়ী বা অস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। কিন্তু সৈকততীরে এই সড়ক তৈরির জন্য জেলা কার্যালয় থেকে কোনো ধরনের অনুমতি বা ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। যদিও কক্সবাজার পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী পরাক্রম চাকমার দাবি, পরিবেশ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় প্রধান কার্যালয় থেকেই প্রকল্পের ছাড়পত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে প্রকল্পটি নিয়ে বহুমুখী বিতর্ক ও আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ায় আপাতত মাঠপর্যায়ের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি কেবল সৌন্দর্য নয়, এটি উপকূলীয় জনপদকে জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের হাত থেকে রক্ষা করার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয়। তাছাড়া এই বালিয়াড়ি সামুদ্রিক কাছিমসহ বহু বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের একমাত্র প্রজনন ও আবাসস্থল। এসব প্রাকৃতিক কাঠামো নষ্ট করে সড়ক নির্মাণ করলে ভবিষ্যতে পুরো সৈকত ভাঙনের কবলে পড়বে এবং জলবায়ু দুর্যোগের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। এ ঘটনায় মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষ থেকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, প্রকল্প পরিচালক, পৌরসভার প্রধান নির্বাহী এবং জাইকার প্রতিনিধিসহ চারজনকে আদালত অবমাননার আইনি নোটিশ পাঠিয়ে অবিলম্বে সৈকতের প্রাকৃতিক রূপ ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে পৌর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজার শহরের প্রধান সড়কগুলোতে অসহনীয় যানজট তৈরি হয়। লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে পর্যটকদের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে এবং মেরিন ড্রাইভের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সহজ করতে এই বিকল্প সড়কটি অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখত। তবে পরিবেশবিদ ও সচেতন নাগরিক সমাজের স্পষ্ট অভিমত—উন্নয়ন বা যানজট নিরসনের নামে প্রকৃতির সুরক্ষাবলয় সমুদ্রের বালিয়াড়ি ধ্বংস করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পর্যটনের টেকসই বিকাশের স্বার্থেই সৈকতের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে বিকল্প স্থলপথে যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবি তাদের।